স্ত্রী-সন্তানকে বিষ খাইয়ে আত্মহত্যার কথা লিখে যান বায়েজিদ

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০১৯, ২২:৩০

বিশ বছর আগে প্রেম করে বিয়ে করেছিলেন সরকার মোহাম্মদ বায়েজিদ। কিন্তু পরিবার তাদের বিয়ে মেনে নেয়নি। ফলে পরিবার থেকে আলাদা থাকতে হয়েছে।  শুধু এখানেই শেষ নয়। একের পর এক ব্যবসা পরিবর্তন করেছেন। কিন্তু লাভের মুখের দেখা পাননি। প্রতিবারই গুনতে হয়েছে লোকসান। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন, বন্ধু-বান্ধব থেকে টাকা ধার করেছেন। শোধ করতে পারেননি। শেষটায় ঋণভার থেকে মুক্তি পেতে স্ত্রী ও কলেজ পড়ুয়া ছেলেকে বিষ খাইয়ে মেরেছেন। এরপর নিজে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। মৃত্যুর আগে এভাবেই চিরকুটে বর্ণনা করেছেন তিনি।

গত বৃহস্পতিবার মিরপুর ১৩ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের ৫ নম্বর সড়কের ১০/১ নম্বর বাড়ির একটি ফ্ল্যাট থেকে বাবা মো. বায়েজিদ (৪৭), মা কোহিনুর বেগম অঞ্জলী (৪১) ও ছেলে ঢাকা কমার্স কলেজের ছাত্র ফারহানের (১৭) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় কোহিনুর বেগম অঞ্জলীর ভাই ফারুক আহমেদ কাফরুল থানায় অপমৃত্যুর মামলা করেছেন।

পুলিশ ও বায়েজিদের স্বজনরা জানিয়েছেন, স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানকে  নিয়ে বসবাস করতেন বায়েজিদ। মূলত গার্মেন্টস ব্যবসায়ী ছিলেন তিনি। তবে জীবিকার তাগিদে ফাস্টফুডের দোকান, গার্মেন্টস এক্সেসরিসের ব্যবসাসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা করেছেন। তবে কোনো ব্যবসাতেই বায়েজিদ লাভ করতে পারেননি। একদিকে ব্যবসায় লোকসান, অন্যদিকে ঋণের পাল্লা ভারী হওয়ায় হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন তিনি। আর এ হতাশা থেকেই স্ত্রী ও সন্তানকে বিষ খাইয়ে হত্যার পর সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন সরকার বায়েজিদ। মৃত্যুর আগে ঘরের দেওয়ালে ও কাগজে লিখে গেছেন ৫০টির বেশি সুইসাইড (চিরকুট) নোট। 

অঞ্জলীর মামাতো ভাই কিবরিয়া হোসেন ইনতি জানিয়েছেন, বায়েজিদ  মূলত গার্মেন্টসের ব্যবসা করতেন। কিন্তু সেটিতে লোকসান হয়। এরপরও তিনি নানা ধরনের ব্যবসা করেছেন। তবে কোনোটিতে লাভের মুখ দেখেননি। এছাড়া আমরা শুনেছি তিনি বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। বারবার ব্যবসায় লোকসান হওয়ার কারণে তিনি  হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন।

চিরকুটের বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা ঘরের বাইরে ছিলাম, পুলিশ ছিল ভেতরে। বাইরে থেকে যতটুকু দেখেছি, দেওয়ালে লেখা ছিল, ‘স্যরি’, আবার অন্য জায়গায় লেখা ছিল, ‘আজ আমার ছেলের জ্বর, তাই কোচিংয়ে যেতে পারল না, স্যরি স্যার।’ আরো অনেক কথা লেখা ছিল। সব দেখতে পারিনি।

ওসি সেলিমুজ্জামান বলেন, বাসায় গিয়ে আমরা দেখতে পাই ছেলে এবং স্ত্রী বিছানায় পড়ে আছেন।  আর বায়েজিদ সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ফাঁস দিয়ে ঝুলে আছেন। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়া গেলে মৃত্যুর আসল কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

তিনি জানান, ঐ বাসা থেকে ৫০টির মতো চিরকুট পাওয়া গেছে। ঘরের বিভিন্ন দেওয়ালে কলমের কালি দিয়ে লেখা, ছোটো ছোটো কাগজে, বিভিন্ন আসবাবপত্রেও লেখা পাওয়া গেছে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা চিরকুটের বিষয়ে বলেন, একটি চিরকুটে লেখা ছিল ‘আমাদের এই মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। আমি প্রথমে আমার স্ত্রী ও সন্তানকে বিষ খাওয়ালাম। নিজেও আত্মহত্যা করলাম।’

ডিএমপির মিরপুর জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) খায়রুল আমিন জানিয়েছেন, বায়েজিদ ঋণগ্রস্ত ছিলেন কি না অথবা কোনো ব্যাংক তার নামে মামলা করেছিল কি না, এসব তথ্য এখনই বলা সম্ভব হচ্ছে না। এ বিষয়গুলো তদন্ত করে দেখা হবে। যে চিরকুট উদ্ধার করা হয়েছে তা দেখে ধারণা করা যায়, তাদের সংসারে অর্থের টানাপড়েন ছিল।