নিম্নমানের বিটুমিনে নষ্ট হচ্ছে সড়ক

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০১৯, ২২:২৯

বিদেশ থেকে নিম্নমানের বিটুমিন আমদানির সুযোগ দেওয়ায় সড়কে নিম্নমানের বিটুমিন ব্যবহার হচ্ছে। এরফলে দেশের সড়কগুলোর কার্পেটিং দ্রুত উঠে যাচ্ছে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় থেকে ৬০-৭০ গ্রেডের বিটুমিন ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা থাকলেও মাঠপর্যায়ে তা মানা হচ্ছে না। এতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সড়কগুলো টেকসই হচ্ছে না।

২০১৫ সালে মন্ত্রণালয় থেকে এই সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারির চার বছর পরও তা কার্যকর হয়নি। বিটুমিন ব্যবহারের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফেরেনি। উলটো ইরান থেকে মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশ হয়ে আনা নিম্নমানের বিটুমিনের ব্যবহার হচ্ছে। ড্রামভর্তি করে এসব বিটুমিন দেশে এনে গলিয়ে বাল্কে বিক্রি করা হচ্ছে। আগে চট্টগ্রাম বন্দরের আশেপাশে এ ধরনের বিটুমিন গলানো হলেও ইদানিং খোলা জায়গায় রীতিমতো চুল্লি বসিয়ে বিটুমিন গলানো হলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর নেই।

নিম্নমানের ইরানি পাতলা বিটুমিন অনেকটা নামমাত্র মূল্যে আমদানি করা হয়। দেশে আনার পর আমদানিকারকরা তা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি ও অন্য বৈধ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের বিটুমিনের চেয়ে কিছুটা সস্তা দামে বিক্রি করেন। দামে সস্তা হওয়ায় অনেক ঠিকাদার এই বিটুমিন ব্যবহার করেন। এসব বিটুমিন দেখতে অতি কালো। ফলে আপাতদৃষ্টিতে কার্পেটিংয়ের পরে দেখতে অনেক ভালো মনে হয়। ফলে শুকনো মৌসুমের কিছুদিন সড়ক ভালোও থাকে। কিন্তু বর্ষা মৌসুম শুরু হলেই তা দ্রুত গাড়ির চাকার সঙ্গে উঠে গিয়ে খানা খন্দের সৃষ্টি হয়। আবার অতিরিক্ত গরমে গলে গিয়েও সড়কের ওপরের কার্পেটিং এবড়োথেবড়ো হয়ে যায়।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে দুই জায়গায় এবং নোয়াখালীতে প্রকাশ্যে সড়কের কাছে নিম্নমানের বিটুমিন গলানো হচ্ছে। বর্ষার শেষে সড়ক সংস্কারের লক্ষ্যে একযোগে কাজ শুরু করেছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ, স্থানীয় সরকার বিভাগ ও বিভিন্ন সিটি করপোরেশন এবং পৌর কর্তৃপক্ষ। নিম্নমানের বিটুমিন আমদানিকারকরা এই সময়টিকেই বেছে নিয়েছেন। সীতাকুণ্ডের ছোটো কুমিরা, বারো আউলিয়া এলাকায় রবিউল হোসেন ও সুমন ড্রামের বিটুমিন দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করেন। এর বাইরে নোয়াখালী পৌরসভা এলাকায় এজে করপোরেশনের মোশাররফ হোসেনও একই কাজ করেন বলে জানা গেছে। তবে রবিউল হোসেন দাবি করেন, তিনি বিভিন্ন আমদানিকারকের কাছ থেকে বিটুমিন কিনে তা গলিয়ে বাল্কে সরবরাহ করেন। নিজে আমদানি করেন না। সীতাকুণ্ডের ভারপ্রাপ্ত ওসি শামীম শেখ বলেন, বিটুমিনের ড্রাম গলানোর ব্যাপারে তিনি অবগত নন।

বাংলাদেশে বছরে বিটুমিনের চাহিদা চার লাখ টনের মতো। এরমধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি (ইআরএল) উত্পাদন করে ৭০ হাজার টনের মতো। বে-টার্মিনালসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বৈধভাবে বাল্কে বিটুমিন আমদানি করে থাকে। ইআরএল ও বে-টার্মিনাল বিটুমিনের গুণগত মান ঠিক রেখেই তা বাজারজাত করে।

ইআরএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. আক্তারুল হক বলেন, ‘সড়কের কার্পেটিং অনেক কারণে নষ্ট হতে পারে। তবে গুণগত মানসম্পন্ন বিটুমিন ব্যবহার হলো প্রধান শর্ত। আমরা শুনেছি কিছু আমদানিকারক উলটা পালটা বিটুমিন দেশে আমদানি করে গলায়। এ ব্যাপারে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।’

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ড্রাম বিটুমিন আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের কিছু বাধ্যবাধকতা আছে। কিন্তু নজরদারির অভাবে এসব বাধ্যবাধকতা মানছেন না আমদানিকারকরা। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞা থাকায় সেখান থেকে সরাসরি বিটুমিন আমদানি করা যায় না। এ জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিভিন্ন বন্দর ব্যবহার করে নিম্নমানের বিটুমিন আমদানি করা হচ্ছে।

ড্রামভর্তি বিটুমিন গলানোর ক্ষেত্রে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের নিয়ম মানা হচ্ছে না। বিটুমিন গলানোর সময় অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি থাকে। কারণ আগুন লাগলে নিম্নমানের এই ধরনের বিটুমিন দ্রুত গলে যায়। আর এই বিটুমিনের আগুন পানি দিয়ে নেভানো যায় না, ফোম দিয়ে নেভাতে হয়। কিন্তু দেশে বিমানবন্দরগুলোর বাইরে ফোম দিয়ে আগুন নেভানোর ব্যবস্থা অপ্রতুুল।