অবসাদের সমাধান ভেতর থেকে বাইরে

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০১৯, ২১:১৯

প্রশ্ন:আমাদের চারপাশে দেখতে পাই, অবসাদ সবার মধ্যে একটা স্বাভাবিক আবেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং মানুষকে তার মাশুল দিতে হচ্ছে। আমরা কীভাবে এই পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেব, যেটা কি না অনিবার্য এবং অনবরত ঘটেই চলেছে?

উত্তর : যখন আপনি একবার এটা ঘোষণা করে দিচ্ছেন যে অবসাদ একটা স্বাভাবিক, প্রাকৃতিক ব্যাপার, তখন আর এর বাইরে যাওয়ার উপায় নেই। যখন আপনি একজন শিশু ছিলেন, স্বাভাবিকভাবে আপনি হাসিখুশি থাকতেন, অবসাদগ্রস্ত নয়। সুতরাং অবসাদকে স্বাভাবিক বলে ঘোষণা করবেন না।

অবসাদের অর্থ হলো আপনার মধ্যে জীবনের উচ্ছ্বাসকে বজায় রাখতে আপনি অসমর্থ। এর প্রভাব আপনার শরীরেও পড়ে। যদি আপনি অবসাদগ্রস্ত হন তাহলে শুধু মনই নয়, শরীরটাও অক্ষম হয়ে পড়ে। আপনার ভেতরের প্রাণশক্তি উচ্ছ্বসিত নয়, উচ্ছ্বাস হারিয়ে এটা ঝিমিয়ে পড়েছে, কারণ এটার সঙ্গে আপনি ঠিক কাজ করছেন না। আপনি বাইরের অনেক কিছু ফালতু জিনিস ভেতরে চাপিয়ে দিচ্ছেন। আপনার জীবনীশক্তিকে উদ্দীপ্ত রাখার জন্য আপনি কিছুই করেননি।

অবসাদের উত্স

অবসাদ একরকমের যন্ত্রণা। যদি আপনার জীবন আনন্দের জায়গায় যন্ত্রণায় পরিণত হয়ে থাকে, এর কারণ আপনার জীবনীশক্তির একটা বড়ো অংশ সচেতনভাবে ঘটছে না, প্রবৃত্তিগতভাবে ঘটছে। বাইরের পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া হিসেবে এটা ঘটছে। একবার যদি আপনি প্রবৃত্তিগতভাবে কাজ করতে থাকেন, অবসাদগ্রস্ত হওয়া খুবই স্বাভাবিক, কারণ বাইরের পরিস্থিতি কখনই ১০০ শতাংশ আপনার নিয়ন্ত্রণে নয়। পৃথিবীতে অনেক কিছু ঘটে চলেছে। যদি আপনি প্রবৃত্তিগতভাবে প্রতিক্রিয়া করেন, তাহলে খেই হারিয়ে শোচনীয় অবস্থা হওয়া স্বাভাবিক। সেক্ষেত্রে, যত বেশি জীবনের সম্মুখীন হবেন আপনি, ততই শোচনীয় অবস্থা হবে আপনার।

যখন মানুষ আর বাইরের জীবন সামলাতে পারে না, তারা জীবনটা ছোট গণ্ডির মধ্যে গুটিয়ে নেয়। কিন্তু সেটাও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, যায় না কি? আপনার ভেতরের একটা অংশ নিরন্তর প্রসারিত হতে চাইছে, আপনি অবিরত আপনার কাজের সীমা ও ক্ষেত্র বৃদ্ধি করতে চাইছেন। আবার আপনার মধ্যে অন্য একটা অংশ রয়েছে যেটা অবসাদগ্রস্ত হয়ে যাচ্ছে, যখনই কোনো কিছু আপনার ধারণার হিসেবে হচ্ছে না। অবসাদগ্রস্ত তখনই হয়ে পড়েন যখন আপনার প্রত্যাশা পূরণ হয় না।

আজকে যদি স্টক মার্কেট নিচে নেমে যায়, অনেক মানুষ অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়বেন। তাদের মধ্যে অনেকেই হয়তো টাকাটা কখনো স্পর্শই করেননি, কিন্তু প্রতিদিন তারা রেখাচিত্রের ওপরে ওঠা দেখছেন আর তাদের মেজাজও ভালো থাকছে। এখন যদি রেখাচিত্র নিচে নেমে যায় তাদের মেজাজও খারাপ হয়ে যাবে। কারণ, তারা যা ঘটবে বলে প্রত্যাশা করছেন, তা ঘটছে না।

ভেতরটা ঠিক রাখা

নানা কারণে মানুষের মনে অবসাদ ঘটতে পারেন। মানুষ যেটা মূল্যবান বলে মনে করে, সেটা যদি কেউ সরিয়ে নেন, মানুষ অবসাদগ্রস্ত হয়ে যায়। অনেক মানুষের ক্ষেত্রেই এটা দুঃখজনক ঘটনা, বিশেষ করে প্রাচুর্যপূর্ণ সমাজে—যে তাদের সবকিছু থেকেও কিছুই নেই। অবসাদের অর্থ হলো কোথাও একটা আশাহীনতা ঢুকে পড়েছে। আপনি যদি কোনো দরিদ্র গ্রামে যান, দেখবেন তারা সত্যিই হতদরিদ্র, কিন্তু আপনি হাসি-খুশি মুখ দেখতে পাবেন, কারণ তাদের আশা আছে যে আগামীকাল ভালো হবে। প্রাচুর্যপূর্ণ সমাজে সেই আশা চলে গেছে। অবসাদ এসে বসেছে কারণ বাইরের থেকে যা কিছু করা যায়, সবকিছু করা হয়ে গেছে। খাবার আছে, বাড়ি আছে, জামা-কাপড় আছে, সবকিছুই আছে, কিন্তু তবুও কিছু একটা গোলমাল। শুধু তারা জানে না, সেটা কী।

একজন গরিব মানুষ হয়তো ভাববে— ‘আগামীকাল যদি আমি একজোড়া নতুন জুতো পাই, সব ঠিক হয়ে যাবে।’ যদি তিনি একজোড়া জুতো পান, মুখে একগুচ্ছ খুশি নিয়ে রাজার মতো হাঁটবেন, কারণ তার আশা আছে। তার বাইরের জগত্টা এখনও ঠিক করা বাকি! সমৃদ্ধশালী সমাজে বাইরেরটা ঠিক করা হয়ে গেছে, কিন্তু  ভেতরটা ঠিক করা হয়নি, তাই সেখানে নিরাশা এবং অবসাদ।

বাইরের জন্য কাজ করার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের অবশ্যই ভেতরটাও ঠিক করতে হবে। তবেই জগত্টা সুন্দর হয়ে উঠবে। আমরা যেটা আধ্যাত্মিকতা বলি, সেটা কেবল এটাই—আপনার জীবনের কেবল বস্তুগত দিকটিই ঠিক করা নয়, আপনি যা তার আত্মিক দিকটারও যত্ন নেওয়া। যদি সেটার যত্ন না নেওয়া হয়, আপনার সবকিছু থেকেও কিছুই থাকবে না।

n সৌজন্যে : ঈশা ফাউন্ডেশন