সাইফুল ইসলাম জুয়েল-এর
হিরু তখন ঢাকায় নতুন। অল্প কয়েকবার এসেছে। থেকেছেও খুব স্বল্প সময়ের জন্য। শহরের হালচাল তখনো ঠিকঠাক রপ্ত করে উঠতে পারেনি।
একদিনের ঘটনা। হিরু বিশাল এক বিল্ডিংয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। মুখভরা অবাক বিস্ময়। আসলে এমন সুউচ্চ অট্টালিকা তো আর রোজ রোজ দেখা হয় না। গ্রামে দালানই বা কয়টা।
‘উমম, বিল্ডিংটা কয়তলা...?’ হিরু শব্দ করেই গুণতে শুরু করল, ‘এক, দুই, তিন... পঁচিশ, ছাব্বিশ...’
হঠাত্ পেছন দিক থেকে হাঁক, ‘কী ভাই, কয়তলা গুনলেন?’
‘এই পঁয়ত্রিশ পর্যন্ত উঠেছিলাম। আরো ওঠার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু আপনারা হঠাত্ ডাক দিলেন...’
তিনজন মধ্যবয়স্ক লোক। হিরুর কথা শুনে তারা একটু অবাকই হলো। ‘খোদ বাংলাদেশেই তো এততলা বিল্ডিং নেই, তাহলে এই লোকটা আরো তলা পায় কোত্থেকে! তাও ভালো।’ মনে মনে নিজেদের উদ্দেশ্য চরিত্রার্থ করার জন্য একটু বেশিই খুশি হলো তারা।
‘থাক আর গুনতে হবে না। তা ঢাকায় নতুন বুঝি?’
‘এই কাঁচা-পাকা আর কি।’ হিরুর জবাব দিল।
হিরুর কথায় রহস্যের সুর থাকলেও তা আর ধরতে গেল না তারা। ‘পঁয়ত্রিশ তলা পর্যন্ত গুনেছেন। তলা প্রতি একশ টাকা। এবার সাড়ে তিন হাজার টাকা ছাড়ুন।’
হিরু অবাক হওয়ার ভান করে বলল, ‘আমি তো জানতাম তলা প্রতি এক হাজার...!’
লোকগুলো পারলে খুশিতে বগল বাজায়। ‘দিন তাহলে হাজার করেই...!’
‘সে কী বলছেন মশাই!’ হিরু এবারও অবাক হওয়ার ভান করল। ‘ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি ঢাকায় টাকা ওড়ে। কিন্তু কেউ কখনো টাকা উড়তে দেখেনি। এক মহান সাধু আমাকে সূত্রটা বলেছিলেন, ঢাকায় গিয়ে বিল্ডিং গুনতে শুরু করলেই টাকা মিলবে। আর টাকা না দিলে লোকগুলো অভিশাপে পড়বে।’ আমি তো দেখছি সাধুবাবার কথা অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেল। পঁয়ত্রিশ তলা গুনে কত্ত সহজেই না আপনাদের তিনজনের থেতে তিন পঁয়ত্রিশে একশ পাঁচ ইনটু একহাজার সমান এক লক্ষ পাঁচ হাজার টাকা পেয়ে গেলাম! এখন জলদি টাকাগুলো বের করুন।’
‘এক লক্ষ পাঁচ! এক টাকা আমরা কোথায় পাব?’
‘তাহলে শ করেই নিই। তিন সাড়ে তিন হাজারে দশ হাজার পাঁচশ। দিন, জলদি করুন।’
লোক তিনটি ততক্ষণে নেমে-ঘেয়ে একাকার। পকেট হাতরে সবমিলিয়ে হাজার পঞ্চাশ টাকা পেল তারা। শেষমেশ বলল, ‘ভাই, আপনে তো ঢাকার ওড়া টাকা পেয়ে গেলেন। কিন্তু আমরা পাইনি। দশ করেই নিন না, পিলিজ লাগে!’
হিরু টাকাগুলো হাতে নিতে নিতে বলল, ‘বেশ, এবারের মতো নিলাম। পরেরবার কিন্তু তলা প্রতি দশ টাকা করে দিয়ে পাড় পাবেন না। অভিশাপ...!’
‘ভাগ্যিস কেবল পঁয়ত্রিশ তলা পর্যন্তই গুনেছিলেন! আরো উপরে উঠলে, অত টাকা কোথায় পেতাম।’ ওখান থেকে মানে মানে কেটে পড়তে পড়তে কথাগুলো বলছিল লোকত্রয়ী।
দুই
সকাল বেলায় নগদ হাজার পঞ্চাশ টাকা হাতে আসায় হিরু গরমাগরম পরোটার লোভ সংবরণ করতে পারল না। পাশের একটা হোটেলে ঢুকে পড়ল।
খেতে খেতে হিরু লক্ষ করছিল, এক লোক বেশ মজা করে ঢাকার তেলছাড়া পরোটা গিলছে। ‘বোধহয় লোকটা ঢাকায় নতুন এসেছে!’ তার হাবভাবেই বুঝে ফেলল ও। একটু পরে বিষয়টা খোলাসা হলো অবশ্য।
বিল দেওয়ার সময় লোকটা ক্যাঁচাল বাঁধিয়ে ফেলল। ‘পানির গ্লাস প্রতি দুই টাকা করে দিতে হবে! আহা, মগের মুল্লুগ পেয়েছে! পানির আবার কিসের দাম!’
কাউন্টারের লোকটা পড়েছে বিপদে। সে বলল, ‘আমাদের হোটেলে পানি গ্লাস প্রতি দুই টাকা করে। বোতল কিনে খেতে গেলে তো ঠিকই কতগুলো টাকা দিতে হতো!’
‘আরে! পানির জন্য আবার দাম দেব কেন? আর বোতল তো বোতলই, আমাদের গ্রামে সকলে কলস ভর্তি করে পানি নিয়ে যায়। জীবনে কাউকে দাম দিতে বা চাইতে শুনলাম না!’
‘অত সব বুঝি না। আপনার তিন গ্লাস পানিসহ ছেচল্লিশ টাকা বিল হয়েছে। তাড়াতাড়ি বিল দিয়ে কেটে পড়ুন। ঢাকায় নতুন এসেছেন তো, তাই এই অবস্থা।’
‘আমি নাহয় নতুন এসেছি। কিন্তু আপনি আগ থেকে এসেও করছেনটা কী! মিয়া পরোটায় দুই টাকা করে বেশি রাখুন। কিন্তু পানির দাম কেন রাখবেন।’
ম্যানেজার কিংকর্তব্যবিমূঢ়।
‘ঢাকায় নতুন’ লোকটা ফের বলল, ‘প্রতিটি পরোটায় দুই টাকা করে বাড়িয়ে, পানির দাম ছাড়া এই নিন বায়ান্ন টাকা।’ ঢাকাটা কাউন্টারে ফেলে গটগট করে বেরিয় গেল লোকটা।
পুরো ঘটনা খেয়াল করছিল হিরু। লোকটার আচরণে অবাক হলেও, তার চিন্তাভাবনা দেখে অবাক সে। পানি দিয়ে পৃথিবীতে কত কত রাজনীতি হচ্ছে। এক দেশ নদীর পানি আটকে রাখছে, প্রতিবেশী আরেক দেশ উদার হস্তে তাদের পানি দিয়ে সাহায্য করছে। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধটা নাকি এই পানি নিয়েই বাঁধবে। তবুও লোকটা পানির ব্যাপারে কতটা পজেটিভ!
‘নাহ! ঢাকায় নতুন আসা লোকদের থেকেও অনেক কিছু শেখার আছে।’ মনে মনে বলল ও।
তিন
পেট ফাটিয়ে খাওয়া শেষে হিরু এবার লোকাল বাসে চড়ল। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পরে একটা সোনার হরিণ মিলল।
লোকাল পাসে সিট পাওয়াটা সহজ কম্ম নয়, সোনার হরিণ তুল্যই। তবে হিরু আজ সেই অসম্ভবকেই তিন তিনবার সম্ভব করেও হাতছাড়া করল। প্রথমবার সিটটা ছেড়ে দিল এক বৃদ্ধকে। দ্বিতীয়বার যেটা পেল, সেটা ছেড়ে দিল এক নারীকে। একজন হাতে ভারী বোঝা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তৃতীয়বার পাওয়া সিটটাতে ও সেই লোকটাকে বসতে দিল।
চতুর্থবার বসল। পাশের লোকটা কতক্ষণ ধরেই উসখুস করছিল। ‘নামবে বোধহয়, সেজন্যই!’ হিরু ভাবল।
নামার আগে লোকটা হিরুর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, ‘ঢাকায় নতুন বুঝি!’
হিরু কিছু বলার সুযোগ পেল না। ভিড় ঠেলতে ঠেলতে দরজার দিকে এগিয়ে গেল লোকটা।
‘কথাটা লোকটা কী জন্য বলে গেল?’ হিরু ভাবল কতক্ষণ। শেষে বুঝতে পারল, ওর ওভাবে একে একে সবাইকে সিট ছেড়ে দেওয়ার ব্যাপারটা ‘ঢাকাইয়া পুরান’ লোকটা বিশেষ পছন্দ করতে পারেনি।
আরেকজন এসে বসল ওর পাশে। বসার পর থেকেই সেও উসখুস করতে লাগল। কতক্ষণ পরপর বাইরে তাকাচ্ছে। কন্ডাকটর ভাড়া চাইতে এলে ভাড়া দেওয়ার পরে লোকটা তাকে বলল, ‘ফার্মগেটে নামিয়ে দেবেন, ঠিকাছে?’
‘ঠিকাছে।’ বললেও কন্ডাকটরকে দেখে হিরুর মনে হলো না, সে বেশিক্ষণ তার এই অতিথিটির কথা মনে রাখবে।
শাহবাগ থেকে আগুয়ান বাসটি তখন হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালের জ্যাম ছাড়িয়েছে।
পেছনের কোনো এক যাত্রী ফোনে কথা বলছে, ‘হ্যাঁ ভাই, আর বিশ মিনিট লাগবে। এই তো ফার্মগেট চলে এসেছি!’
হিরুর সহযাত্রীটি ধপ করে উঠে দাঁড়াল। ‘এই ড্রাইভার, থামাও থামাও। নামিয়ে দাও।’
কন্ডাকটর হিরুর ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে বলে উঠল, ‘আপনি না ফার্মগেটে নামবেন। সে তো দেরি আছে।’
‘ফার্মগেট আসেনি?’ নিস্তেজ গলায় বলল লোকটা। উদ্বিগ্ন। বাসের জানালা দিয়ে দেখার চেষ্টা করছে। অপরিচিত ঢাকায় ‘শাপলা চত্বরের মতো’ যদি পরিচিত কোনো কিছুর দেখা মেলে!
নিজের আসনে আর বসতে পারেনি সে। ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই সেটা দখল হয়ে গেছে। ‘দশ টাকায় তিন ঘণ্টার ঘুম হবে এখন...’ এই বলে হিরুর পাশে নতুন বসা লোকটা চোখ বুঝল।
হিরু বুঝল, ইনি লিজেন্ড। ঢাকার জ্যামকে সে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যেতে পেরেছে। আর সেই শিল্পটা হলো, লোকাল বাসে বসে নির্ভাবনার ঘুম!
তবে বেরসিক কন্ডাকটর তার ঘুমের কদর বুঝলে তো! ‘ভাড়া দিন’ বলে জাগিয়ে তুলল লোকটাকে।
এরই মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছিল লোকটা। আশ্চর্য! লাল চোখে কড়া কণ্ঠে বলল, দাঁড়িয়ে থাকতেই ভাড়াটা দিয়ে দিলাম। ওই অবস্থাতেই দ্বিতীয়বার চাইলে। এই নিয়ে তিনবার চাইতে এলে।’
কন্ডাকটরের এসব শুনতে বয়েই গেছে। সে তার স্বভাব মতো, হিরুর একটু আগের সহযাত্রীটির কাছেও ভাড়া চাইল।
সে বেচারা কাচুমাচু হয়ে আছে। বলল, ‘ওখানে বসে একবার ভাড়া দিয়েছিলাম, ভাই। আবারও কি দিতে হবে?’
‘কোথাকার ভাড়া দিয়েছেন? শাহবাগের? এখন আবার কতদূর যাবেন? সেই ভাড়া দিন।’
‘ভাই, আমি তো ফার্মগেটের ভাড়াই দিয়েছিলাম...।’
‘ওহহ, আপনে সেই যাত্রী! ফার্মগেট চলে আসছে প্রায়। গেটের দিকে আগান।’
বাসটি বাংলামোটর মোড়ে এসে জ্যামে থামতেই হেল্পার চেঁচাতে লাগল, ‘কাওরান বাজার, ফার্মগেট, বনানী...’
‘ফার্মগেট চলে আসছে!’ লোকটা নিজে থেকেই বাংলামোটরেই নেমে গেল।
হিরু লোকটা কিছু বলার সুযোগ পেল না। বাস ছেড়ে দিয়েছে।
চার
হিরু ঢাকার যেই এলাকায় এসে উঠেছে, সেখানকার এক চাওয়ালার সঙ্গে বেশ ভাব হয়ে গেছে ওর। সেখানে চা খেতে গিয়েই আরেকটা ঘটনা শুনল ও।
‘এত তাড়াতাড়ি কীভাবে এলে!’ হাতে-পিঠে ব্যাগ—এমন একজনকে জিজ্ঞেস করল আরেকজন।
‘পুরো পথ হেঁটে আসতে হলো কিনা। ক্যান, বাসে এলে আরো দেরি হতো বুঝি?’
‘বাসে এলে মিনিমাম আরো দুই-তিন ঘণ্টা লাগত। তা হেঁটে আসছ ক্যানো? রাস্তায় বাস চলে না?’
‘তা চলবে না কেন!’
‘তাহলে?’
‘আর বইলো না। গাবতলী নামতেই দেখি মানিব্যাগ হাওয়া। এখন টাকা ছাড়া বাসে কী করে চড়ি, বলো?’
প্রথম লোকটা বাঁকা হাসি হেসে বলল, ‘তুমি আসলেই মফিজ রইয়া গেলা। বাসঅলারে টাকা নাই বললেই হইতো। ভাড়া চাইত না।’
ঢাকায় নতুন লোকটা কী বলবে ভেবে পেল না।
‘মজার কাহিনি শুনবা?’ প্রথম লোকটা বলল, ‘মাসের শেষের দিকে আমি প্রায় সময়ই বাসভাড়া না দিয়াই চলাফেরা করি। আর তুমি এই একটা দিনও চলবার পারলা না। অবশ্য ঢাকায় নতুন আসলে এমন হইবারই কতা। কয়েকটা দিন থাকলে পরে, তুমিও চালাক হইয়া যাইবা।’
‘হ, সেই সাথে বিবেকও বেচে দিবে।’ পাশে বসে চা খেতে খেতে হিরু স্বগতোক্তি করল।
