‘নাটকের উত্কর্ষতা বৃদ্ধির জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত’

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ১৮:১৪

মোহাম্মদ বারী বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনের একজন পরিচিত মুখ। মৃদুভাষী এই মানুষটি দীর্ঘদিন ধরে থিয়েটার চর্চার সঙ্গে যুক্ত আছেন। নাট্যজীবনের বেশির ভাগ সময় অতিবাহিত করেছেন নাট্যকার, নির্দেশক এস এম সোলায়মান ও তার প্রতিষ্ঠিত নাট্যদল থিয়েটার আর্ট ইউনিটের সঙ্গে। বর্তমানে গড়ে তুলেছেন নিজেদের নাট্যদল ‘অনুস্বর’। মোহাম্মদ বারীর সঙ্গে কথা বলেছেন

মাহবুব আলম

 

অনুবাদ নাটক, ছোটগল্প বা উপন্যাস থেকে নাটক নির্মাণের ভিড়ে নাট্যচর্চায় মৌলিকত্ব কতটা বজায় থাকছে?

ভালো প্রশ্ন। আমি মনে করি, অনুবাদ নাটকের সঙ্গে ছোটগল্প বা উপন্যাস থেকে নাট্যরূপ দেওয়ার বিষয়টা একটু আলাদা। নাটক লিখিত হয় তার নিজস্ব শক্তিমত্তা নিয়ে, তা সে যে ভাষাতেই লিখিত হোক। সে নাটকের সাহিত্যগুণ বা মঞ্চায়ন যোগ্যতা, সেটাও পৃথক আলোচনার বিষয়। ভিন্ন ভাষার নাটকের অনুবাদ বিশেষত মঞ্চায়নের উদ্দেশ্যে যথাযোগ্য হলে ভালো হয়, মঞ্চসাফল্যও পাওয়া যায়। আমাদের মঞ্চেই তার উদাহরণ আছে। তবে আমাদের দেশে অধিকাংশ অনুবাদে ভিন্ন সংস্কৃতির আবহটা থেকেই যায়। ফলে সাহিত্য হিসেবে পাঠের রসটা খানিকটা পাওয়া গেলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে মঞ্চায়নের জন্য তা খুব একটা উপাদেয় হয়ে ওঠে না। আর ছোটগল্প বা উপন্যাসের ক্যানভাস পাঠকের কল্পনা জগতে অনেক বিস্তৃত। সেটার নাট্যরূপায়ন মঞ্চে অভিনীত হলে মঞ্চের সীমাবদ্ধ ক্ষেত্রে ঐ ক্যানভাসের স্বাদ নেওয়া সম্ভব নয়। তবে সেই গল্পকে আশ্রয় করে যখন নাটক হিসেবে তা লিখিত এবং মঞ্চায়িত হয়, তখন সেটা পৃথক মাধ্যমের মৌলিকত্ব নিয়েই লিখিত বা অভিনীত হয়। তখন সেটাকে ছোটগল্প বা উপন্যাস হিসেবে না দেখে নাটক হিসেবেই দেখা উচিত। ভিন্ন মাধ্যমে এসে সে গল্প অন্য আরেক শিল্পরূপ ধারণ করে এবং সে শিল্পরসও ভিন্ন সত্তা নিয়ে মৌলিক হয়ে ওঠে। একথা সত্য, বাংলাদেশে নাট্যসাহিত্যটা সেভাবে দাঁড়াচ্ছে না। নতুন নাট্যকার বেরিয়ে আসা দরকার, যারা লিখছেন তাদের সুযোগ দেওয়াও দরকার।

নাট্যোত্সবে অনেক নাটক থাকে বেশ পুরনো, কিন্তু সেগুলোও বারবার আমন্ত্রণ পায়। নাটকের আদান-প্রদান বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?

আমি মনে করি, উত্সব বিষয়টার সঙ্গে নতুন কিছু খুব লাগসই। যেমন ঈদ বা পূজা উত্সবে নতুন জামাকাপড়, নতুন সিনেমা, নতুন গান; বর্ষবরণ উত্সবে নতুন নতুন ভাবনা নিয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রা, নবান্ন উত্সবে তো নতুন অন্ন যুক্ত হয়েই আছে। তেমনি যেকোনো নাট্যোত্সবে নতুন নতুন নাটক থাকলে খুব ভালো হয়। কিন্তু আমাদের দেশের নাট্যোত্সবগুলোয় নতুন নাটকের চেয়ে পুরোনো নাট্যদলগুলোকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে সেসব দলের নতুন নাটক না থাকলে আমাদের পুরোনো নাটকগুলোই দেখতে হয়। এই সংস্কৃতির পরিবর্তন হওয়া উচিত। আর আদান-প্রদানের বিষয়টা উভয়ের জন্য শুভকর, কিন্তু সেটা যদি মানের দিক বিবেচনা করে করা হয়। কিন্তু এখানে যেটা হচ্ছে, সেটা ভালো না। একদল পশ্চিমবঙ্গের একটি দলকে আমন্ত্রণ করে নিয়ে এলে তারাও ফিরতিবারে এখানকার সেই দলকে নিয়ে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে নাটকের মান বিচার করছে না, নাটকটি নতুন কি পুরাতন, সেটিও দেখছে না। তাতে করে দেখা যাচ্ছে, আমরা কেউই উপকৃত হচ্ছি না। তারাও আমাদের ভালো নাটক দেখতে পাচ্ছে না, আবার আমরা তাদের ভালো নাটক দেখা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। এখানে এখন ভারতের নাটক হলে দর্শক কম হয়। তার মানে কি কলকাতায় ভালো নাটক হচ্ছে না? নিশ্চয় হচ্ছে। আমাদের এখানেও হচ্ছে, কিন্তু দর্শকদের মধ্যে এমন ভ্রান্ত ধারণার জন্ম নিচ্ছে শুধু আদান-প্রদানের সংস্কৃতির কারণে।

নাট্যদলগুলোর জন্য কী ধরনের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন বলে মনে করেন?

পৃথিবীর যেকোনো দেশেই নাটক তথা সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছে বা ঘটছে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়। আমাদের বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রের উচিত নাটকের জন্য কমিউনিটি বেস নাট্য মিলনায়তনের ব্যবস্থা করা। ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন কমিউনিটি যেমন উত্তরা, গুলশান, ধানমন্ডি, মিরপুর, যাত্রাবাড়ীসহ অন্যান্য জেলা শহরেও নাটকের জন্য হল নির্মাণ করতে হবে। নাট্যদলগুলোকে আর্থিক সহায়তা দিতে হবে এবং সে অর্থ ব্যয়ের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত নাট্যাভিনয় আয়োজনের জন্য সরকারকে উত্সাহ দিতে হবে। নাট্য অভিনেতাদের স্যালারি গ্রান্টের কথা অনেক দিন ধরেই শুনে আসছি। রাষ্ট্রের সক্ষমতা অনুযায়ী এটা চালু হওয়া জরুরি। নাটকের উত্কর্ষতা বৃদ্ধির জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত।

নতুন নাট্যদল কী ধরনের বিড়ম্বনার শিকার হয় বা অসুবিধাগুলো কেমন?

নতুন নাট্যদলের চ্যালেঞ্জ অনেক। অর্থনৈতিক সংকট ছাড়াও এখানে, মানে ঢাকায় শিল্পকলা একাডেমির হল বরাদ্দ বা রিহার্সেল রুম না পাওয়া একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ। অনেক নতুন দল ভালো নাটক করলেও হল বরাদ্দ পায় না। জাতীয় নাট্যশালায় নাট্য মঞ্চায়নের জন্য মানসম্পন্ন নাটক নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। নতুন দলগুলোর সুবিধা বলতে কিছু নেই। প্রাণের আবেগে তরুণেরা নাটক করতে আসে। তাদের প্রেরণা দিতে অন্তত তাদের ভালো নাটকগুলোর নিয়মিত প্রদর্শনীর ব্যবস্থা কর্তাব্যক্তিদেরই করা উচিত।

অনুস্বর নিয়ে আপনার পরবর্তী ভাবনা কী?

গভীর ‘অনুস্বর’ নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখি। গত সপ্তাহেই অভ্যন্তরীণ কর্মশালা শেষ হলো। আপাতত চলতি নাটক ‘অনুদ্ধারণীয়’র নিয়মিত প্রদর্শনী করব, যেটি গতমাসেই মঞ্চে এসেছে। আগামী ১৯ অক্টোবর আসামের দিব্রুগড়ে নাট্যোত্সবে নাটক মঞ্চায়নের আমন্ত্রণ পেয়েছি। ১৭ অক্টোবর আসামের উদ্দেশ্যে আমরা দেশ ছাড়ব। এছাড়া নতুন নাটক নিয়ে আমরা ভাবছি। পাণ্ডুলিপি নির্বাচনের কাজ চলছে। আগামী বছরের শুরুর দিকেই অনুস্বর মঞ্চে নতুন নাটক নিয়ে আসবে। আগামী দু-এক মাসের মধ্যেই আমরা একটি পথনাটকও নির্মাণ করব আশা করছি।