আজ হানাদার মুক্ত হয় যেসব এলাকা

আপডেট : ১২ ডিসেম্বর ২০১৮, ২১:৩৩

ইত্তেফাক ডেস্ক

আজ ১৩ ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের এই দিনে দেশের বিভিন্ন এলাকা পাকিস্তানি হানাদারমুক্ত হয়। মুক্ত এলাকায় উড়ে স্বাধীন বাংলাদেশের লাল সবুজের পতাকা। এ বিষয়ে আমাদের প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর:

নীলফামারী: ১৯৭১ সালের এই দিনে বীর মুক্তিযোদ্ধারা নীলফামারীকে হানাদারমুক্ত করে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। ১৯৭১ সালে ৬ থানা নিয়ে নীলফামারী ছিল একটি মহকুমা শহর। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে নীলফামারীর অগণিত ছাত্র-জনতা ও সাধারণ মানুষ স্বাধীনতার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংগ্রাম শুরু করে। যুদ্ধ ক্ষেত্রে অনেক মুক্তিযোদ্ধা আহত ও শহীদ হয়। ১২ ডিসেম্বর রাতে পাক-হানাদার বাহিনী নীলফামারী শহর ছেড়ে আশ্রয় নেয় সৈয়দপুর সেনানিবাসে। মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণে পাক-হানাদার বাহিনী পালিয়ে গেলে ১৩ ডিসেম্বর ভোরে মুক্তিযোদ্ধারা শহরে প্রবেশ করে রাস্তায় নেমে আসে সাধারণ মানুষ। তখন স্থানীয় চৌরঙ্গী মোড়ে উত্তোলন করা হয় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা।

লালপুর (নাটোর):১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকবাহিনী দেশীয় দালাল ও রাজাকারদের সহায়তায় লালপুরের বিভিন্ন এলাকায় হত্যা, নির্যাতন, অগ্নিকাণ্ড ও লুটতরাজ চালানোর পর এই দিনে লালপুর থেকে বিতাড়িত হয়। ওইদিন বর্বর খান সেনারা উপজেলার মহেশপুর গ্রামে ঝটিকা আক্রমণ করে ৩৬ জনকে গুলি করে হত্যার পর পালিয়ে যায়। ৮ ডিসেম্বর পাঞ্জাব পুলিশ ও খান সেনারা থানা ত্যাগ করে। ৯ তারিখে অধিকাংশ রাজাকারও থানা ত্যাগ করে। ১০ই ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী থানা দখল করে। জনতা সেদিন উল্লাসে মেতে উঠে। কিন্তু হঠাত্ ১৩ ডিসেম্বর বর্বর খান সেনারা ঝটিকা আক্রমণ করে মহেশপুর গ্রামে ৩৬ জনকে গুলি করে পালিয়ে যায়।

মির্জাপুর (টাঙ্গাইল) :৩রা এপ্রিল ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক সংলগ্ন গোড়ান-সাটিয়াচড়ায় পাকসেনারা আসামাত্র সংগ্রাম পরিষদের সদস্যরা নরঘাতকদের ওপর গুলি চালায়। এই সম্মুখযুদ্ধে ১০৭ জন মুক্তিপাগল বাঙালিকে হত্যা করা হয় এবং ইপিআর নিহত হয় ২৩ জন। ১২ ডিসেম্বর রাতে দেশমাতৃকার সূর্য-সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধারা মির্জাপুরের বংশাই, লৌহজং নদীর দুই পাশ ও চতুর্দিকে পাকসেনাদের ঘিরে ফেলে। শুরু হয় তুমুল সম্মুখযুদ্ধ। ১৩ ডিসেম্বর মুক্ত হয় মির্জাপুর। ১৩ ডিসেম্বর মির্জাপুর মুক্ত হলেও শহীদদের গণকবর আজও চিহ্নিত হয়নি এবং নির্মাণ হয়নি কোনো স্মৃতিফলক।

বেড়া (পাবনা): এইদিন আনুষ্ঠানিকভাবে বেড়াকে শত্রুমুক্ত ঘোষণা দিয়ে বেলা ১১টায় থানা কম্পাউন্ডে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। ১১ এপ্রিল ক্যাপ্টেন মতিউর রহমান সূবেদার আলী আকবরের নেতৃত্বে ইবিআর ও ইপিআরের দু’শতাধিক সদস্য মুক্তিযোদ্ধার সাথে যোগ দেয়। ১৯ এপ্রিল সাঁথিয়ার শহিদনগরের ডাববাগানে পাকিস্তানী বাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে যুদ্ধে উভয়পক্ষের শতাধিক নিহত হয়। পরবর্তীতে ১২ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা পরিকল্পিতভাবে বেড়া থানায় আশ্রয় নেওয়া পাকবাহিনী ও রাজাকারদের ওপর প্রবল আক্রমণ করলে তারা আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়। ফলে ১৩ ডিসেম্বর বেড়াকে শত্রুমুক্ত ঘোষণা করা হয়।

ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর):এই দিনে ঘোড়াঘাট শত্রুমুক্ত হয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে বাংলার স্বাধীনতাকামী দামাল ছেলে-মেয়েরা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার ধারাবাহিকতায় ঘোড়াঘাটে তত্কালীন মুজাহিদ ব্যাটেলিয়নের মেজর বদর উদ্দিন তার রক্তে সঞ্চালিত হয় স্বাধীনতা যুদ্ধ করে বাংলাদেশকে স্বাধীন করার। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পার হলেও সরকারিভাবে সেখানে নির্মাণ করা হয়নি কোনো স্মৃতিসৌধ। তবে একটি বেসরকারি সংস্থা সামান্য অর্থ ব্যয়ে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করলেও আজ তা বিলীন হওয়ার পথে।

কামারখন্দ (সিরাজগঞ্জ):সিরাজগঞ্জের কামারখন্দে ১৯৭১ সালের এই দিনে এলাকার বীর মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীদের পরাজিত করে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে। আর জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে পাক-হানাদার মুক্ত হয় কামারখন্দ উপজেলা। এরপর থেকে ১৩ ডিসেম্বর কামারখন্দ মুক্ত দিবস ঘোষণা করা হয়।

উল্লাপাড়া (সিরাজগঞ্জ): ৭১-এর এই দিনে বিজয় উল্লাসে রাস্তায় নামে হাজারো মুক্তকামী নারী-পুরুষ। মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে ১১ নভেম্বর সিরাজগঞ্জের তাড়াশে নওগাঁর যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পাকবাহিনীর পরাজয়ের পর তদানীন্তন উল্লাপাড়া থানা সদরে অবস্থিত হামিদা পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে পাকবাহিনীর ক্যাম্পের সেনারা মনোবল হারিয়ে ফেলে। ১২ নভেম্বর মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও পলাশডাঙ্গা যুব শিবিরের পরিচালক আব্দুল লতিফ মির্জার নেতৃত্বে ৫ শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা হামিদা স্কুলে পাকবাহিনীর ক্যাম্প আক্রমণের জন্য থানা সদরের দিকে রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নেয়। গোপনে খবর পেয়ে এদিন মধ্যরাতে পাকসেনারা তাদের উল্লাপাড়া ক্যাম্পের অস্ত্র গুদামে আগুন ধরিয়ে দিয়ে নগরবাড়ী-বগুড়া মহাসড়ক পথে ঢাকার দিকে পালিয়ে যায়। পরদিন ১৩ ডিসেম্বর হানাদারমুক্ত হয় উল্লাপাড়া। ]