দৈনিক ইত্তেফাক ও বাপকা’র আয়োজনে ৫ অক্টোবর কাওরান বাজারে দৈনিক ইত্তেফাক কার্যালয়ে মজিদা বেগম মিলনায়তনে ‘মত্স্য ও চিংড়ি খাদ্য আমদানি: সংকট—সম্ভাবনা ও করণীয়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচকরা বলেন, দেশে মত্স্য সম্পদের উত্পাদন বৃদ্ধিতে নিরাপদ ও মানসম্পন্ন মত্স্যখাদ্য উত্পাদন ব্যবস্থা এখনো অপ্রতুল। এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে চিংড়িসহ মত্স্যসম্পদ রপ্তানির স্বার্থে মানসম্পন্ন খাদ্য আমদানি প্রয়োজন। কিন্তু এক্ষেত্রে সরকারের সহায়ক
নীতিমালার অভাব রয়েছে। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয়েরও ঘাটতি রয়েছে। বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে হঠাত্ করে কোন নীতিমালা জারি এ খাতে সংকটের সৃষ্টি করে। এতে আমদানিকারকের পাশাপাশি প্রান্তিক চাষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে উত্পাদন ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ায় রপ্তানি বাণিজ্যও ক্ষতির মুখে পড়ে। এ সমস্যা থেকে উত্তরণে সরকারের আমদানি সহায়ক নীতিমালা প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন এ খাতের উদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞরা। তাদের বক্তব্য এখানে তুলে ধরা হলো—
আলোচকবৃন্দ
প্রধান অতিথি: রইছউল আলম মন্ডল
সচিব, মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়।
মঞ্জুর মোর্শেদ আহমেদ
সদস্য, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ।
অধ্যাপক সাজ্জাদ হোসেন
বিভাগীয় প্রধান, এ্যাকোয়া কালচার বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।
মোহাম্মদ তারেক সরকার
সভাপতি, বাপকা।
ড. শেখ আহমাদ আল নাহিদ
বিভাগীয় প্রধান, ফিশারিজ রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগ; চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়।
উইং কমান্ডার (অব.) মঈনুদ্দিন আহমেদ
স্বত্বাধিকারী, এমকেএ এসপিএফ হ্যাচারি।
মো. আতাউল করিম ভূঁইয়া
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ফিসটেক (বিডি) লিমিটেড।
মাঈন উদ্দিন আহমেদ
টিম লিডার, সলিডারিডেড বাংলাদেশ।
ম. কবির আহমেদ
সাবেক উপপরিচালক, মত্স্য অধিদপ্তর।
তৌহিদুল ইসলাম
সাধারণ সম্পাদক, বাপকা।
ড. মো. জিল্লুর রহমান
উপপরিচালক (মত্স্য চাষ), মত্স্য অধিদপ্তর।
মো. শাহাদত আলী খান
সিইও, বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন।
ড. মোহাম্মদ শামসুর রহমান
সহযোগী অধ্যাপক, মত্স্যবিজ্ঞান বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
রেজাউল হক কৌশিক
সাংবাদিক।
বেলায়েত হোসেন স্বপন
মত্স্যচাষি ও খাদ্য বিক্রেতা।
সঞ্চালনা: জামাল উদ্দীন
ইকনোমিক এডিটর, দৈনিক ইত্তেফাক।
সুপারিশমালা
g আন্তর্জাতিক মানের কোম্পানিগুলোর পরীক্ষা ও স্বাস্থ্য সনদ বিবেচনায় নিয়ে মানসম্মত খাদ্য আমদানির নীতিমালা সহজ করা হোক।
g পোর্টে খাবার আটকে রেখে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে সময়ক্ষেপণে কনটেইনার ডেমারেজ এবং ডিপো চার্জ বা ক্ষতি থেকে আমদানিকারককে মুক্তি দিতে হবে।
g আন্তর্জাতিক ‘এক্রিডেটেড’ এবং ‘কম্পিটেন্ট ল্যাব’ থেকে সনদের ভিত্তিতে আমদানি প্রক্রিয়া সহজ করা হোক এবং প্রয়োজনে খাদ্য বিধিমালা এবং আমদানি নীতিমালা অনুসরণে কিছুু কিছু পরীক্ষা দেশে যথার্থ ল্যাবে করা যেতে পারে।
g সরকারের প্রক্রিয়ার কারণে সময়ক্ষেপণে ডিপোচার্জ আমদানিকারকদের ওপর থেকে প্রত্যাহার করা হোক।
g ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে উপেক্ষণীয় মাত্রা বিবেচনায় না এনে পরিমাণগত মাত্রা নির্ণয় করা আবশ্যক। ‘মিট অ্যান্ড বোন মিল’ ব্যবহার না করলেও কেবল কন্টামিনেশনের কারণে মিট অ্যান্ড বোন মিলের উপস্থিতি প্রমাণকে নিষিদ্ধ করা যৌক্তিক হবে না।
g খাবারের যথার্থ পরীক্ষা করার জন্য এফআইকিউসি ল্যাবগুলোকে পরিপূর্ণ সক্ষম করার ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
g পরিবেশগত দূষণ-এর কারণে পণ্যটি পেস্টিসাইডস, ক্রোমিয়াম ও ক্ষতিকর রাসায়নিকমুক্ত হওয়া সম্ভব নয় বিধায় প্রতিটির ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য মাত্রা নির্ধারণ করে দিতে হবে, যা বিএসটিআই এবং মত্স্য খাদ্য বিধিমালাতে উল্লেখ আছে।
g মান নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে যথার্থ ব্যবস্থার জন্য আমদানির আগে পিএসআই-এর ব্যবস্থা করা হলে আমদানিকারকরা ঝামেলায় পড়বেন না, সেক্ষেত্রে সমস্যা থাকলে উত্পাদক কোম্পানিগুলো দায়িত্ব নেবে। এ ক্ষেত্রে এনবিআর ইতিবাচক চিন্তা করলে সংশ্লিষ্ট সবাই উপকৃত হবে।
g দেশীয় ফিডের আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সনদপ্রাপ্ত এবং এক্রিডেটেড ল্যাব থেকে সনদপ্রাপ্ত কোম্পানির খাদ্য আমদানি নির্বিঘ্ন করতে হবে।
g নীতিমালার অস্পষ্টতা দূরীকরণের পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।ধ
রইছউল আলম মণ্ডল
বন্যা, মড়ক—এসব কারণে চাষি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উত্পাদন কমছে, রপ্তানি কমবে। কিন্তু কৃষকের জন্য আমরা কিছুই করতে পারছি না। যারা মন্ত্রণালয় ঘোষিত পরিপত্র জারির আগেই ঋণপত্র (এলসি) খুলেছে, তাদের পণ্য ছেড়ে দেওয়া উচিত। তবে আমদানিকৃত খাদ্য আটকে থাকায় উদ্যোক্তাদের ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে অনেক সময় লাগবে। দীর্ঘদিন বন্দরে পরে থাকায় আমদানিকৃত খাদ্য মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যেতে পারে। ৪ আগস্ট জারিকৃত পরিপত্র পর্যালোচনায় কমিটি করা হয়েছে। কমিটি
প্রতিবেদন দেওয়ার পর নীতিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। সার্কুলারে অস্পষ্টতার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। তবে এখন বিকল্প প্রোটিনের উত্স বের হয়েছে। আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে উত্পাদন বাড়ানোর উদ্দেশ্যে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। প্রাণিসম্পদ খাতের জন্য সাভারে একটি পরীক্ষাগার হচ্ছে। ট্যানারি এবং পোলট্রি বর্জ্য কোথায় যায়, সেটিও দেখতে হবে। এ খাতের সংগঠনগুলো নীতি-নৈতিকতা রক্ষায় যথাযথ ভূমিকা পালন করে না। বাজারে প্রচুর নিষিদ্ধ মিট অ্যান্ড বোন মিল রয়েছে। মনিটরিং বাড়াতে হবে।
বেলায়েত হোসেন (স্বপন)
আমদানি করা মাছের খাবারে সংকট দেখা দেওয়ায় আমরা নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। আমদানি করা খাবার প্রয়োগ করে মাছ (বিশেষত পাবদা/গুলশা/শিং) চাষে খাবারে এফসিআর ছিল সর্বোচ্চ ১:১ অথচ এ খাবার সংকটে স্থানীয় খাবারে তা বেড়ে গেছে ১:১.৫ এ। অর্থাত্ খাবার অনেক বেশি লাগছে। পানি নষ্ট হচ্ছে। প্রত্যাশিত উত্পাদন বা গ্রোথ হচ্ছে না। অন্যদিকে সময় অনেক বেশি লাগছে। দুঃখজনক যে, এ সময়ে কাঁচামালের দাম তেমন না বাড়লেও বিদেশি খাবারের ঘাটতি বা অনুপস্থিতির কারণে স্থানীয় খাদ্য প্রস্তুতকারকরা রাতারাতি তাদের খাবারের দাম কেজি প্রতি ৮/১০ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে। এ ভাবে সুযোগ সন্ধানীরা খাবারের দাম বাড়ালেও মান কিন্তু বাড়াতে পারেনি বরং কাঙ্ক্ষিত গ্রোথ না পাওয়ার পরেও আমরা মাছ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি। দেশি খাবারের মান বাড়াতে এবং তাদের মান নিয়ন্ত্রণে চাপে রাখার জন্য হলেও আমদানি করা মানসম্মত খাবারকে উত্সাহিত করা দরকার। তা না হলে আমরা আবার পিছিয়ে পড়ব মাছ চাষের সাফল্য থেকে।
মোহাম্মদ তারেক সরকার
বাংলাদেশে মাছ ও চিংড়ি চাষে ব্যবহূত খাবারের কেবল ৫ শতাংশ খাদ্য বিদেশ থেকে আমদানি করা হচ্ছে। সকল শর্ত পূরণ করে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন খাবার পোর্টে আসার পর মন্ত্রণালয় থেকে সার্কুলার জারি করে পণ্য খালাসে জটিলতা সৃষ্টি করা হয়েছে। এটি আইনকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। সরকার ‘মিট অ্যান্ড বোন মিল’ নিষিদ্ধ করবে বলে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সনদ প্রাপ্ত এবং নিরাপদ ঘোষিত মাছ ও চিংড়ির খাদ্যকে মিট বোন বলে প্রচার করা বা বিভ্রান্তি ছড়ানোর পেছনে কোনো কূট কৌশল থাকতে পারে। বিভিন্ন সময় মাঠ পর্যায় থেকে খাদ্যের নমুনা নিয়ে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করার পর আজ অবধি আমদানি করা মাছ ও চিংড়ির খাবারে কোনো ক্ষতিকারক জিনিসের উপস্থিতি প্রমাণিত হয়নি। দেশে উত্পাদিত খাবারে আজ অবধি ডিএনএ টেস্ট করা হয়নি, দেশে ৯৫ ভাগ উত্পাদিত খাবার ডিএনএ পরীক্ষা না করে স্বীকৃত ও আন্তর্জাতিক মানের খাবারকে প্রশ্ন বোধক করার চেষ্টা করে কি নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা যাবে? আমদানিকৃত খাবারে ‘মিট অ্যান্ড বোন মিল’ ব্যবহার না করলেও নানা কন্টামিনেশন, ডিসিপি বা এমসিপি ব্যবহারের কারণেও এসব খাবার ডিএনএ টেস্ট করালে অতি উপেক্ষণীয় মাত্রায় থাকলেও তা পিসিআর-এ পজেটিভ হতে পারে, কিন্তু তাতে কি খাবারটি ক্ষতিকর? হারাম-হালাল? মাছ ও মুরগির জন্য কোনো শরীয়ত নেই বলে তাদের ক্ষেত্রে হারাম হালাল নেই। দেখতে হবে ব্যবহূত খাবার নিরাপদ কি না? মিথ্যা ঘোষণায় মিট অ্যান্ড বোন মিলের চালান এসেছে বলে জানা যায়, কিন্তু এসব চালান কখনো ফেরত গিয়েছে বা ধ্বংস করা হয়েছে বলে জানা যায়নি। এগুলো নিশ্চয়ই দেশের ফিড মিলেই ব্যবহার হয়েছে কিন্তু তা জানার জন্য ডিএনএ টেস্ট করা হয়নি। সচিব মহোদয়ের মাধ্যমে আবেদন, সঠিকভাবে আমদানিকৃত প্রকৃত মাছ ও চিংড়ির খাবার আমদানির জটিলতা নিরসনে অবৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা বাদ দিয়ে অনাবশ্যক শর্তাদি প্রত্যাহার করা হোক।
ড. শেখ আহমাদ আল নাহিদ
অবশ্যই আমদানিকৃত ফিড নিরাপদ হতে হবে। কারণ, এই মাছ কে খাবে? আমি, আমরা, আমাদের সন্তান। কাজেই বিষয়টি আমাদের সবার মাথায় রাখতে হবে। বলা হয়েছে, আমদানিকৃত ফিড শূকর ও প্রাণিজ উপজাতমুক্ত হতে হবে। কিন্তু প্রাণিজ উপজাত ছাড়া কি ফিশ ফিড বানানো সম্ভব? আমদানিকৃত মত্স্যখাদ্য পরীক্ষায় প্রাণিজ উপজাত কত মাত্রা পর্যন্ত থাকা যাবে তা উল্লেখ না থাকায় ল্যাবে পরীক্ষায় খুব সামান্য পরিমাণ থাকা সত্ত্বেও বন্দরে শুল্ক বিভাগ আটকে দিচ্ছে, যা সংকট বাড়িয়ে দিয়েছে। আসলে এইসব ফেক ইস্যু। একটি খাতকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নয়। এই খাত সমস্যায় পড়লে এর সঙ্গে জড়িতদের কী হবে? আমাদের দরকার, খাদ্য নিরাপদ কি না। আমদানিকৃত ফিড বন্ধ হওয়ায় স্থানীয় ফিডের দাম হঠাত্ করে অনেক বেড়ে গেছে। এতে বিপাকে পড়েছে সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয় ফিড উত্পাদনকারীরা সক্ষমতা অর্জন না করা পর্যন্ত আমদানিকৃত খাদ্যের উপর নির্ভর করতেই হবে। তাই আমদানি নীতি সহজীকরণ দরকার।
উইং কমান্ডার (অব.) মঈনুদ্দিন আহমেদ
রপ্তানিমুখী চিংড়ি ও মাছ চাষে মানসম্মত খাবারের বিকল্প নেই। যেনতেন খাবারে রপ্তানিযোগ্য মাছ চাষ করা যায় না। আন্তর্জাতিক প্রোটোকল এবং মাননিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেই এসব খাবার তৈরি করতে হয়। রপ্তানিযোগ্য চিংড়ি চাষে শতভাগ আমদানি করা খাবার প্রয়োগ করা হয়, কেননা এ মানের খাবার এদেশে তৈরি হয়নি এখনো। খাদ্য ঘাটতির কারণে এদেশের স্বনামধন্য একটি ফিডমিল থেকে ১০ টন খাবার অর্ডার দিয়ে বানিয়ে নিয়েছিলাম কিন্তু এ খাবার পানিতে ১০ মিনিটেই গলে গেল। পানির পরিবেশ নষ্ট এবং পুকুরের পরিবেশ নষ্ট হয়ে গেল। ফলে এ খাবার আর ব্যবহার করা গেল না। এভাবে যদি মানসম্মত খাবারকে নানা অজুহাতে ক্ষতিকর প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয় তাহলে দেশের চিংড়ি ও মাছ রপ্তানি হুমকির মুখে পড়তে বাধ্য। হঠাত্ করে এভাবে প্রকৃত খাদ্য আমদানিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা দেশের ক্ষতি ছাড়া আর কিছুই নয়। নিজেরা সক্ষমতা অর্জন না করা পর্যন্ত হঠাত্ করে আমদানিতে প্রতিবন্ধকতা, রপ্তানিযোগ্য মত্স্য শিল্পের প্রতি অশনিসংকেত।
রেজাউল হক কৌশিক
বিশ্ববাজারে বাংলাদেশে চিংড়ির চাহিদা থাকা সত্ত্বেও রপ্তানি কমতির দিকে। অথচ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশের ২ কোটি লোক এ খাতের ওপর নির্ভরশীল। এ খাতের সমস্যাদি নিরসন করে সম্ভাবনা কিভাবে কাজে লাগানো যায় তা ভাবতে হবে। সংকট সৃষ্টি করে সম্ভাবনা নষ্ট করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। সহায়ক নীতির মাধ্যমে এ খাতকে এগিয়ে নেয়া এখন সময়ের দাবি।
মঞ্জুর মোর্শেদ আহমেদ
আমরা নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ শুধু খাদ্যে নিরাপদ কিনা তাই দেখবো। মত্স্য আমদানি নীতিমালা আছে, আইন আছে। কিন্তু এসব কিছুর পরও আমদানিকৃত খাবার কতটা মানসম্মত। এই খাদ্য খাওয়ার ফলে জনস্বাস্থ্যের কোনো ক্ষতি হচ্ছে কি না? তা আমাদের দেখতে হবে। আমদানির পর বন্দরে ফিস ফিড আটকে রাখা যৌক্তিক নয়। তবে কোনো পরিপত্র জারি হলে এর ভিত্তিতে কাজ করাও আমাদের দায়িত্ব। তিনি বলেন, সবকিছুর একটা স্ট্যান্ডার্ড থাকা জরুরি। সেই স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী ফিড আমদানি করতে হবে। যে দেশ থেকে ফিড আমদানি করা হচ্ছে। তারা কী ধরনের স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেইন করছে। তারা যে সার্টিফিকেট ইস্যু করছে তা দেখে প্রটেকশন নেওয়ার সুযোগ আছে। তিনি বলেন, সরকার কিন্তু প্রতিপক্ষ না। সরকার সবসময়ই ব্যবসাকে ফ্যাসিলেটেড করছে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের মনিটরিংয়ের জন্য কতিপয় ব্যবসায়ী মনোক্ষুণ্ন হতে পারে। কিন্তু তারপরও মনিটরিং করতে হবে। ভবিষ্যত্ প্রজন্মের জন্যই আমরা আমাদের খাদ্যকে নিরাপদ রাখব। তবে যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে- তার একটা সমাধান দরকার।
অধ্যাপক সাজ্জাদ হোসেন
দেশে এক সময় হুজুগ ওঠে, বলা হয় তেলাপিয়া খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এতে তেলাপিয়া চাষিরা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হন। এখন কথা উঠেছে, পোর্টে আটক ফিড নিয়ে। আমদানিকৃত এসব ফিড ব্যবহার করা না গেলে তা নষ্ট হয়ে যাবে। ইতিমধ্যে অনেক সময় পার হয়ে গেছে। এতে করে আমদানিকারকের ডেমারেজ গুণতে হচ্ছে। অন্যদিকে, নির্দিষ্ট সময় পার হলে এগুলো আর কাজে আসবে না। আমাদের নিজস্ব উত্পাদিত ফিডের কোনো মনিটরিং নেই। কী থাকছে এই ফিডে আমরা কেউ তা জানি না। মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে তাদের বলা যেতে পারে, যারা এসব ফিড উত্পাদন করবে তাদের প্রতিষ্ঠানে বিশেষজ্ঞ থাকতে হবে। দেশে আন্তর্জাতিকমানের ল্যাব করতে হবে।
মো. তৌহিদুল ইসলাম
মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি ইস্যু করে বিদ্যমান নীতিমালা পাশ কাটিয়ে আমদানিতে জটিলতা তৈরি করা হচ্ছে। এ কারণে বন্দরে দীর্ঘদিন পণ্য আটকে থেকে আমদানিকারকদের ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতির দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। কনটেইনারের বিলম্ব ফি/জরিমানা সংশ্লিষ্ট শিপিং কোম্পানিকে দিতেই হবে অন্যদিকে দীর্ঘদিন আটকে থাকায় ডিপোচার্জ বহন করতে হবে। যেহেতু কর্তৃপক্ষের নানা কর্মকাণ্ডে সময়ক্ষেপণে এসব অতিরিক্ত চার্জ আমদানিকারককে বহন করতে হবে, সেহেতু ডিপো চার্জ সরকারের মওকুফ করা আবশ্যক। সরকার বা কর্তৃপক্ষ আমদানিকারকদের প্রতিপক্ষ বিবেচনা করলে তা হবে অনাকাঙ্ক্ষিত এবং অসত্ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। বাপকার সদস্যরা এসব অপকর্মের সঙ্গে জড়িত নয়।
ম. কবির আহমেদ
মাছ ও চিংড়ির খাবারের সকল পরীক্ষা-নিরীক্ষা এক্রিডেটেড ল্যাব ছাড়া করানো যাবে না। এ কারণে আমদানিকৃত খাদ্য পণ্য দীর্ঘসময় বন্দরে পড়ে থাকবে এবং ব্যবহার কাল স্বল্প হওয়ায় কম সময়ে তা মেয়াদোত্তীর্ণ হবে এবং খাবারের মান নষ্ট হবে। আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করে ‘ডি হিউজ’, ‘কারগিল’, স্কেটিং’, ‘ইউনি প্রেসিডেন্ট’ প্রভৃতি বিদেশি কোম্পানি খাদ্য রপ্তানি করে এবং এসব খাবার আশিয়ানের দেশসমূহ ব্যবহার করে উত্পাদিত মাছ ইউরোপে রপ্তানি করে থাকে। এসব খাবার মানুষ, মাছ ও পরিবেশ কারো জন্যই ক্ষতিকর নয়। বিদেশি কোম্পানিগুলোর সনদের ভিত্তিতেই আমদানির বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা না দিয়ে ‘এক্রিডেটেড’ বা কম্পিটেন্ট ল্যাব থেকে প্রদানকৃত সনদের ভিত্তিতে খাদ্য খালাস করা হোক।
মো. শাহাদত আলী খান
গত চার বছরে ১৪ হাজার টন চিংড়ি রপ্তানি কমেছে। চিংড়ির ‘ভেনামি’ জাত আসার পর থেকে বিশ্ববাজারে দরপতন হয়েছে। আমাদের পণ্য ফেলনা নয়। আমাদের চিংড়ির মান ভালো। নানাবিধ কারনে চিংড়ির প্রাকৃতিক খাদ্য প্রকৃতিগতভাবেই কমে গেছে। ফলে আমদানিকৃত খাবারে নির্ভরতা বেড়েছে। আমদানি নির্বিঘ্ন না হলে পুরো খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ড. মোহাম্মদ শামসুর রহমান
সামাজিক মূল্যবোধ ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণের মাধ্যমে আমদানিকৃত মত্স্য ও চিংড়ি খাদ্যের হালাল-হারামের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। ইপিজেডের মাধ্যমে রপ্তানির শর্তে আমদানির সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। যা স্থানীয় বাজারে বিপণন করা যাবে না। আমাদের ফিড কোম্পানিগুলোকে নিয়ে বসে সরকার ঠিক করতে পারে, কীভাবে খাদ্যের মান ঠিক রাখা যায়।
মাঈন উদ্দিন আহমেদ
আমরা যে ফিড আমদানি করি তা ভিয়েতনাম, বেলজিয়ামসহ বিভিন্ন দেশ ব্যবহার করছে। এইসব ফিডের কাঁচা পণ্যের মান খুবই ভালো। এছাড়া আমদানি হওয়া মত্স্যখাদ্যের সমমানের পণ্য এখানে উত্পাদন করা হয় না। চিংড়ি চাষে প্রাথমিক খাদ্য হিসেবে এগুলো আমদানি করতে হয়। এতে জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কিছু থাকলে তা রপ্তানিকারক দেশই আটকে দিত। প্রয়োজনে এসব ফিড স্বীকৃত ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে নিয়ে এলেই তো হয়। আমদানিকারকদের যেন হয়রানির শিকার হতে না হয়।
মো. আতাউল করিম ভূঁইয়া
সরকারের সব নিয়মকানুন মেনে বিশ্বের খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান থেকে মত্স্যখাদ্য আমদানি করা হয়। অথচ বন্দরে নানারকম জটিলতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। ফলে প্রচুর আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। এসব খাদ্য দ্রুত খালাস না হলে মেয়াদোত্তীর্ণের আশঙ্কাও থাকে। অন্যদিকে সময়মতো সরবরাহ না করতে পারায় আমদানিকৃত খাদ্যনির্ভর চাষিরা বেকায়দায় পড়েন। অনেকে বাধ্য হয়ে ছোটো মাছ ও চিংড়ি বিক্রি করে দিচ্ছেন। এর ফলে চিংড়ি চাষে নেতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি হবে। এক্ষেত্রে আমদানি পর্যায়ে জাহাজীকরণের আগে তৃতীয় পক্ষ কর্তৃক পিএসআই (প্রাক্-জাহাজীকরণ পরিদর্শন) করে নিয়ে আমদানি পর্যায়ে খালাস করা যেতে পারে। ফলে মিথ্যা ঘোষণায় আনার সুযোগ কমে যাবে এবং আমদানিকারককে অযথা হয়রানির শিকার হতে হবে না। শুল্ক কর্তৃপক্ষ চাইলে দৈবচয়নের ভিত্তিতে কোনো কোনো চালানের পরীক্ষা করতে পারেন। আর মত্স্যখাদ্যের নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে মত্স্য অধিদপ্তরও মাঠ পর্যায়ে এ ধরনের খাদ্যের বিভিন্ন পরীক্ষা সব সময়ই করে থাকেন। স্থানীয়ভাবে খাদ্য উত্পাদনে পরিপূর্ণ সক্ষমতা অর্জনের আগ পর্যন্ত এ ধরনের বিশেষায়িত মত্স্য ও চিংড়িখাদ্য আমদানি নির্বিঘ্ন রাখা দেশের মত্স্য খাতের চলমান উন্নয়ন বজায় রাখার স্বার্থেই জরুরি।
ড. মো. জিল্লুর রহমান
ফিস ফিড আমদানির বিষয়ে আমাদের কোনো সমস্যা ছিল না। মিট এন্ড বোন মিল নিয়ে আসে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। যাই হোক, মত্স্য খাদ্য আমদানি নীতিমালা পর্যালোচনা হচ্ছে। এটি নিয়ে আরো পরামর্শক সভা হবে। সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে আলোচনার ভিত্তিতে নীতিমালা সংশোধন করা হবে।
জামাল উদ্দীন
দেশে মত্স্য সম্পদের উত্পাদন বৃদ্ধিতে নিরাপদ ও মানসম্পন্ন মত্স্যখাদ্য উত্পাদন ব্যবস্থা এখনো অপ্রতুল। এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে চিংড়িসহ মত্স্যসম্পদ রপ্তানির স্বার্থে মানসম্পন্ন খাদ্য আমদানি প্রয়োজন। আলোচনায় স্পষ্ট যে, এক্ষেত্রে সরকারের সহায়ক নীতিমালার অভাব রয়েছে। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয়েরও ঘাটতি রয়েছে। বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে হঠাত্ করে কোনো নীতিমালা জারি এ খাতে সংকটের সৃষ্টি করে। এতে আমদানিকারকের পাশাপাশি প্রান্তিক চাষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে উত্পাদনব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ায় রপ্তানি বাণিজ্যও ক্ষতির মুখে পড়ে। এ সমস্যা থেকে উত্তরণে আজকের আলোচনায় উঠে আসা সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও মহল আন্তরিক হবেন বলে আশা করি। আজকের আলোচনায় উপস্থিত থাকার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ।
