সবার ছোট বলে রাসেল ছিল সবার আদরের। সবার চোখের মণি। কে তাকে কোলে নেবে, কে তাকে আদর করে চোখে কাজল পরিয়ে দেবে, কে পাউডার মাখিয়ে দেবে—এ নিয়ে চলত কাড়াকাড়ি। এসবের মধ্য দিয়ে একটু একটু করে রাসেল বড়ো হতে থাকে। বাড়িতে ভাইবোনদের কাছে রাসেল ছিল যেন এক পুতুল। তারা তাকে সেভাবেই আদর করত, সাজাত, খাওয়াত, খেলত। রাসেলের আদরের কমতি নেই। ও একটু ব্যথা পেলে পরিবারের সবার কপালে দুশ্চিন্তার ছাপ পড়ত। এমন আদরে-সোহাগে বেড়ে উঠতে থাকল রাসেল।
১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর, মধ্যরাত। চারদিকে সুনসান নীরবতা। ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাড়ির কারো চোখে ঘুম নেই। অপেক্ষার দীর্ঘ মুহূর্ত শেষে ঘর আলো করে জন্ম হলো, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বেগম ফজিলাতুননেসা মুজিবের সর্বকনিষ্ঠ সন্তানের। ছোট্ট ভাইটিকে একনজর দেখার জন্য, কোলে তুলে নেওয়ার জন্য তাদের আর তর সইছিল না। সেই মাহেন্দ্রক্ষণ আসে অবশেষে। তারা একে একে তুলতুলে নরম অতিথিকে, ছোট্ট ভাইটিকে কোলে তুলে নিয়ে পরম মমতা ও ভালোবাসায় আদরে আদরে ভরিয়ে দেন।
মায়ের পর রাসেল সবচেয়ে ভালোবাসত ওর বড়পাকে। বড়পা মানে প্রিয় হাসুপাকে। আর হাসুপাও তাকে হাত ধরে ধরে হাঁটতে শেখালেন। যেদিন সে কারো সাহায্য ছাড়াই প্রথম হাঁটতে শেখে তখন পুরো পরিবারে সেকি খুশির ঝলক!
রাসেল আস্তে আস্তে বড়ো হতে থাকে। রাসেলের মাছ ধরার শখ ছিল। টুঙ্গিপাড়ায় গেলে পুকুরে মাছ ধরত। গণভবনেও সে মাছেদের খাবার খাওয়াত। বাসায় কবুতরের ঘর ছিল, অনেক কবুতর থাকত। বেগম ফজিলাতুননেসা মুজিব খুব ভোরে উঠে তাকে কোলে নিয়ে কবুতরদের খাবার দিতেন। হাঁটতে শেখার পর নিজেই কবুতরের পেছনে ছুটত, নিজহাতে খাবার দিত। কিন্তু কবুতরের মাংস কখনো খেত না। শৈশবেই তার মধ্যে প্রকাশ পেতে থাকে মানবিক সব গুণ। দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলের ভক্ত ছিলেন শেখ মুজিব। তার নামে ছোট ছেলের নাম রাখলেন শেখ রাসেল।
বাড়িতে টমি নামে একটা পোষা কুকুর ছিল। তার সঙ্গে রাসেলের ছিল ভীষণ বন্ধুত্ব। তার সঙ্গে খেলা করত। একদিন খেলার সময় টমি জোরে ঘেউ ঘেউ করে ডেকে উঠলে, রাসেল ভয় পেয়ে যায়। কাঁদতে কাঁদতে ছোট আপাকে বলে, টমি বকা দিচ্ছে। অথচ নিজের খাবারের ভাগও দিত টমিকে। আর সেই টমি কিনা তাকে বকা দিয়েছে, এটা সে মেনে নিতে পারত না।
রাসেলের কথা ও কান্না টেপ রেকর্ডারে রেকর্ড করে রাখতেন ওর বড় বোন হাসুপা। সে যদি কোনো কারণে কান্নাকাটি করত, তখন বোনরা টেপ ছেড়ে দিলে থেমে যেত তার কান্না। চুপ হয়ে ঝিম ধরে বসে থকত। টেপে তার কান্না বাজালে অনেক সময় মা দৌড়ে আসতেন কান্না থামাতে। কিন্তু দেখতেন তারা হাসছে। পোশাক পরা নিয়েও ছিল খুব সচেতন। বাবার মতো প্রিন্স কোট, সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি ও মুজিবকোট পরত। পিতা-পুত্র যেন একজন অন্যজনের বন্ধু। বাবা তাকে গল্প শোনাতেন। সেই গল্পগুলো ছিল এদেশের শোষিত-নির্যাতিত-নিপীড়িত ও অধিকারবঞ্চিত মানুষের গল্প। মনোযোগী ছাত্রের মতো রাসেল বাবার গল্প শুনত। সেই সব গল্প রাসেলের মধ্যে বপন করেছিল দেশপ্রেম। এর প্রমাণ আমরা পাই ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে। তখন মাত্র সাত বছর বয়স, পুলিশের গাড়ি দেখলেই রাসেল ‘হরতাল’, ‘হরতাল’-‘জয় বাংলা’, ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিত।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোর রাতে বাবা, মা, ভাই, ভাবীদের হত্যাকাণ্ড স্বচক্ষে দেখতে হয়েছে তাকে। ঘাতকরা বাসার কাজের লোকদের সঙ্গে তাকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে রাখে। সে মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য কাঁদতে থাকে। এর আগেই তার মাকেও হত্যা করেছে। মৃত মায়ের কাছে নিয়ে গুলিতে রাসেলের বুক ঝাঁঝরা করে দেয় পাষণ্ডরা। শিশুটির জীবনপ্রদীপ ঘাতকরা নির্মমভাবে নিভিয়ে দেয় চিরদিনের জন্য। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১০ বছর। সেই কালরাতে নির্মমভাবে শেখ রাসেলকে হত্যা করলেও রাসেলের মানবিক গুণাবলি, চেতনা, স্বপ্ন, দেশপ্রেমের অস্তিত্বকে হত্যা করতে পারেনি। রাসেল আজ নেই, কিন্তু আছে তার লাখো-কোটি অনুসারী, উত্তরাধিকারী।
