কুর্দি মিলিশিয়াদের হটিয়ে নিরাপদ অঞ্চল নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তুরস্কের সেনাবাহিনী ৯ অক্টোবর উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় অভিযান শুরু করে। সমালোচকরা আশঙ্কা করছেন, এই অভিযানের ফলে স্থানীয় কুর্দি নাগরিকেরা জাতিগত সহিংসতার শিকার হতে পারে এবং এতে ইসলামিক স্টেট জঙ্গিগোষ্ঠীরও পুনরুত্থান ঘটতে পারে। কিন্তু এই কুর্দিরা আসলে কারা? তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান কেন সীমান্তে ‘সন্ত্রাসী কার্যক্রমের পথ বন্ধ’ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন?
মেসোপটেমিয়ান সমতল ভূমি ও পাহাড়ি অঞ্চলের একটি নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী এই কুর্দিরা। বর্তমানে দক্ষিণ-পূর্ব তুরস্ক, উত্তর-পূর্ব সিরিয়া, উত্তর ইরাক, উত্তর-পশ্চিম ইরান ও দক্ষিণ-পশ্চিম আর্মেনিয়া অঞ্চলে তারা ছড়িয়ে রয়েছে। আড়াই থেকে সাড়ে তিন কোটি কুর্দি এসব পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাস করে। মধ্যপ্রাচ্যের চতুর্থ বৃহত্তম নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী তারা। কিন্তু এই কুর্দিরা কখনো স্থায়ী একটি রাষ্ট্র পায়নি। বর্তমানে তাদের একটি আলাদা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সম্প্রদায় রয়েছে। জাতিগত, সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে তারা এক রকম হলেও তাদের ভাষার কোনো স্বতন্ত্র বাচনভঙ্গি নেই। কুর্দিদের মধ্যে বিভিন্ন ধর্ম ও উপগোষ্ঠীর উপস্থিতি থাকলেও তাদের সিংহভাগ সুন্নি মুসলিম। খবর বিবিসি বাংলার
কুর্দিদের কোনো রাষ্ট্র নেই কেন :বিংশ শতকের শুরুর দিকে কুর্দিদের অনেকে নিজেদের জন্য একটি রাষ্ট্র গঠনের চিন্তা করে, যেটি কুর্দিস্তান হিসেবে পরিচিত হবে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর যুদ্ধজয়ী পশ্চিমা জোট ১৯২০ সালের সেভর চুক্তি অনুযায়ী কুর্দিদের জন্য একটি রাষ্ট্র গঠনের ব্যবস্থা নেয়। তবে তিন বছর পরই ঐ সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে যায়, যখন লুসান চুক্তি অনুসারে আধুনিক তুরস্কের সীমানা নির্ধারিত হয় এবং কুর্দিদের জন্য আলাদা রাষ্ট্রের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয় না। কুর্দিরা তখন নিজ নিজ দেশে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী হিসেবে বসবাস করতে বাধ্য হয়। পরের ৮০ বছরে নিজেদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র গঠনের জন্য কুর্দিদের নেওয়া প্রতিটি প্রচেষ্টাকেই নিষ্ঠুরভাবে দমন করা হয়।
তুরস্ক কেন কুর্দিদের হুমকি মনে করে :তুরস্ক এবং সেদেশের কুর্দিদের মধ্যে সংঘাতের ইতিহাসটা অনেক পুরোনো। তুরস্কের জনসংখ্যার ১৫ থেকে ২০ ভাগ জাতিগতভাবে কুর্দি। কয়েক প্রজন্ম ধরে তুরস্কের কর্তৃপক্ষ কুর্দিদের বিষয়ে কঠোর নীতি অনুসরণ করেছে। ১৯২০ ও ১৯৩০-এর দশকে কুর্দিদের বিক্ষোভের উত্থানের সময় অনেক কুর্দি পুনর্বাসিত হয়, কুর্দি নাম ও পোশাকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়, কুর্দি ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়, এমনকি কুর্দিদের যে একটি আলাদা জাতিগত পরিচয় আছে, সেটিও অস্বীকার করা হয়। কুর্দিদের সে সময় বলা হতো ‘পাহাড়ি তুর্কি।’ ১৯৭৮ সালে আবদুল্লাহ ওচালান পিকেকে গঠন করেন, যার প্রধান দাবি ছিল তুরস্কের মধ্যে স্বাধীন একটি রাষ্ট্র গঠন। ছয় বছর পর সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে ঐ সংগঠন। সে সময় থেকে এখন পর্যন্ত ৪০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে এবং লাখ লাখ কুর্দি বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
১৯৯০-এর দশকে পিকেকে স্বাধীনতার দাবি বাদ দিয়ে সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক স্বায়ত্বশাসনের দাবিতে আন্দোলন চালায়। তবে সে সময়ও সশস্ত্র সংগ্রাম অব্যাহত রাখে তারা। ২০১৩ সালে গোপন আলোচনার পর যুদ্ধবিরতির সমঝোতায় আসে তারা। ২০১৫ সালের জুলাইয়ে যুদ্ধবিরতি অকার্যকর হয়ে পড়ে, যখন সিরিয়ার সীমান্তের কাছে কুর্দি অধ্যুষিত শহর সুরুকে আত্মঘাতী বোমা হামলায় ৩৩ জন তরুণ অ্যাক্টিভিস্ট নিহত হন। ইসলামিক স্টেটকে ঐ বোমা হামলার জন্য দায়ী মনে করা হয়। সে সময় পিকেকে তুরস্ক কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে হামলায় সহায়তার অভিযোগ আনে এবং তুরস্কের সেনাবাহিনী ও পুলিশের ওপর হামলা চালায়। এর ধারাবাহিকতায় তুরস্কের সরকার পিকেকে ও আইএসের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে, যেটিকে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সমন্বিত যুদ্ধ’ বলে দাবি করা হয়।
