অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা সঠিক পথেই এগুচ্ছে। কিন্তু পাকিস্তান কি সেটি পারছে? বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের উন্নয়ন অগ্রাধিকার একই। উভয় দেশই শিল্পখাতে জ্বালানির চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। দুই দেশেরই রয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা, ক্ষমতার মেরুকরণ, সরকারি খাতে দুর্নীতির সাথে লড়াই করার ইতিহাস। দুই দেশেই রাজস্ব আদায় হার কম। এর পরেও অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতে পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশের অর্জন অনেক বেশি। এটা কিভাবে সম্ভব হলো? ১৫ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের দ্য নিউজ পত্রিকায় এমন চিত্রই তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে শিক্ষণীয় রয়েছে উল্লেখ করে ‘টেকিং এ কিউ ফ্রম বাংলাদেশ’ শিরোনামে এক নিবন্ধে উন্নয়ন বিশ্লেষক শহিদ শেখ উল্লেখ করেছেন, পাকিস্তানের হতাশাগ্রস্ত অর্থ উপদেষ্টা প্রশ্ন রেখে বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষ যদি কর দিতে পারে পাকিস্তানিরা কেন পারবে না? এই বক্তব্যের রেশ টেনে দুই দেশের উন্নয়ন বিশ্লেষণ করেছেন শহিদ শেখ। তিনি উল্লেখ করেন, কিছু সাদৃশ্য থাকলেও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের আকার জিডিপির ১৪ শতাংশে ধরে রাখতে পেরেছে। সেই সঙ্গে ৪০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয় করে বাণিজ্য ভারসাম্যে এগিয়ে রয়েছে। ফলে মুদ্রামান ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে। সবমিলিয়ে দেশি ও বিদেশিদের বিনিয়োগ আকর্ষণের পরিবেশ রয়েছে। তাছাড়া মানবসম্পদ উন্নয়নে শিক্ষা খাতে বড়ো বিনিয়োগ দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারায় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ভাবে এর সুফল পাচ্ছে। জনগণের জন্য সামাজিক খাতে তুলনামূলক বেশি ব্যয় করা সম্ভব হচ্ছে। বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটের ১৮ শতাংশ শিক্ষা সংশ্লিষ্ট খাতে ব্যয় হচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষার জন্য ৩৫ কোটি বই বিনামূল্যে বিতরণ করা হচ্ছে। বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার পেছনে নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহনও উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে নারীদের আত্মকর্মসংস্থানে এগিয়ে আসার চিত্র ইতিবাচক।
নারীদের সামাজিকভাবে এগিয়ে যাওয়ায় জনসংখ্যাও নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে বাংলাদেশ। পাকিস্তান সাড়ে ২০ কোটি জনসংখ্যার দেশ হলেও বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারায় বাংলাদেশে বাজেটে চাপ তুলনামূলক কম। পাকিস্তান পিছিয়ে যাওয়ার পেছনে দেশটিতে উগ্র জঙ্গিবাদের বিস্তারকেও তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কারণে অর্থনৈতিক ভাবে এগিয়ে গেলেও পাকিস্তান পিছিয়ে পড়ছে জঙ্গিবাদের কারণে। অবশ্য বাংলাদেশে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের চিত্রও রয়েছে। বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ভাবে এগিয়ে গেলেও ২০০৭ সালে (ওয়ান ইলেভেন) সংবিধানের ওপর হস্তক্ষেপ করা হয়। রাজনীতির মেরুকরণ শুরু হয়। সে সময় একজন নোবেল বিজয়ীর নেতৃত্বে টেকনোক্র্যাট সরকার প্রতিষ্ঠার কাজ ভেস্তে যায়। ঐ নোবেল বিজয়ীর ঋণ নির্ভর উন্নয়ন চিন্তা ভবিষ্যতে দেশকে ঋণের ফাঁদে ফেলতে পারে এমন আশঙ্কা তৈরি হয়।
রাজনৈতিক ইস্যুর বাইরেও প্রতিবেশী দেশের সঙ্গেও সুসম্পর্ক বজায় রাখার উদাহরণ রয়েছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। শুধু সরকারি সহায়তা নয়, বিদেশি সহায়তাও পেয়েছে। এত সংকটের পর বাংলাদেশ এগিয় যাওয়ার পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক উন্নয়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেও বিনিয়োগ আকর্ষণ করা যায়, সে বিষয়টি বাংলাদেশ থেকে শিক্ষণীয়। প্রতিবেদনে একটি ভিন্ন উদাহরণও দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, পাকিস্তানের দুই রুপির কয়েনের ছবিতে দেখা যায় ১৭ শতাব্দির রাজকীয় মসজিদের ছবি, যেখানে বাংলাদেশের দুই টাকার একটি কয়েনে দেখা যায় একটি ছেলে ও একটি মেয়ে বই হাতে ধরে আছে। যা দুই দেশের ভবিষ্যতের পথ নির্দেশনার চিত্রই বহন করে।
