৬ অক্টোবর (২০১৯) বুয়েটের ছাত্র আবরার হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে তারই ক্যাম্পাসের ভেতরে, পরিচিত-অপরিচিত ছাত্র নামধারী পাষণ্ডদের দ্বারা। ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দ্বিতীয় বর্ষের এই ছাত্র কোনো দলেরই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল না। কিন্তু ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সময় সম্পাদিত কয়েকটি চুক্তির যৌক্তিকতা নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছিল। তবে বিরোধ যা-ই থাকুক না কেন, ক্যাম্পাস এবং হলজীবনে শিক্ষার্থীরা একে অন্যকে সহমর্মিতার দৃষ্টিতে দেখবে এটাই স্বাভাবিক। ক্ষমতার দাপটে নিজের হাতে আইন তুলে নিয়ে একজনকে খুন করবে, এটা মেনে নেওয়া যায় না। বরং চুক্তিগুলো নিয়ে তার সমালোচনায় অসত্য বা অন্যায় থাকলে আইসিটি আইনে মামলা করা যেত কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারত। সমালোচনাকারীকে পিটিয়ে মেরে ফেলার কাজে যারা জড়িত, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হবে—এটাই বাঞ্ছনীয়। কারণ ২০১২ সালে বিশ্বজিত্ নামে সাধারণ দর্জিকে হত্যার দায় যাদের ছিল, তারা মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছে শেখ হাসিনার আমলেই।
শেখ হাসিনা তার একটি প্রবন্ধে ছাত্ররাজনীতির মূল লক্ষ্য সম্পর্কে লিখেছেন, ‘ছাত্ররাজনীতির মূল লক্ষ্য হচ্ছে সমাজ, দেশ ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যত্ নেতৃত্বদানে নিজেকে গড়ে তোলা।’ জননেত্রী শেখ হাসিনার যুগোপোযোগী নেতৃত্বের কারণে দেশ এগিয়ে চলেছে। ‘আগে শিক্ষা, পরে রাজনীতি’র মতো ২০১৪ সালের ২৪ নভেম্বর কারো মুখের দিকে না তাকিয়ে শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাসে জড়িতদের বিরুদ্ধে ‘যথাযথ ব্যবস্থা’ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি। সেদিন শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘এখানে একটা নির্দেশ আমি দিতে চাই, যারাই এ ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করবে বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাস করবে, যে দলেরই হোক, কে কোন দলের সেটা দেখার কথা না, যারা এ ধরনের কর্মকাণ্ড করবে, সাথে সাথে তাদের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নিতে হবে।’ অবশ্য তখন কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে বলা হয়েছিল, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষের দায় ছাত্রলীগের নয়।’ এর উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি জানি যে, যারাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গণ্ডগোল করুক, একটা পর্যায়ে দেখা গেছে সেখানে ছাত্রের চেয়ে অছাত্র বেশি, কিছু বহিরাগত, তারাও এর সাথে জড়িত থাকে।’ তার মতে, দোষীদের সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তার ও উপযুক্ত শাস্তি দিলে তাত্ক্ষণিকভাবে এসব ঘটনা ‘নিয়ন্ত্রণ’ করা যায়। কয়েক বছর আগে চট্টগ্রাম সফরে গিয়ে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দ্বন্দ্বে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন।
আবরার বুয়েটে এসেছিলেন কুষ্টিয়া থেকে। লালন ও রবীন্দ্রনাথের বিচরণভূমি এবং আমার বেড়ে ওঠা মৃত্তিকা থেকে। আমরা সবাই জানি, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অভিভাবকেরা তাদের সন্তানদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাঠান উচ্চতর শিক্ষা নিয়ে পরিবারের পাশাপাশি দেশের মুখ উজ্জ্বল করার জন্য। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে অবস্থান করে গ্রামের একজন তরুণ বা তরুণী তার শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করে। হলগুলো আমাদের সময়ে ছিল নিরাপদ আশ্রয়স্থল। যদিও একসময় স্বৈরশাসকদের সমর্থকেরা তার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। নব্বইয়ের দশকে শিক্ষার্থীদের ঐক্য ছিল, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে উচ্চকণ্ঠও ছিল তারা। একটি হলের বাসিন্দারা পরস্পর নিজেদের আপন ভাবত। সেই দৃশ্যপট পালটে গেছে বিএনপি-জামায়াত আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ ও শামসুনন্নাহার হলে পুলিশের হামলার পর। নানাবিধ গ্রুপিংয়ের জন্য অবিশ্বাস ও বিরাগ জন্মেছে একে অপরের বিরুদ্ধে। তবে আশার কথা, ২০০৯ সাল থেকে প্রেক্ষাপট পালটে গেছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং শেখ হাসিনার প্রত্যাশিত ছাত্ররাজনীতির ছক এখন নতুন নেতৃত্ব গড়ে তোলার অন্যতম নিয়ামক হয়ে উঠেছে।
এজন্য আবরারের হত্যাকাণ্ডের পর ছাত্রলীগে শুদ্ধি অভিযানের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, আবর্জনা পরিষ্কার করতে হবে। যারা এরকম ঘটনা ঘটাচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এই সমস্ত আবর্জনা দলে থাকার দরকার নেই বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার বলেছেন, ছাত্রলীগের নাম ব্যবহার করে যারা বদনাম করবে, তাদের ছাত্রলীগে দরকার নেই। তিনি বরং মেধাবী ও প্রকৃত শিক্ষার্থীদের ছাত্রলীগে নিয়ে আসার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন। ২০১৭ সালের ২৪ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ছাত্রলীগের ৬৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আয়োজিত পুনর্মিলনীতে ছাত্রলীগের প্রত্যেক নেতাকর্মীকে উদ্দেশ করে তিনি বলেছিলেন, ‘মনে রাখতে হবে, ছাত্ররাজনীতি আমরা করব। কিন্তু শিক্ষা গ্রহণ করাটাই হচ্ছে সব থেকে বড় এবং সবার আগের কাজ।’ তিনি ছাত্ররাজনীতির আদর্শের কথা সব সময় প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে স্মরণ করিয়ে দেন। এ কারণে ছাত্রলীগের হানাহানি, চাঁদাবাজি ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তার কাছে অগ্রহণযোগ্য।
বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের চিন্তা-চেতনা হলো কীভাবে বাংলাদেশকে সমৃদ্ধশালী এবং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলায় প্রতিষ্ঠা করা যায়, সেই লক্ষ্যে কর্মসূচি প্রণয়ন করা। আওয়ামী লীগ সরকারের চিন্তা-চেতনা ও কর্মসূচির সঙ্গে ছাত্রলীগের চিন্তা-চেতনার একটা গভীর মিল রয়েছে। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচিকে সমর্থন করে—এর সফলতার জন্য কাজ করার কথা। এদিক থেকে ছাত্রলীগের প্রধান মন্ত্র হলো শিক্ষাব্যবস্থাকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরে অবস্থান করে ভিন্নমতের জন্য কাউকে হত্যা করা হলে তা হবে ‘শিক্ষা, শান্তি, প্রগতি’র অবমাননা।
n লেখক :অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
