মাছ ধরার বাহন খলশানি

আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০১৯, ১৯:৩৪

বর্ষা ঋতু বাংলাদেশের অন্যতম একটি বিশেষ ঋতু। এই ঋতুতেই আগমন ঘটে রিমঝিম বৃষ্টির। দিনরাত অঝরে ঝরতে থাকে আকাশের বৃষ্টি। নদী-নালা, খাল-বিল ও পুকুর-ডোবা ফিরে পায় তাদের হারানো যৌবন। প্রকৃতিতে লাগে নতুনের ছোঁয়া। এই বৃষ্টি আর বর্ষাকে নিয়ে কালে কালে কত কবি-সাহিত্যিক সৃষ্টি করেছে নানা কবিতা, গল্প ও উপন্যাস। তৈরি হয়েছে বিখ্যাত সিনেমা।

আর এর সঙ্গে নওগাঁর বর্ষা মৌসুমের বৃষ্টির আগমনী বার্তায় বিভিন্ন হাট বাজারে দেশি প্রজাতির ছোট জাতের মাছ ধরার জন্য গ্রামবাংলার সহজলভ্য প্রাচীনতম উপকরণ বাঁশের তৈরি খলশানি (চাঁই) বিক্রির ধুম পড়েছে। জেলার বিভিন্ন হাট বাজারে প্রতিদিন শতশত খলশানি বিক্রি হচ্ছে। এই খলশানি মাছ ধরার একটি সহজলভ্য হওয়ার কারণে প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষের কাছে এর চাহিদা অনেক বেশি। শখের বসে বাড়ির পাশে খালে কিংবা বিলে মাছ ধরার জন্য এই খলশানি বা চাঁইয়ের চাহিদা এখনো রয়েছে। আর এই চাঁই বা খলশানি তৈরি করে এখনো জেলার কয়েকশ’ মানুষ জীবিকানির্বাহ করছে।

জেলার আত্রাই উপজেলা হচ্ছে মাছের ভাণ্ডার। এই উপজেলার বেশিরভাগ লোকই এই মাছের সঙ্গে জড়িত। তাদের জীবন-জীবিকা মূলত নদী, খাল, বিল থেকে মাছ আহরণের ওপর নির্ভরশীল। উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজার ঘুরে দেখা যায় হাট-বাজারগুলোতে প্রতিদিন শতশত খলশানি বিক্রি হচ্ছে। সম্প্রতি উপজেলার ঐতিহ্যবাহী আহসানগঞ্জ হাটে ও রাণীনগর উপজেলার ত্রিমোহানী বাজারে খলশানি পট্টিতে বেচা-কেনার জন্য জনসাধারণের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।

জানা যায়, আত্রাই উপজেলার সিংসাড়া, মিরাপুর ও রাণীনগর উপজেলা নিজামপুর, ঝিনা, খট্টেশ্বর, কৃষ্ণপুর-মালঞ্চিসহ বিভিন্ন গ্রামের ঋষি সম্প্রদায়ের লোকেরা তাদের স্ত্রী, পুত্র, কন্যাসহ পরিবারের সকল সদস্য মিলে এই বর্ষা মৌসুমে তাদের নিপুণ হাতের তৈরি খলশানি উপজেলার আহসানগঞ্জ, কাশিয়াবাড়ি, সুটকিগাছা, পাইকরা, বজ্রপুর, বান্ধাইখাড়া, মির্জাপুর-ভবানিপুর ও রাণীনগর উপজেলার ত্রিমোহানী, আবাদপুকুরসহ বিভিন্ন ছোট-বড় হাটে বিক্রির জন্য পসরা সাজিয়ে ক্রেতার অপেক্ষা করেন।

বাঁশ, কটের সুতা এবং তাল গাছের আঁশ দিয়ে তৈরি এসব খলশানি মানের দিক দিয়ে ভালো হওয়ায় স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের অঞ্চল ভেদে বিশেষ করে হাওড় অঞ্চলের মাছ শিকারিরা এসব হাট-বাজার থেকে পাইকারি মূল্যে নিয়ে যায়। ফলে এ পেশায় জড়িত পরিবারগুলো বর্ষা মৌসুমে এর কদর বেশিও যথাযথ মূল্য পাওয়ায় মাত্র ২-৩ মাসেই খলশানি বিক্রি করে তারা প্রায় বছরের খোরাক ঘরে জোগার করে নেয়। লাভ খুব বেশি না হলেও বর্ষা মৌসুমে এর চাহিদা থাকায় রাতদিন পরিশ্রমের মাধ্যমে খলশানি তৈরি করে তারা বেজায় খুশি। একদিকে যেমন সময় কাটে, অন্যদিকে লাভের আশায় বাড়ির সকল সদস্য মিলে খলশানি তৈরি কাজ করে অভাব অনটনের কবল থেকে একটু সুখের নিঃশ্বাস ফেলে।

রাণীনগর উপজেলার কাশিমপুর ইউনিয়নের ঋষিপাড়ার কারিগর সুকান্ত মণ্ডল, জলিল মণ্ডলসহ অনেকেই বলেন, এসব খলশানি তৈরিতে প্রকারভেদে খরচ হয় ৭০ থেকে ২শ’ টাকা। আর বিক্রি হয় ১-৩শ’ টাকা পর্যন্ত। এতে করে খুব বেশি লাভ না হলেও পৈতৃক এ পেশা ছাড়তে তারা নারাজ। তবে আধুনিকতার উত্কর্ষের তৈরি ছোট জাতের মাছ ধরার অবৈধ নিষিদ্ধ সুতি, ভাদায় ও কারেন্ট জালের দাপটের কারণে দেশি প্রযুক্তির বাঁশের তৈরি খলশানি সামগ্রী এমনিতেই টিকে থাকতে পারছে না। তবে প্রশাসন যদি মাছ ধরার জন্য এই সব অবৈধ নিষিদ্ধ উপকরণ ব্যবহারে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে তাহলে পরিবেশবান্ধব এই চাঁই বা খলশানির চাহিদা আরো বৃদ্ধি পেতো আর তারাও স্বচ্ছলভাবে পরিবার-পরিজন নিয়ে জীবনযাপন করতে পারতো। আর এই চাঁই বা খলশানি দিয়ে মাছ ধরলে কোনো মাছ নিধনও হতো না, ঠিকঠাক মাছের বংশও বৃদ্ধি পেতো। 

তারা আরো বলেন, জীবনের তাগিদে আমরা একেবারে কর্মহীন থাকতেও চাই না। তবে সরকারি-বেসরকারি পৃষ্টপোষকতা ও সহযোগিতা পেলে এবং মৌসুমের আগে বেশি পরিমাণ খলশানি মজুত করতে পারলে লাভ ভালো হয়।

আত্রাই উপজেলার সিংসাড়া গ্রামের কৃষ্ণকুমার, গৌতম পালসহ একাধিক খলশানি বিক্রেতা বলেন, খলশানি তৈরির সামগ্রীর দাম আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। তাই আগের মতো আর লাভ হয় না। দীর্ঘদিন থেকে এ ব্যবসায় জড়িত তাই ছাড়তেও পারছি না। তারা বর্ষা এবার আগাম শুরু হওয়ায় খলশানির কদরও বেড়েছে। তাই হাট-বাজারগুলোতে খলশানি বিক্রির ধুম পড়েছে।