ট্রাইগ্লিসারাইড যখন ঝুঁকিপূর্ণ

আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০১৯, ২১:১৯

রক্তে ভাসমান এক ধরনের চর্বি হলো ট্রাইগ্লিসারাইড, টি.জি. নামে এটি জনগণের মধ্যে বেশি পরিচিত। তৈল, মার্জাবিন, মাখন, ঘি, খাদ্যের আর সব চর্বিতে আছে টি.জি। খাদ্যের সঙ্গে পাচক নলে গিয়ে জীর্ণ হয়ে প্রবেশ করে লসিকারস, এরপর রক্তস্রোতে। তবে এটিই একমাত্র উত্স নয়। আমরা যে সরল শর্করা খাদ্যে গ্রহণ করি যেমন : পেস্ট্রি, ময়দার রুটি, ক্যান্ডি, চিনি, মিষ্টি-মিঠাই ও মদের বাড়তি ক্যালরি শরীরে মেদকোষে টি.জি (ট্রাইগ্লিসারাইড) হিসেবে জমা হয়।

ট্রাইগ্লিসারাইড আর কোলেস্টেরল এক জিনিস নয়। দুটোকেই বলা হয় লিপিড, আর ট্রাইগ্লিসারাইড হলো সত্যিকার অর্থে চর্বি। মোমসদৃশ কোলেস্টেরল তৈরি হয় যকৃতে ও অন্ত্রে, এক-তৃতীয়াংশ কোলেস্টেরল আমরা পাই খাদ্য থেকেও। কোষপ্রাচীর গঠনে, হরমোন উত্পাদনে কোলেস্টেরলের জুড়ি নেই।

ট্রাইগ্লিসারাইড মানেই যে খারাপ তা নয়, সঠিক পরিমাণে রক্তে থাকলে ভালো। আমাদের শরীর একে দুর্যোগে বাড়তি শক্তির উেসর জোগান হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। তবে রক্তে টি.জি. বেশি থাকলে হূদেরাগের ঝুঁকি খুব বেড়ে যায়, বিশেষ করে সেই সঙ্গে রক্তে যদি থাকে মন্দ কোলেস্টেরল এলডিএল বেশি পরিমাণে।

লাইপোপ্রোটিন সম্বন্ধে ধারণা থাকা ভালো। ট্রাইগ্লিসারাইড রক্তে দ্রবণীয় নয়, তাই এমনি রক্তে ভেসে বেড়াতে পারে না। তাই এরা প্রোটিনের ভেলায় করে ঘুরে বেড়ায় রক্তে, একে বলে লাইপোপ্রোটিন। এভাবে রক্তে  একসময় মেদকোষে জমা হয়। রক্তে এদের মাত্রা পরিমাপ করা হয়। ল্যাবরেটরিতে রক্তে কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইড দুটোরই মাত্রা মাপা হয়। রক্তের নমুনা নেওয়া  হবে, খালি পেটে, অর্ধেক দিন উপোস থেকে, শর্করা খাদ্য, পানীয় না খেয়ে, রক্ত দিতে হবে। রক্তে মাপা হবে ‘লিপিড প্রোফাইল’। দুই রকম কোলেস্টেরল আছে। হিতকর কোলেস্টেরল (এইচডিএল) আর ক্ষতিকর কোলেস্টেরল (এলডিএল), দুটোরই পরিমাপ করা হবে। আর রক্তের ট্রাইগ্লিসারাইড এবং মোট কোলেস্টেরল। এদের একটি স্বাস্থ্যসম্মত মাত্রা আছে। মাত্রার মধ্যে না থাকলে হূদেরাগের ঝুঁকি বাড়বে। বয়স, পারিবারিক ইতিহাস, জেন্ডার, রক্তচাপ, জীবনরীতি এসব কিছু সেই মাত্রার ওপর প্রভাব ফেলে। তাই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইড পরীক্ষার জন্য নমুনা দেওয়ার আগে কি খালি পেটে থাকতে হবে? আহারের পর সাধারণত রক্তে টি.জি. মান বেড়ে যায়। তাই ডাক্তার রক্তের নমুনা দেওয়ার আগে ১২ ঘণ্টা খাদ্য বা পানীয় (পানি পান করা যাবে) গ্রহণ করতে নিষেধ করেন। খাদ্যাভ্যাস, মদ্যপান, ঋতুস্রাব (নারীর ক্ষেত্রে), দিনের সময়, নমুনা দেওয়ার ইতিপূর্বে ব্যায়ামের ওপর প্রভাব ফেলে। ট্রাইগ্লিসারাইড মাত্রা রক্তে কী রকম থাকতে পারে—

বাঞ্ছিত মাত্রা : ১৫০ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার এর কম, সীমা ছুঁইছুঁই মাত্রা : ১৫০-১৯৯ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার, উচ্চমাত্রা : ২০০-৪৯১ মিলিগ্রাম/ ডেসিলিটার, অতিরিক্ত মাত্রা : ৫০০ মিলিগ্রাম/ ডেসিলিটার বা বেশি।

উঁচু মাত্রা হলে কি শরীরের উপসর্গ হয়? সাধারণত নয়। তাই রক্তে লিপিড ও ট্রাইগ্লিসারাইড চেক করে নেয়া ভালো নিয়মিত। কালক্রমে উচ্চমাত্রা থেকে হূদেরাগের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ, উঁচুমান কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস, থাইরয়েড রোগ, এর সঙ্গে সম্পর্কিত থাকতে পারে। পেশাজীবী চিকিত্সকদের ধারণা বাংলাদেশে লোকদের রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইড প্রায় বেশি মাত্রা দেখা যায়।

কখন রক্ত টেস্ট করতে হবে— ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলতে হবে, পারিবারিক ইতিহাস, জীবনযাত্রার পদ্ধতি, বয়স, জেন্ডার সব বিবেচনা করে তিনি একটা প্ল্যান দেবেন।

রক্তে পাওয়া গেল উঁচু মাত্রায় ট্রাইগ্লিসারাইড। এরপর

জানতে হবে এর কারণ কী।

এমন হতে পারে খাদ্যাভ্যাস

পরিবর্তন করে এবং জীবনযাপনে শরীরচর্চা যোগ করে সুফল

পাওয়া যাবে। তবে যকৃত্, থাইরয়েড, এসব দেহযন্ত্রের রোগ এবং ডায়াবেটিস হলেও উচ্চ মাত্রা

হতে পারে বা দুটো সমস্যা একত্রে থাকতে পারে। তখন ডাক্তার

সমস্যার কারণভেদে চিকিত্সা

দিয়ে থাকেন।

খাদ্যাভ্যাস কী পরিমাণ প্রভাব

ফেলে—

অনেক। তবে কেবল যে চর্বি বেশি খেলে হবে তা কিন্তু নয়। শরীরের ভেতরে বাড়তি শর্করা থেকেই বেশির ভাগ ট্রাইগ্লিসারাইড তৈরি হয়। চিনি, মিষ্টি, মিঠাই, শর্করাবহুল খাবার হলো মূল আসামি। তাই এর বদলে খেতে হবে জটিল শর্করা, যেমন—শাকসবজি, লাল আটার রুটি, লাল চালের ভাত। কম খেতে হবে স্যাচুরেটেড ফ্যাট। (প্রাণিজ চর্বি)। এর বদলে হিতকর চর্বি জলপাই তেল, বাদাম, বীজ ও মাছ।

শরীরের ওজনের ব্যাপারে—

শরীরে ওজন বেশি থাকলে বাড়তি ওজন ঝরিয়ে ফেললে, রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইড মান কমে অনেক সময়। এমনকি ৫-১০ পাউন্ড ঝরালেও সুফল। শরীরে পাওয়া যাবে বেশি এনার্জি, স্বাস্থ্যও হবে ভালো। তাই অতিভোজন করলে বাড়তি ক্যালোরি ট্রাইগ্লিসারাইডে পরিণত হয় ও চর্বি হিসেবে শরীরে জমা হয়।

ব্যায়াম করলে কী লাভ—

সপ্তাহে প্রায় প্রতিদিন আধঘণ্টা ব্যায়াম করলে সুফল পাবেন। নিয়মিত ব্যায়ামে রক্তে কমে ট্রাইগ্লিসারাইড, আর বাড়ে হিতকর কোলেস্টেরল এইচডিএল। হাঁটুন, সাঁতার কাটুন, সাইকেল চালান, দৌড়ান, দড়ি লাফ

করুন। হূত্স্পন্দন দ্রুত হবে। একটানা ৩০ মিনিট না করতে

পারলে ১০ মিনিট করে তিন বার করুন। মধ্যহ্ন আহার বিরতিতে হাঁটা, টিভি-শো দেখতে দেখতে ওঠবস, জগিং, ছেলেমেয়েদের নিয়ে খেলা সবটাই সুফল হবে। মদ্যপান করে থাকলে বর্জন করা অবশ্যই উচিত। মদ্যপানে কোনো লাভ নেই। উঁচু ক্যালরি ও চিনি এবং মদ্যপানে কুফল বেশি, টি.জির জন্য আরো খারাপ। অল্প পানেও টি.জি. বেড়ে যায়। ওষুধও আছে। ডায়েট, ব্যায়াম, ওজন এসব তো বজায় রেখে চলতে হবে। এতে যথেষ্ট না হলে আছে ওষুধ আর ডাক্তারের নির্দেশে।

 nঅধ্যাপক ডা.  শুভাগত চৌধুরী

পরিচালক, ল্যাবরেটরি সার্ভিসেস

বারডেম, ঢাকা