শেষ কথা! কেন এমন কথা হয়

আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০১৯, ১৯:৩৫

শেষ চিঠি গানটির গল্পটা খুব সরল। আমার জন্য অবাক করার একটি দিন। হঠাত্ করেই আমাকে ভয়ে বুথে ডাকলেন। বললেন, এই গানটি গা। যেহেতু বসের সঙ্গে বাজাতাম। তাই সুরটা তো জানতাম। কিন্তু যখন আমাকে বললেন, এই গানটা তোর ভয়েসেই যাবে। তখন হাত-পা অবশ হয়ে যেতে লাগলো। আমি বললাম পারবো না। বস, সাহস দিলেন। খুব পারবি। তুই গা। এরপর গানটি তো দারুণ প্রশংসিত হলো। সেই থেকেই গাইছি অথচ স্মৃতি হয়ে যাওয়ার ১টি বছর হয়ে গেল! অকস্মাত্ মৃত্যু বা অকাল প্রয়াণ এই দুটি শব্দের উত্পত্তি হয় তখনই যখন মানুষের ভালোবাসার দারুণ এক জায়গায় থাকে সে মানুষ। যার অবর্তমানে মনের ভেতরে বেদম এক হাহাকার গড়ে ওঠে! আইয়ুব বাচ্চু তেমনই একটি নাম। নয়তো নিয়ত জীবনের খাতায় তো সবসময়ই আমরা বলি, জন্ম-মৃত্যু-বিয়ে সবই পূর্ব নির্ধারিত। অথচ কারো কারো মৃত্যু তবুও যেন অসময়ের বিয়োগ। বড় কষ্টের এই হারানোর ব্যথা।

ব্যক্তিগতভাবে এই মানুষটির সহচার্য বা একসঙ্গে গানের কিছু কাজ, কিছু স্মৃতির স্মারক হিসেবে থাকার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। তাই ভাবতেই অবাক লাগে গত ১ বছর হতে চললো রক গানের এই মহীরূহ আর আমাদের মাঝে নেই।

এই একটি বছরে আইয়ুব বাচ্চুর না থাকা বছরে একাধিক ইন্টারভিউতে আমি অনেক তারকার কাছে জানতে চেয়েছি শেষ কবে কথা হয়েছিল? শেষ কবে দেখা হয়েছিল আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে?

মূলত একটা মানবজনম তো জানেই না তার প্রিয় বা অপ্রিয় মানুষের সঙ্গে কবে কখন হবে শেষ সাক্ষাত্! তাই সেসব স্মৃতি হয়ে থাকে অমূল্যের খাতায়। যেন ‘ইশ যদি বুঝতাম আর পাবো’ এই আফসোসের বিয়োগ গানে!

তাই জয়া আহসান, চঞ্চল চৌধুরী থেকে শুরু করে গানের এস আই টুটুল, আসিফ আকবর, লতিফুল ইসলাম শিবলী বা হাসানসহ প্রায় অর্ধশত তারকা সকলের কাছেই এমন স্মৃতিচারণের কথা যখন জানতে চেয়েছি তখন তারা মনের ভেতরে এক হাহাকার পুষেছেন। বলেছেন, ‘আহারে! তার সঙ্গে তো অনেক কথা-ই বাকি রয়ে গেছে আমার!

‘দুখিনী রাত’ নামে আমার একটি ঈষত্ জনপ্রিয় একটি গান রয়েছে। যা আমার পরিচিত বন্ধুমহলে ও অল্প ক’জন শ্রোতামহলে বেশ সমাদৃত। আমার লেখা এই গানটি তৈরির সময় ছিল মধ্যরাত। ঈদের মৌসুম। অ্যালবাম জমা দিতে হবে কোম্পানিতে। বাচ্চু ভাইয়ের তখন রাতদিন একাকার ব্যস্ততা। একসঙ্গে অনেকগুলো কাজ করছেন। জিঙ্গেল, স্টেজ শো, ব্যান্ডের প্র্যাকটিস, এরপর ঈদের একাধিক অ্যালবামের কাজ। আমাকে বললেন, ‘তোর গানটা তো রাতের মুডের। তোর থাকতে হবে আজ কিচেনে। থেকে যা।’

আমি তো এমনিতেই রাজি। কিচেন অর্থাত্ এবি কিচেন। তার সঙ্গে সময় কাটানো তো অন্যরকম ভালোলাগার। অথচ একটা মানুষ, তাকে দেখে মনেই হয় না তিনি সংসার করেন কখন। পরিবার থেকে বিশেষ করে চন্দনা ভাবীর কাছ থেকে তেমনই সাপোর্ট পেয়েছিলেন বলেই একজন আইয়ুব বাচ্চুকে আমরা কখনো ঢাকায় থাকাকালীন স্টুডিওতে না পাওয়া হয়নি!

যাই হোক, পত্রিকা অফিসের কাজ শেষ করে আমি সেই সন্ধ্যায় হাজির। আজ থেকে প্রায় ১১ বছর আগের কথা বলছি। স্টুডিওতে বসে আছি। এবি কিচেনে সন্ধ্যা থেকে নানারঙের মানুষের আনাগোনা। বিভিন্ন কাজে তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। এর ভেতরে সম্ভবত দিনাজপুর থেকে ৩/৪ জন ছেলে এসেছেন আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে দেখা করতে। অনেকক্ষণ বসে আছে ওরা। তারা এবি কিচেনে এসেই যেন হতবিহ্বল! একটি ছবি বাঁধাই করে নিয়ে এসেছেন। কাগজ দিয়ে মোড়ানো বিশাল সাইজের বাঁধাই করা ছবিটা। আমি একটু দেখতে চাইলাম। অমনি বললেন, ‘বস আগে দেখবেন। তারপর সবাই। আপনি দেখার কে? আমি তাদের গর্বের জায়গায় আঘাত করতে চাইলাম না। ভালোবাসাটা অবলোকন করলাম।’

আইয়ুব বাচ্চু এলেন। ছবিটা খোলা হলো। ছবির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন আইয়ুব বাচ্চু। আর ছেলেরা চোখের জল মুচছে। এ অদ্ভুত এক দৃশ্য। এসব গল্প কাউকে বললে বিশ্বাস করানোর মতো না। কিন্তু ভক্তরা তাকে পেলে একটু কথা বলতে পারলে তাদের যেন সারাজীবনের এক মহাপ্রাপ্তি নিয়ে ফিরতেন!

আইয়ুব বাচ্চু ছেলেদের পিঠ চাপড়ে দিলেন। বললেন, ‘ভালো থাকিস। তানভীর ওদের সঙ্গে গল্প কর।’

ওদের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিলেন। একটু বাড়তিই বললেন তখন আইয়ুব বাচ্চু আমাকে নিয়ে!

একটু আগে যে ছেলেরা আমাকে ঈষত্ ধমকে কথা বলেছিল। তাদের চোখে তখন সমীহ খেয়াল করলাম। এই সমীহ শ্রদ্ধা কিন্তু একজন আইয়ুব বাচ্চুর প্রতি ! ছবিটি সাধারণ। কনসার্টে তোলা ছবির সঙ্গে গ্রিনরুমে তাদের সঙ্গে স্মৃতি। এমন স্মৃতিস্মারক কত লক্ষ রয়েছে। আইয়ুব বাচ্চু তাই তেমন এক ভালোবাসার নাম। যে ছেলেটির সঙ্গে হয়তো ২ মিনিটের দেখা হয়েছে কোনো এক সময়ে। সেও কেঁদে উঠেছে তার চলে যাওয়ায়। কারণ সেই ছেলেটি বা মেয়েটির সঙ্গে আইয়ুব বাচ্চুর সাক্ষাত্ কয়েক মাস ধরে তার গানের মাধ্যমে।

আমরা একসঙ্গে ডিনার করলাম। রাত ১২টার দিকে একটি অ্যাকুস্টিক গিটার নিয়ে আইয়ুব বাচ্চু বসলেন তার প্র্যাকটিস প্যাডে। প্রথমে চোখ বুজে বাজাতে থাকলেন আর গুনগুন করলেন।

দুখিনী রাত, তোমায় নিয়ে কত গল্প আছে জানা।

দুখিনী রাত তোমার সাথে আর নেই কোনো দেনা।—এমন লিরিকে যখন গাইলেন মনে হচ্ছিল তার গলা ধরে আসছে কী এক অজানা কারণে। আমি বললাম, ‘আপনি মনে হয় কোনোকিছু ভাবছেন। কোনো অন্য খেয়ালে চলে গেছেন।’

তিনি গিটার রেখে বেরিয়ে এলেন। কিচেনের চেয়ারে বসলেন। চুপচাপ একদৃষ্টে চেয়ে রইলেন। আর ভাবলেন।

বললেন, ‘আজ গান হবে না। তুই ঘুমিয়ে পড়। মনটা খারাপ হয়ে গেছে!’

আমি চুপচাপ বসে আছি। কারণ আমার ১ সপ্তাহ পর মাস্টার জমা দিতে হবে। যতদূর শিডিউল জানি তার পরদিন ঢাকার বাইরে যাওয়ার কথা। আজ না হলে প্রজেক্ট পিছিয়ে যাবে। আমি করুণ দৃষ্টিতে বসে আছি।

—‘এই দুঃখের গান কেন লিখেছিস বল?’ আমি বললাম, আপনার কণ্ঠে উদাস করা একটা গান আমি রেকর্ড করাতে চাই। আমার অনেকদিনের ইচ্ছে। তাই লিখেছি। আমার অ্যালবামের নামও এটিই।

অতঃপর রাত সাড়ে ৩টায় গিটার ধরলেন। একটানা এক বসায় সুরটা সাজালেন। আমি বেশ সাহস নিয়ে বললাম, ‘বস, আপনি কী আপনার প্রথমবার সুরের সময়কার কথা ভাবছিলেন?’

বললেন, তুই কী ভেবে লিখেছিস। এমন অনেক কথা। যে কথা বললেন, তা না ছাপার জন্য বলেছিলেন। অফ দ্য রেকর্ড। আজ মৃত্যুর পর তা আমি ছাপতে পারি না। যদিও আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুর পর তার অপ্রকাশিত বা অপরিমার্জিত গানগুলো রিলিজ দেওয়া হচ্ছে। এ নিয়ে আমার ব্যক্তিগত আপত্তির জায়গা আছে।

আবারো প্রথম প্রসঙ্গে আসি। ‘শেষ কথা কেন এমন কথা হয়।’

 আইয়ুব বাচ্চুর সুরে এস আই টুটুল গেয়েছিলেন এই গানটি। অবাক করার মতো বিষয় হলো এলআরবি সদস্য এস আই টুটুলের এটিই ছিল প্রথম কোনো ভয়েস রেকর্ডিং। শুধু এস আই টুটুল না, এমন অগণিত শিল্পীকে তৈরি করেছেন তিনি। এমন শিল্পী এদেশে বিরল। শেষ চিঠি গানটির গল্প প্রসঙ্গে টুটুল বলেন, ‘আইয়ুব বাচ্চু আমার জীবনে বাবার জায়গায় রয়েছেন। তাকে তাই ভয় পেতাম। সমীহের ভয়। একবার হাতে কোনো টাকা পয়সা ছিল না। মনটা খুব খারাপ। ব্যাচেলর জীবন। আর্থিক টানাটানি স্টেজ শোও কম। চুপচাপ বসে আছি। হঠাত্ একটা ৫ হাজার টাকার বান্ডিল আমাকে দিয়ে বললেন, এটা রাখ। শুধু এই একটা ঘটনা না। আমার যে কোনো সঙ্কটে তিনি আমার চেহারা দেখে বুঝে যেতেন।

শেষ চিঠি গানটির গল্পটা খুব সরল। আমার জন্য অবাক করার একটি দিন। হঠাত্ করেই আমাকে ভয়ে বুথে ডাকলেন। বললেন, এই গানটি গা। যেহেতু বসের সঙ্গে বাজাতাম। তাই সুরটা তো জানতাম। কিন্তু যখন আমাকে বললেন, এই গানটা তোর ভয়েসেই যাবে। তখন হাত-পা অবশ হয়ে যেতে লাগলো। আমি বললাম পারবো না। বস, সাহস দিলেন। খুব পারবি। তুই গা। এরপর গানটি তো দারুণ প্রশংসিত হলো। সেই থেকেই গাইছি।’

কণ্ঠশিল্পী আসিফ আকবর আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুর দিনে ছিলেন একটি গানের শুটিংয়ে। খবরটি শোনা মাত্র হাইপ্রেশারে শুয়ে পড়েন সেটেই। অনেকক্ষণ ডুকরে কেঁদেছেন। আইয়ুব বাচ্চু আর আসিফ আকবর এই অগ্রজ অনুজের ভেতরে ছিল এক টক-ঝাল-মিষ্টি সম্পর্ক। কিন্তু যে রঙেরই সম্পর্ক থাকুক না কেন, তার এই চলে যাওয়াকে বেদনাহত করেনি এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া যাবে না। রকগানে পুরো বাংলাদেশকে যিনি চিনিয়েছেন বিশ্বের নানা প্রান্তরে, সেই ভালোবাসার স্মৃতিস্মারক হিসেবে প্রথম কোনো মিউজিশিয়ানের গান নিয়ে তৈরি হয়েছে চট্টগ্রামে আইয়ুব বাচ্চু চত্ত্বর। ভালোবাসার এমনই অনন্য স্মারক হয়েই থাকবেন তিনি সবার মনের ভেতরে।

লেখাটি শেষ করি বাচ্চু ভাইয়ের সঙ্গে শেষ কথাগুলো দিয়ে। তিনি তখন রংপুর কনসার্টে যাওয়ার ব্যস্ততায়। ফোন দিলাম যথারীতি।—‘শোন তানভীর, এই সিজনে আমরা সর্বাধিক শো করছি। ঢাকায় ফিরে তোর সঙ্গে বসবো।’

আমি বললাম, ‘আপনার শরীর কেমন?’—‘ভালো আছি। ঢাকায় এসে তোকে সময় দেবো। আসিস।’

অথচ আর আসা হলো না!

ভালো থাকবেন বাচ্চু ভাই। আমাদের সবার প্রিয় যে নামে ডেকেছি আপনাকে ‘এবি বস’ এবং এই এক পৃথিবীর একজন আইয়ুব বাচ্চু।