দুর্যোগ মোকাবিলায়ও বাংলাদেশ রোল মডেল :প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০১৯, ২২:৪৬

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশ এখন কেবল উন্নয়নেই নয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায়ও বিশ্বে একটি রোল মডেল দেশ। গতকাল রবিবার সকালে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস উপলক্ষ্যে দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি আরো বলেন, ‘বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ড—এসবে ক্ষয়ক্ষতি যাতে হ্রাস পায়, তার জন্য যা ব্যবস্থা নেওয়ার, ইতিমধ্যে আমরা তা নিয়েছি, যা আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে এবং সবাই মনে করে এটাও বাংলাদেশের কাছ থেকে শেখার রয়েছে। অনেকে আমাদের কাছ থেকে এটা এখন জানতে চায়।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, চলতি বছরের জুলাই মাসে ঢাকায় গ্লোবাল কমিশন অন অ্যাডাপ্টেশনের সভা হয়েছে। সেখানে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন দুর্যোগ প্রতিরোধে বাংলাদেশের সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘বিশ্ব অভিযোজন কেন্দ্র-ঢাকা অফিস’ স্থাপনের ঘোষণা দেন। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানের কথা তুলে ধরে তিনি যে কোনো ধরনের দুর্যোগের জন্য সবাইকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘যে কোনো মনুষ্য সৃষ্ট দুর্যোগ আসুক আর প্রাকৃতিক দুর্যোগই আসুক, সব ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য বাংলাদেশ সব সময় প্রস্তুত থাকবে সেটাই আমি চাই। আমাদের ভলান্টিয়াররা নিবেদিতপ্রাণ হয়ে কাজ করবে, সেটাই আমি আশা পোষণ করি।’

প্রধানমন্ত্রী এ সময় যে কোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় জান-মালের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনার জন্য ত্বরিত পদক্ষেপ গ্রহণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘আমরা দেশকে গড়ে তুলতে চাই উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে। জাতির পিতা স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন। তার একটা স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশ হবে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ। আমরা সেই সোনার বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়েই কাজ করে যাচ্ছি।’

২০১২ সালে তার সরকার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন প্রণয়ন করেছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এই আইনের আওতায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর গঠন করা হয়েছে, যা দুর্যোগ মোকাবিলা, ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। তিনি বলেন, তার সরকার ২০১৫ সালে ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার (এনইওসি) প্রতিষ্ঠা করেছে। বড়ো ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য পূর্বাচলে একটি স্টেজিং এরিয়া নির্মাণ করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে সৈয়দপুর বিমানবন্দরের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের কাজ শুরু হয়েছে, যেন জরুরি অবস্থায় এটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোরও প্রয়োজন মেটাতে পারে। এছাড়া মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে সিভিল মিলিটারি সমন্বয়ে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় রিজিওনাল কনসালটেটিভ গ্রুপের (আরসিজি) মাধ্যমে আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারণ করা হয়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, বর্তমানে প্রায় ৫৬ হাজার প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক রয়েছে। তাছাড়া ৩২ হাজার নগর স্বেচ্ছাসেবক, ২৪ লাখ আনসার-ভিডিপি, ১৭ লাখ স্কাউটস, ৪ লাখ বিএনসিসি, গার্লস গাইডের প্রায় ৪ লাখ সদস্য—তারাও এক্ষেত্রে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। সরকার ইতিমধ্যে ৩৭৮টি মুজিব কেল্লা নির্মাণ করেছে। আর উপকূলে ৩৮৬৮টি বহুমুখী সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করা হয়েছে এবং আরো ১ হাজার ৬৫০টি সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

হেলিকপ্টারে করে পাহাড় ও দ্বীপ অঞ্চলে ‘ব্যাপক হারে’ বীজ ছড়িয়ে বনাঞ্চল সৃষ্টির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগে খাদ্য সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। আপত্কালীন গৃহস্থালিতে খাদ্য সংরক্ষণের জন্য হাউজহোল্ড সাইলো সরবরাহ করে যাচ্ছি। ২০১৯ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত আমরা ৩ লাখ ২৮ হাজার পরিবারের মধ্যে সাইলো বিতরণ করেছি। বিভিন্ন জেলায় আমরা ৫ লাখ মেট্রিক টন ক্ষমতাসম্পন্ন আটটি সাইলো কমপ্লেক্স নির্মাণ করছি। দুই বছর যাতে খাদ্য সংরক্ষণ করা যায়, সে ধরনের গুদামও আমরা নির্মাণ করে যাচ্ছি।’

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান এ বি তাজুল ইসলাম এবং সিনিয়র সচিব মো. শাহ কামাল বক্তৃতা করেন। এছাড়া ‘দুর্যোগসহনীয় বাসগৃহ’প্রাপ্ত ঝালকাঠির কাঠালিয়া উপজেলার শিউলী রানী শিল ও কুড়িগ্রামের মো. শহীদুল ইসলাম অনুষ্ঠানে নিজস্ব অনুভূতি ব্যক্ত করেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সেরা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে এ বছর ৮২ জনকে ‘সিপিপি’ পুরস্কার দেওয়া হয়। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে তিন জনের হাতে সম্মাননা তুলে দেন। তারা হলেন কক্সবাজারের চকোরিয়ার বুলবুল জান্নাত, ভোলার লালমোহনের এ কে এম কামরুল ইসলাম এবং খুলনার মোংলার সুস্মিতা মণ্ডল। অনুষ্ঠানে নবনির্মিত ১০০টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র এবং ১১ হাজার ৬০৪টি ‘দুর্যোগসহনীয় বাড়ি’ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।