হাজী দানেশের দুই শিক্ষার্থী খুনের বিচারের দাবিতে মানববন্ধন

আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০১৯, ০৩:১৯

দিনাজপুর হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই মেধাবী ছাত্র জাকারিয়া ও  মাহমুদুল হাসান মিল্টন হত্যার চার বছর পেরিয়ে গেলেও কোন বিচার হয়নি। অবিলম্বে দোষীদের  গ্রেফতার ও বিচারের দাবিতে মানববন্ধন করেছে তাদের এলাকাবাসী। সোমবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে দিনাজপুর চৌরঙ্গী মোড়ে এই মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধনে নিহত ছাত্র জাকারিয়ার মা-বাবাসহ অর্ধশতাধিক গ্রামবাসী দোষীদের বিচারের দাবি জানান।

মানববন্ধনে নিহত ছাত্র জাকারিয়ার বাবা গোলাম মোস্তাফা বলেন, '২০১৫ সালের ১৬ এপ্রিল হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই মেধাবী ছাত্র মিল্টন ও আমার ছেলে জাকারিয়াকে নিজ হোস্টেলে কতিপয় দুষ্কৃতিকারীরা নির্মম ভাবে কুপিয়ে হত্যা করে। সেই নির্মম হত্যাকাণ্ডের সাড়ে চার বছর পেরিয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত হত্যা মামলায় কোন আসামি গ্রেপ্তার হয়নি। বিগত সাড়ে চার বছরে আমি তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বর্তমান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও মানবাধিকার চেয়ারম্যানের নিকট লিখিত ভাবে অভিযোগ ও জাতীয় প্রেস ক্লাবে প্রেস কনফারেন্স ও মানববন্ধন করেছি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ শুধু আশ্বাস দিলেও এক অদৃশ্য শক্তির প্রত্যক্ষ মদদে এই হত্যা মামলার দৃশ্যমান কোন অগ্রগতি হয়নি। সেই হত্যা মামলার আসামিরা বহাল তবিয়তেই রয়েছে ও প্রকাশ্য দিবালোকে পুলিশ প্রশাসনের সামনে দিয়েই বীরদর্পে তারা ঘুরে বেড়াচ্ছে।'  

তিনি আরও জানান, ২০১৫ সালের ১৬ এপ্রিল ভেটেরিনারি অনুষদের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের একাংশের সঙ্গে ছাত্রলীগের অন্য অংশের সংঘর্ষে বিবিএ দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র জাকারিয়া ও কৃষি বিভাগের ছাত্র মাহমুদুল হাসান মিল্টন নিহত হন। ঘটনার চার বছর পরও খুনিদের বিচারের আওতায় আনতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ১৫ বার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তনের পরও কোনো কূল-কিনারা করতে পারেনি কোতোয়ালি থানা পুলিশ। অবশেষে এ বছরের মার্চে মামলাটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডিতে) স্থানান্তরিত করা হয়েছে। তবে এখনো কোনো আসামি গ্রেপ্তার করতে পারেনি সিআইডি।

মামলাটির বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা দিনাজপুর সিআইডির ইন্সপেক্টর সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘মামলাটি কিছু দিন আগে আমার হাতে এসেছে। তদন্তও ইতিমধ্যে শুরু করেছি। হত্যা মামলার আসামিরা ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করছে এমন তথ্য আমার জানা ছিল না। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে।’

এদিকে পড়ালেখা শেষ হওয়ার পরও হত্যা মামলার আসামিদের অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে অবস্থান করছে বলে জানিয়েছেন মামলার সাক্ষীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভিসি অধ্যাপক রুহুল আমিন হত্যা মামলার দুই আসামিকে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরিও দিয়েছেন। জামিন ছাড়াই তারা সরকারি চাকরি করছেন। সাবেক ভিসি রুহুল আমিন নিজেও দুইটি হত্যা মামলার একটির প্রধান আসামি।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান ভিসি অধ্যাপক ড. আবুল কাশেম হত্যা মামলার আসামি অধ্যাপক ডা. ফজলুল হককে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগ দিয়েছেন। তিনি দুইটি মামলারই যথাক্রমে ৩৫ ও ৩৬ নম্বর আসামি। এছাড়া আরও অন্তত আটজন আসামি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পেয়েছেন। তারা হলেন, মোমিনুল হক রাব্বি, মোস্তফা তারেক চৌধুরী, পলাশ চন্দ্র রায়, মাহমুদুর রহমান গামা, ও রুহুল কুদ্দুস জোহা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সেকশন অফিসার, রিসার্চ অফিসার, অ্যাকাউন্ট অফিসার, ফার্ম ম্যানেজারসহ মোট ৫টি পদে তারা কয়েকজন নিয়োগ প্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসাবে নিয়োগ পেয়েছেন।

সাবেক ভিসি রুহুল আমিন জোড়া খুনের মামলার আসামি আসাদুজ্জামান জেমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি সার্জন কর্মকর্তা হিসাবে এবং মো. আহম্মেদুল হক খোকন নেটওয়ার্ক ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কমরত। ২০১৬ সালের মার্চ থেকে মামলার এই দুই আসামি প্রথম শ্রেণির চাকরি পাইয়ে দেন সাবেক ভিসি রুহুল আমিন। 

উল্লেখ্য, তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে আন্দোলনে নামে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পক্ষের নেতাকর্মীরা। আন্দোলন চলা অবস্থায় ২০১৫ সালের ১৬ এপ্রিল ভেটেরিনারি অনুষদের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের একাংশের নেতারা ছাত্রলীগের সভাপতি ইফতেখার ইসলাম রিয়েল ও সম্পাদক অরুণ কান্তি রায় গ্রুপের ওপর হামলা চালায়। এতে বিবিএ দ্বিতীয়বর্ষের ছাত্র জাকারিয়া ও কৃষি বিভাগের ছাত্র মাহমুদুল হাসান মিল্টন নিহত হন।

খুনের ঘটনায় পরিবারের করা পৃথক দুইটি মামলায় ৪১ জনকে আসামি করা হয়। নিহত মিল্টনের চাচা মকসুদার রহমান বাদী হয়ে ৩৭ জনকে আসামি করে মামলা করেন। ওই মামলার এক নম্বর আসামি তখনকার উপাচার্য রুহুল আমিন।

অন্যদিকে নিহত জাকারিয়ার বাবা গোলাম মোস্তফা একই বছর দিনাজপুর জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি আবু ইবনে রজ্জবকে এক নম্বর আসামি করে এবং সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিৎ ঘোষ কা নসহ ৩৭ জনের বিরুদ্ধে আরও একটি মামলা করেন।

ঘটনার সময় বহিরাগতরা অংশ নেয় এমন ভিডিও ফুটেজ রয়েছে। ঘটনার পর একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলকে তৎকালীন প্রোক্টর এ টি এম শফিকুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘হামলায় মুখোশধারী বহিরাগতরা অংশ নেয়।’ তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পরবর্তী সময়ে বহিরাগতদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি