আলি জামান
ব্যাংকগুলো এখন ধুঁকছে। একদিকে তারল্য সংকট। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিপুল অংকের খেলাপি ঋণের বোঝা। এগুলোকে বাঁচাতে গেলে দুটা কাজ অনিবার্য হয়ে পড়েছে। ১) কয়েকটি সমগোত্রীয় ব্যাংক একত্র করে মার্জার করতে হবে। ২) শিল্পে দীর্ঘমেয়াদে ঋণ দেওয়া বন্ধ করতে হবে।
এর পক্ষে যুক্তি: পৃথিবীব্যাপী ব্যাংক বা শিল্পে মার্জার প্রথা চালু আছে। সম্প্রতি ভারত ব্যাংক সেক্টরে এটা করেছে। আর, আমাদের দেশের মতো এত সংখ্যক ব্যাংক আর কোথাও নেই। আমাদের ব্যাংকগুলো বাণিজ্যিক ব্যাংক। তারা আমানতকারীদের কাছ থেকে স্বল্পমেয়াদে আমানত সংগ্রহ করে। অথচ শিল্পে দিতে হয় দীর্ঘমেয়াদি ঋণ। উপযুক্ত পরিমাণে সহ-জামানতও নেওয়া হয় না। ফলে বড়ো বড়ো গ্রাহকরা একবার খেলাপি হয়ে গেলে সেই ঋণ সুদসহ আদায় করা কঠিন হয়ে পড়ে। আর খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়তেই থাকে।
আমাদের দেশে একসময় দুটি ব্যাংক ছিল, যারা শিল্পে ঋণ দিত। বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক আর বাংলাদেশ শিল্প ঋণ সংস্থা। দুটি ব্যাংকই এখন বাণিজ্যিক ব্যাংকে পরিণত হয়ে নাম দিয়েছে—বিডিবিএল। এরা কিন্তু এখনো শিল্পখাতে বড়ো অংকের ঋণ দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তাদেরও খেলাপি ঋণের পরিমাণ কম নয়। প্রশ্ন হলো—তাহলে শিল্পের জন্য অর্থসংস্থান কীভাবে হবে? উত্তর:যেভাবে সারা পৃথিবীতে হয় সেভাবে। প্রথমে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল সংগ্রহ করতে হবে। প্রতিষ্ঠানটি লাভজনক হওয়ার পর পুঁজিবাজারে আইপিও ছেড়ে অর্থ সংগ্রহ করতে হবে। কিন্তু এখানে একটা বড়ো রকমের সমস্যা আছে। আমাদের দেশে পুঁজিবাজারে কিছু কোম্পানি ফাটকাবাজি করতে শেয়ারবাজারে আসে। এর মধ্যে যাদের একটু বেশি ক্ষমতা আর প্রভাব আছে, তারা অনেক বেশি প্রিমিয়াম নিয়ে আইপিও বিক্রি করে। দেখা গেছে এর প্রায় আশি শতাংশ পরে মূল্য হারায়, আর আইপিওর ক্রেতারা পুঁজি হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়। কেন এমন হয়? কারণ, আইপিও ছাড়ার কালে বড়ো ধরনের সিন্ডিকেট কাজ করে। ইস্যুয়ার কোম্পানিগুলো,অ্যাকাউন্টিং ফার্ম আর নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার সঙ্গে যোগসাজশে এই অপকর্ম করে। দাম অস্বাভাবিকভাবে পড়ে গেলেও কারো কোনো জবাবদিহি করতে হয় না। তাছাড়া শেয়ার বাই ব্যাকের বিধানও নেই।
মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর প্রধান কাজ হলো—ইস্যু মানেজারি আর আন্ডার রাইটিং করা। তাদের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে ভালো ভালো কোম্পানিকে শেয়ার বাজারে নিয়ে আসা। অথচ সেই কাজে তাদের আগ্রহ কম। তাদের আগ্রহের বিষয় হলো—নিজস্ব ডিলার হাউজের মাধ্যমে শেয়ার ট্রেডিং করা। এটাও মেনে নেওয়া যেত। কিন্তু তাদের ট্রেডিং সব বাজে মানহীন শেয়ার নিয়ে। আজ যে বাজার ম্যানিপুলেশনের মাধ্যমে শেয়ারবাজারে মানুষ আস্থা হারিয়েছে—তার জন্য এদের অবদান কম নয়। অথচ পৃথিবীর আর কোনো দেশে এভাবে ঢালাওহারে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোকে শেয়ার ট্রেডিং-এর সুযোগ দেওয়া হয় না।
ফিরে আসা যাক মূল আলোচনায়। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো শিল্পে দীর্ঘমেয়াদে ঋণ দেবে কী দেবে না? দীর্ঘমেয়াদ বলতে সাধারণত বোঝায় দশ বা তার ওপরের মেয়াদ। দীর্ঘমেয়াদি এ সব ঋণের প্রায় ৭৮ শতাংশ এখন খেলাপি ঋণ। এই খেলাপি ঋণের পরিমাণ দিনে দিনে বাড়ছে। এই অবস্থায় সুদসহ বড়ো আকারের প্রিন্সিপাল অ্যামাউন্ট উদ্ধারের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থমন্ত্রীর সুপারিশে ঋণ রিসিডিউলের সুযোগ করে দিচ্ছে। ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিলে ৭-৯ শতাংশ হারে ১২ বছরের জন্য ঋণ পুনঃতপশিল করে দিচ্ছে।
শিল্পে ঋণ দেওয়া যেতে পারে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে যেখানে রিপেমেন্টের মেয়াদকাল হবে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর। এই খাতে ঋণ আদায়ের হার বর্তমানে ৯৮.৪ শতাংশ। যদি যথাসময়ে ঋণ পরিশোধ করে তবে আরো কম সুদে তাদের ঋণ নবায়ন করা যেতে পারে। এসএমই খাতে ঋণ পুনঃভরণের একটা নিয়ম চালু থাকলেও বেশির ভাগ ব্যাংক আর আর্থিক প্রতিষ্ঠান তা মানে না। তাদের নজর বড়ো বড়ো ঋণ প্রদানের দিকে। কারণটা অবশ্য অজ্ঞাত নয়!
ব্যাংকিং সেক্টরে একটা পরিবর্তনের সময় উপস্থিত হয়েছে। ব্যাংকের টাকার কতটুকু আর স্পন্সরদের? সিংহভাগ টাকা তো আমানতকারীদের। সেই আমানত রক্ষার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশে সিআরআর, এসএলআর-এর মাধ্যমে ১৮ শতাংশ রিজার্ভ ফান্ডে রাখা হতো। শেয়ার বাজারে কথিত তারল্য সংকট কাটাতে সম্প্রতি ব্যাংকারদের চাপে তার পরিমাণও ৩ শতাংশ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন তাহলে এর ফলে সৃষ্ট ১৫০০০ কোটি টাকার উদ্বৃত্ত তারল্য খাটানো হবে কোথায়? ড. রেহমান সোবহান বলেছিলেন, আমাদের শেয়ার বাজারটি হলো-একটা উন্নত ক্যাসিনো? টাকাগুলো যদি সেই ক্যাসিনোয় খাটানো হয়, আর তা যদি হারিয়ে যায়, মানুষগুলো বাঁচবে তো?
