ঐতিহাসিক নিদর্শন মুড়াপাড়া জমিদারবাড়িসহ প্রকৃতির সান্নিধ্য পাওয়া ও দেখার জন্য মটরবাইকে ছুটলাম আমরা দু’জন। তারিখটি ছিল ১০ আগস্ট। আর সঙ্গী দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের সদস্য মারুফ। সকাল পৌনে ৯টায় অ্যাভেঞ্জার বাইক স্টার্ট। সাভার, আশুলিয়ার পথে বাইক ছুটছে। গাজীপুর হয়ে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ। পুরো পথটাই যেন প্রকৃতির সন্তান। রূপসী গিয়ে বামে মোড়। কিছুক্ষণ চলার পরই, মুড়াপাড়া জমিদার বাড়িতে কষে একখান ব্রেক। প্রথম দর্শনেই চোখ জুড়িয়ে যায়। বাড়ির পুরো দেয়ালজুড়ে দৃষ্টিনন্দন কারুকার্য। সামনে-পেছনে রয়েছে শাণ বাঁধানো পুকুর। বিশাল উঠোন। ১৮৮৯ সালে জমিদার রাম রতন ব্যানার্জী এই বাড়িটির নির্মাণ শুরু করেন। আর শেষ করেন তার নাতি জগদীশ চন্দ্র ব্যানার্জী । জগদীশ চন্দ্র ব্যানার্জীর দাদা রাম রতন ব্যানার্জী ছিলেন নাটোর এস্টেটের কোষাধ্যক্ষ। তিনি ছিলেন খুবই সত্ একজন মানুষ। তার সততার কারণেই উচ্চতর পদে অসীন হয়েছিলেন। কথিত আছে, তিনি শুধু বাড়িটির ভিত্তি ও কাঠামো স্থাপন করেছিলেন। তার মৃত্যুর পর ছেলে প্রতাপ চন্দ্র ব্যানার্জী পুরোনো বাড়ি ছেড়ে পেছনে গিয়ে বাড়ি নির্মাণ করেন। ১৯০৯ সালে বাড়িটি সম্পন্ন হওয়ার পর এলাকার জনপ্রিয় ব্যক্তি জগদীশ চন্দ্র ব্যানার্জী নিজেই জমিদার হন। তিনি ছিলেন দিল্লির দু-বারের নির্বাচিত কাউন্সিলর। তার আমলে প্রজাদের সুযোগ সুবিধার জন্য অনেক কিছুই তৈরি করেছিলেন। সেইসঙ্গে শাসক হিসেবেও ছিলেন অনেক কঠোর। প্রজারা ঠিকমতো খাজনা পরিশোধ না করলে ধরে এনে চুল কেটে দিতেন। অবাধ্য প্রজাদের বাড়িঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিতেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় জমিদার জগদীশ চন্দ্র ব্যানার্জী কলকাতা চলে যান। দ্বিতীয় তলা বিশিষ্ট জমিদার বাড়িতে রয়েছে শতাধিক কক্ষ। আরো রয়েছে পুরাতন সব বৃক্ষ। ৪০ একরের জমিদার বাড়িটি এখন মুড়াপাড়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ভবন হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে। বাড়ির সামনে যতটা আকর্ষণীয়, ঠিক তার উল্টো পেছনের অংশটা। দিনের আলোতেই ভূতুড়ে পরিবেশ। জরাজীর্ণ ভগ্নদশায় থাকা ইমারতে চললো খানিকটা সময় ফটোসেশন। অতঃপর স্থানীয় তরুণদের সঙ্গে কিছুক্ষণ আড্ডা, আবারো ছুটে চলা। বাইক চলছে। যে পথে যাই সেই পথে না ফিরে অন্যপথে চলি। এতে ভ্রমণের মজাই আলাদা। নতুন কিছু দেখা ও চেনা যায়। চলতে চলতে রূপগঞ্জের ফেরিতে ভেসে, ৩শ’ ফিট পেরিয়ে জিন্দা পার্কের সামনে। স্থানীয় এক মসজিদে নামাজ আদায় করে বসে যাই পথের পাশে এক হোটেলে। লাকড়ির চুলোয় রান্না করা। ভাত-ভর্তা, ডাল, গোস্ত আর বাইম মাছ। সাধের কথা আর না-ই লিখলাম। জাস্ট ৫ জনের ভাত দু’জনেই সাবাড়। খাবার শেষে ভাবলাম জিন্দা পার্কে হ্যামোকে ঝুলবো। মারুফের বাঁধায় তা আর হলো না। বাইক স্টার্ট, তরিকুলের ডাকে ছুটলাম হাওড় পানে। আজ এই পর্যন্তই। অন্য আরেক সংখ্যায় লিখবো হাওড় ভ্রমণের গল্প।
গুলিস্তান, সায়েদাবাদ থেকে নারায়ণগঞ্জ জেলার ভুলতা পর্যন্ত বিভিন্ন পরিবহনের বাস সার্ভিস রয়েছে। রূপসী বা ভুলতা বাসস্ট্যান্ড থেকে সিএনজিতে মুড়াপাড়া জমিদারবাড়ি যাওয়া যায়।
