এক সিগন্যালেই পার হয় এক ঘণ্টা সময়। প্রতিদিন ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে ১৬ জোড়া (৩ জোড়া ডেমু ট্রেনসহ) ট্রেন চলাচল করে। ট্রেন চলাচলের দরুন নারায়ণগঞ্জের একটি বিশাল অংশের মানুষ উপকৃত হচ্ছে ঠিকই কিন্তু মূল্যবান অনেক কর্ম ঘণ্টাও নষ্ট হচ্ছে বলে মনে করেন সচেতন মহল। তাদের মতে, প্রতিদিন ১৬ জোড়া ট্রেন চলাচল করে শহরের ওপর দিয়ে। শহরের প্রাণকেন্দ্র চাষাঢ়া, গলাচিপাসহ ১ ও ২ নম্বর রেলগেট ক্রস করে ট্রেন ঢুকছে রেল স্টেশনে। প্রতিবার ট্রেন এলে রেলগেটে সিগন্যাল পড়ে। সিগন্যাল কার্যকর হয় ট্রেন আসার অন্তত ৫ মিনিট আগে। ট্রেনের সিগন্যাল পড়লেই গেটের দুই পাশে বিভিন্ন যানবাহনের জটলা তৈরি হয়। ট্রেন আসা পর্যন্ত ৫/৬ মিনিটে গেটের দুই পাশেই যানবাহনের জটলা রূপ নেয় ঘন, বিশাল যানজটে। ট্রেন চলে গেলে সিগন্যাল উঠে যায়। কিন্তু যানজট থেকে যায়। গেটের দুই পাশের যানজট কমে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে কমপক্ষে ৪০/৪৫ মিনিট সময় লাগে। কখনো কখনো ঘণ্টা পেরিয়ে যায়।
নারায়ণগঞ্জ রেল স্টেশনের স্টেশন মাস্টার মো. গোলাম মোস্তফা জানান, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে ১৬ জোড়া ট্রেন চলাচল করে। সকালের দিকের ট্রেনগুলো চলে এক ঘণ্টা পর পর। দুপুরের দিকের ট্রেন চলে দেড় ঘণ্টা পর পর আবার বিকাল থেকে রাতের ট্রেন চলে এক ঘণ্টা পর পর। একাধিক সূত্র ও শহরের ১ নম্বর ও ২ নম্বর রেলগেট এলাকার আশপাশের ব্যবসায়ীসহ অনেকে বলেন, ট্রেন নারায়ণগঞ্জবাসীর উপকার করছে। প্রতি ঘণ্টায় ট্রেন চলে। দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির যাতায়াতে সুবিধা হচ্ছে। কিন্তু এটাও ভেবে দেখার সময় এসেছে, মূল শহরের ভেতর দিয়ে ট্রেন চলাচলে নাগরিক জীবনে ভোগান্তি বাড়ছে। নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান কর্মঘণ্টা। একবারের সিগন্যালেই ঘণ্টা খানেক সময় পেরিয়ে যায় যানজটে। ১৬ জোড়া ট্রেন যাওয়া-আসা মিলিয়ে সিগন্যাল পড়ে ৩২ বার। প্রতিবারে ৩০ মিনিট করে যানজটের সময় ধরলেও প্রতিদিন ১৬ ঘণ্টা সময় নষ্ট হচ্ছে। মূল শহরে রেল স্টেশনের যন্ত্রণা সরিয়ে নেওয়ার সময় এসেছে। এটা ব্রিটিশ আমল নয়। এটা ডিজিটাল যুগ। সবকিছুই বদলে গেছে। সময় এসেছে মেট্রো ট্রেনের। সাবেকি আমলের রেলগেটের সিগন্যালেই প্রতিদিন আমরা ১৬ ঘণ্টা মূল্যবান সময় নষ্ট করছি।
নারায়ণগঞ্জ রেল স্টেশন থেকে ঢাকা কমলাপুর রেল স্টেশনের দূরত্ব মাত্র ১৮ কিলোমিটার। রেল কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ ও অরক্ষিত অবস্থায় চলছে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা ট্রেন সার্ভিস। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেললাইন ঘেঁষে গড়ে উঠেছে কাঁচাবাজার, ফলের দোকান, মার্কেটসহ অসংখ্য বস্তিঘর। নারায়ণগঞ্জ রেল স্টেশন থেকে ছেড়ে প্রতিটি ট্রেন চাষাঢ়া, ফতুল্লা, পাগলা, শ্যামপুর, গেন্ডারিয়া হয়ে কমলাপুর যায়। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ১৮ কিলোমিটার রেললাইনের মধ্যে কমপক্ষে ৪৫টি অবৈধ রেল ক্রসিং আছে যেখানে কোনো ব্যারিকেডের ব্যবস্থা নেই। মাত্র ১৩টি রয়েছে বৈধ রেলগেট। পর্যবেক্ষক মহলের মতে, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেললাইন স্থাপিত হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে। তখন নদীবন্দরের সুবিধা দেওয়ার জন্যই রেল স্টেশন ৫ নম্বর সারঘাট এলাকায় স্থাপন করা হয়। জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করে ট্রেনযোগে দেশের বিভিন্ন এলাকায় তা পরিবহন করা যেত। একইভাবে ট্রেনযোগে কোনো মালামাল নদীবন্দরে এনে জাহাজের মাধ্যমে তা দেশ-বিদেশে পাঠানো যেত। ১৯৮০ ও নব্বই দশকেও ট্রেনের এই সুবিধাটুকু ব্যবসায়ী সমাজ উপভোগ করত।
বর্তমান যুগে যোগাযোগ খাতে বেড়েছে স্থল ও আকাশ পথের গুরুত্ব। ফলে বর্তমান সময়ে শহরের মাঝখান দিয়ে ট্রেন চলাচল যুক্তিযুক্ত নয়। রেল স্টেশন এখন শহরের বাইরে নেওয়া সময়ের দাবি। নইলে দিনে দিনে সমস্যা আরো বাড়বে। মাঝে মধ্যে বাস-ট্রেনের সংঘর্ষে মারাত্মক দুর্ঘটনার সংবাদ সে কথাই মনে করিয়ে দেয়।
