ঐতিহ্য সংরক্ষণের উদ্যোগ

আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০১৯, ১৮:১৯

ব্যবসার জন্য মূলধন জোগানো থেকে শুরু করে কাঁচামাল সংগ্রহ, দক্ষ কারিগর খুঁজে বের করা, ক্রেতার চাহিদামতো নিজের সৃজনশীলতাকে একত্র করা সহজ নয়। এরপরে আসে সময়মতো পণ্য পৌঁছে দেওয়ার কাজটি। জীবনের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এই ব্যবসা করতে গিয়ে পাওয়া যায়। বিদেশি পণ্যের ভিড়ে যেন আমাদের দেশীয় কারিগরদের হাতের সূক্ষ্ম কাজগুলো হারিয়ে না যায়, এই লক্ষ্যে কাজ করা গুটিকয়েক নারীর মধ্যে কয়েকজনের কথা লিখেছেন—  ইফফাত ই ফারিয়া

বিভা মোশাররফ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের এ শিক্ষার্থী ২০১৮ সালের মে মাসে হঠাত্ করেই শুরু করেন। দেড় বছরের যাত্রায় নিজের জমানো টাকা থেকে লেইস আর কাপড় কিনে দর্জিকে দিয়ে মোট চারটি শাড়ি বানিয়ে বেলোরার প্রথম কালেকশন বের করেন ঈদের মাত্র এক সপ্তাহ আগে। কোনো দর্জিই রাজি না হওয়ায় অনেক খুঁজে মোহাম্মদপুরের রাস্তার ওপর প্রায় ভাঙা একটি সেলাই মেশিন নিয়ে বসে থাকা এক কারিগর পেলেন, তার সাহায্যেই শুরু হয় ক্রেতার চাহিদামতো ২৭টি  ডিজাইনে পোশাক তৈরির কাজ। এরপরে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বেনারসী, মসলিন, জামদানী, তসরসহ বিভিন্ন কাপড় ও রঙ নিয়ে কাজও শুরু করেছেন ইতিমধ্যেই। শুধু শাড়ি নয়, যে কোনো ড্রেস থেকে শুরু করে ফিউশন, ওয়েস্টার্ন ড্রেসের কাজও দিব্যি করছেন। বিভা বলছিলেন, ‘কখনোই আমার নিয়ে কোনো আগ্রহ ছিল না। কিন্তু কেন জানি না তবে আমার মায়ের সবসময় মনে হতো আমি ফ্যাশন ডিজাইনিং নিয়ে পড়ব।’ বেলোরা একটি ফ্রেঞ্চ শব্দ যার অর্থ— এখনই সময় সৌন্দর্যের।

 

মালিহা জামান ইনা

দ্য পার্পল বক্সের শুরুটা শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় টিউশনির বেতন থেকে জমানো আর একান্ত নিজের একটা পরিচয় তৈরি করার প্রয়োজনীয়তা থেকেই হয়েছিল। ছোটোবেলা থেকেই ডিজাইনে বেশ আগ্রহ ছিল, আর অর্থনীতিতে পড়ার সুবাদে যখন বাংলাদেশে মেটাল গয়নার বাজার সম্পর্কে জানতে পারি, তখন মাথায় ব্যবসার চিন্তা আসে। ভারত, চীন, কোরিয়া থেকে আমদানিকৃত গয়নার ভিড়ে আমাদের দেশীয় যে কারিগরদের হাতে বানানো গয়নার শিল্প মৃতপ্রায়। পার্পল বা বেগুনি আসলে নারীবাদের প্রতীকী রঙ। নিজের আদর্শের সঙ্গে মিলিয়েই এক বন্ধুর সহায়তায় শুরু হয় কাজ। প্রথমে ছোটো ছোটো আংটি, পায়ের নুপুর থেকে শুরু করে এখন তিনি বিয়ের গয়না ও ডিজাইন করেন। দুই বছরে অসংখ্য বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। কারিগরদের অদক্ষতা, ডিজাইন নকল করা, স্বল্প পুঁজির চক্র থেকে প্রতিনিয়তই যুদ্ধ করতে হয়েছে। তার পরেও যখন দেখেন কেউ পার্পল বক্সের গয়না পরেছেন, ছবি তুলছেন, তাতেই সমস্ত কষ্ট সার্থক বলে মনে করেন মালিহা।

 

তাসমি আক্তার মৌ

বাংলাদেশের স্বনামধন্য একটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিতে চাকরি করেছেন ২০১৮ সাল পর্যন্ত। প্রথম শুরু করেন নিজের হাতে তৈরি কাপড়ের ফুলের গয়নার ব্যবসা। নিজের ব্যবসাটা শুরু করার প্ল্যান তার মাথায় সবসময়ই থাকত। গত এক বছর তিনি ‘স্মিদারিন্স জুয়েলারি ইঙ্ক’ নামে গয়নার ব্যবসা নিয়ে মাথা খাটিয়েছেন এবং ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে তিনি তার এই নতুন ব্যবসা শুরু করেন। ভারত থেকে প্রথমে গতানুগতিক জয়পুরি গয়নার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা কিছু ডিজাইন দিয়ে ক্রেতাদের মন জয় করেন তিনি। ধীরে ধীরে ক্লায়েন্টের চাহিদা এবং বাজেট অনুযায়ী সম্পূর্ণ নিজস্ব ডিজাইনের গয়না নিয়ে যাত্রা শুরু করেন। ৪০০ টাকা থেকে শুরু করে ৭০০০ টাকা পর্যন্ত ভিন্ন ভিন্ন গয়না আছে তার কালেকশনে, যার অধিকাংশ তার নিজের ডিজাইন করা। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে অনেকেই আমাদের দেশি কারিগরদের দ্বারা তৈরি গয়নাকে ভারতীয় বলে চালিয়ে দেয়, কিন্তু আমার মূল উদ্দেশ্য আমাদের দেশি কারিগরদের দিয়ে তৈরি করা।’