বর্তমান সময়ে আলোচিত ঘটনা হলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্বারা পরিচালিত অভিযান। প্রথমে এটাকে ‘দুর্নীতিবিরোধী অভিযান’ হিসাবে আখ্যায়িত করা হলেও পরে এটাকে কেউ বলছেন ‘শুদ্ধি অভিযান’ কেউ বলছেন ‘ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান’। তবে এখন পর্যন্ত এই অভিযানের যে রূপ ধরা পড়েছে সেটাকে আমি রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে অভিযান হিসাবে আখ্যায়িত করতে চাই। আওয়ামী লীগ টানা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতাসীন হওয়ার কারণে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় মানুষ যেমন উন্নয়নের সুখ ভোগ করছে, তেমনি এখানে কিছু অসুখেরও উদ্ভব হয়েছে। টানা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় থাকার ফলে আওয়ামী লীগের শরীরে কিছু পরগাছার জন্ম নিয়েছে, যারা এই ক্ষমতাকে ব্যবহার করে জনগণের ভোগান্তি বৃদ্ধি করেছে। আদর্শিক চর্চার বাইরে এই পরগাছা শ্রেণির বাড়-বাড়ন্তের কারণে জনগণের সঙ্গে দলের আদর্শিক কর্মীরাও ছিল কোণঠাসা। ফলে সাধারণ মানুষসহ দলের নেতাকর্মীদের মধ্যেও স্বস্তি বেড়েছে। লুটেরা এই দানবীয় গোষ্ঠীর চরিত্র প্রকাশ্যে আসায় দলীয় রাজনীতি কিছুটা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার ওপর মানুষের আস্থা বৃদ্ধি পেয়েছে।
পরিচালিত অভিযানে রাজধানীতে ক্যাসিনো সংস্কৃতির এক জমকালো সাম্রাজ্যের উন্মোচন হয়। ইতালীয় শব্দ ‘ক্যাসিনো’। যার অর্থ সাধারণত ক্লাবঘর বা আমোদপ্রমোদের কক্ষ। ক্যাসিনো সংস্কৃতিতে মদ, জুয়া ও নারী জোটগত উপাদান। তবে তিনটি উপাদানের সমন্বিত ব্যবস্থার কথা থাকলেও দেশ ভেদে তা ভিন্ন ভিন্ন। পুঁজিবাদী সমাজে ক্যাসিনো সংস্কৃতির একধরনের বৈধতা রয়েছে। ক্যাসিনো সংস্কৃতি পুঁজিবাদী সমাজের উপজাত। আর সেটা যদি আধা-ধনতান্ত্রিক লুটেরা ব্যবস্থায় যে কোনোভাবে বিকাশের সুযোগ পায় তাহলে তার রূপ কেমন হতে পারে তা আমরা ঢাকায় ফুটে ওঠা বর্তমান চিত্র দেখলেই বুঝতে পারি। প্রাপ্ত তথ্য মতে, রাজধানীতে ৬০টির মতো ক্যাসিনো রয়েছে। গড়ে উঠেছে হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা। মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে ক্যাসিনোতে আসক্ত হওয়াটা শুধু লাভ-ক্ষতির বিষয় না। এটা হতাশাগ্রস্ত মানুষের মস্তিষ্কে একধরনের সেনসেশন তৈরি করে। আর নিষিদ্ধ যে কোনো বিষয়ের প্রতি এই তাড়না মানুষের সহজাত। লুটেরা এই সংস্কৃতিতে মানুষের ধনী হওয়ার তাড়না প্রবলভাবে জেঁকে বসেছে। ভালো মানুষ হওয়ার চাইতে ধনী হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এটা সামগ্রিক সমাজের চাহিদা। আর এই চাহিদার দাবি মেটানোর জন্য ব্যক্তি যে কোনো পন্থাকেই জায়েজ করতে চায়। পাশ্চাত্যে ক্যাসিনো বৈধ হলেও আমরা জানি এর সঙ্গে ফটকা পুঁজির সম্পর্ক। উত্পাদনমুখী বিনিয়োগকৃত পুঁজির কোনো সম্পর্ক নেই। অন্যদিকে এ দেশে ক্যাসিনো হলো অবৈধ অর্থ উপার্জনের মাধ্যম। সরকার অবৈধ অর্থ বৈধ করার সুযোগ দিলেও এই টাকা বিনিয়োগ না হয়ে বিদেশে পাচার হতো। ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ তারিখে একটি দৈনিকে প্রকাশিত তথ্য মতে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে এক বছরে (২০১৭ থেকে ২০১৮) বাংলাদেশি আমানত বৃদ্ধি পেয়েছে ১৩০০ কোটি টাকা। এছাড়া গত ১০ বছরে ক্যাসিনো সামগ্রী আমদানিতে লেগেছে ১০০ কোটি টাকার ওপরে।
২০০৮ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর তথ্যপ্রযুক্তিতে বিপ্লবের মধ্যদিয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের দিকে অগ্রসর হয়। তথ্যপ্রযুক্তির এই বিপ্লবকে চতুর্থ বিপ্লব হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়। এই বিপ্লবের সুফল যেমন আমরা ভোগ করছি তেমনি এর মধ্য দিয়ে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো ডিজিটাল কলোনিয়ালিজমের ফাঁদে পড়েছে। বিদেশ থেকে আমদানি করা সামগ্রী দিয়ে ক্যাসিনো খেলা হয় এখানে। আবার এখান থেকে টাকা পাচার হয়ে চলে যায় বিদেশে। উপনিবেশিক যুগে যেমন আমাদের এখান থেকে কাঁচামাল আর অর্থ চলে যেত ঔপনিবেশিক দেশে। অন্যদিকে অপরাধ কর্ম হ্রাসের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে অপরাধীরাও প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের অপরাধ করছে। বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে অপরাধীরা এগিয়ে। যেমন—বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি হয়েছে বিটকয়েনের মাধ্যমে। কিন্তু বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থা এই চুরির ঘটনার পর বিটকয়েন সম্পর্কে তথ্য-উপাত্ত পায়।
এই অভিযানকে ভালোভাবে দেখলেও জনগণ এই মুহূর্তে সর্বশেষ সিদ্ধান্ত দিতে প্রস্তুত না। তারা দ্বিধাগ্রস্ত। দীর্ঘদিন ধরে বেড়ে ওঠা এই অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু কন্যার চূড়ান্ত জয় না দেখে তারা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিচ্ছে না। যদিও জনগণ শেখ হাসিনাকে প্রারম্ভ থেকেই সাধুবাদ জানিয়ে আসছে। রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়নের কারণে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। তবে তার তীব্রতা যে এত প্রকট ছিল সেটা অনেকে বুঝতে পারেনি। শেখ হাসিনা সেটাকে প্রকাশ্যে নিয়ে এসে ঝুঁকি নিয়েছেন। তিনি এসবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। তার সফল হওয়া ছাড়া দ্বিতীয় কোনো গত্যন্তর এখানে নেই। এরপর থেকে রাজনীতিতে প্রবেশদ্বারে যদি শুদ্ধাচার ও স্বচ্ছতার নীতি জনগণের দৃষ্টিগোচর হয় তাহলে রাজনৈতিক দল বা প্রতিষ্ঠানের ওপর তাদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা পাবে। আর এটা না হলে রাজনৈতিক দলগুলোতে মুখোশের পরিবর্তন হলেও দুর্বৃত্তায়নের গতি বৃদ্ধির আশঙ্কা থেকে যায়। ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় নিজের দলের নেতাকর্মীদের অপরাধে এভাবে নিমজ্জিত হতে দেখে তার বিরুদ্ধে প্রতিষেধকমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ছাড়া আর কারো পক্ষে সম্ভব ছিল কি না সন্দেহ।
n লেখক : রাজনৈতিক কর্মী
