সরকারি অনুষ্ঠান, রাজনৈতিক বক্তৃতার ডামাডোলে ফিকে হয়ে গেছে বাউলদের সাধুসঙ্গ। এ নিয়ে আক্ষেপ শোনা গেল বাউল আর ভক্তদের মুখে। লালনের স্মরণ অনুষ্ঠান, বসেছে মেলা। সেখানে নানা পণ্যের পসার সাজিয়ে বসেছে দোকানিরা। চলছে মোটর সাইকেল খেলা, নাগরদোলায় দোল খাচ্ছে মানুষ। এরসঙ্গে রয়েছে খাট-পালঙ্ক বিক্রির দোকান, জামা-কাপড়, কম্বল, মেয়েদের গয়না—এত কিছুর ভিড়ে লালনের তিরোধান উপলক্ষ্যে স্মরণ অনুষ্ঠান গেছে হারিয়ে। পুরো এলাকায় মানুষের হুড়োহুড়ি, মাইকে নানা ধরনের গানের চড়া সুর—এ সবের মাঝে লালনকে উপলক্ষ্য করে ব্যবসা আছে কিন্তু সত্যিকারের যে সম্মান ও শ্রদ্ধা নিবেদন তা হচ্ছে না। অনেক বড়ো বাউল ফকির তো প্রথম রাতেই ছেড়ে গেছেন আখড়া। এছাড়াও লালন আখড়ার আশপাশের এলাকায় অনেক সাধু বাস করেন। কিন্তু তারা এই আনুষ্ঠানিক আয়োজনে আসেন না। আনুষ্ঠানিক আয়োজনের চাইতে বাউলদের আগ্রহ বেশি দল বেঁধে গান করার প্রতি।
‘এটা আর লালনের অনুষ্ঠান নাই। রাজনৈতিক দলের বক্তৃতার জায়গা হইছে, অফিসারদের উফ-বাচ্চারা গান গায়’ -ক্ষোভের সঙ্গে বলছিলেন ফকির তমিজ শাহ। মূল আখড়ার মিলনায়তনে চাদর বিছিয়ে বসেছেন তিনি। তমিজ শাহ বলছিলেন, ‘গুরু লালন সাঁই সাধুসঙ্গ শুরু করেছিলেন এই আখড়ায়। সেই সাধুসঙ্গ এখন নাই। এখন রাজনীতি হয়। একেক সময় একেক নেতারা আসেন। সরকার বদলায়, নেতা বদলায়। এই মঞ্চে বাউল গান হবে। এসব আলোচনায় সাধুদের কী লাভ? ভক্তরা গান শুনতে আসে, বক্তৃতা শুনতে আসে না।’
বাউলরা ফকিররা লালনের মাজারে নীরবে আসেন নীরবেই চলে যান। বাউলদের এখানে আসতে কোনো চিঠিপত্র বা দাওয়াত লাগে না। বাউলদের মতে, লালন ভক্তরা সাঁইজির পুণ্যভূমিতে ছুটে আসে মনের টানে। আঁখড়াবাড়িতে উপস্থিত হয়ে নানা আয়োজনে অংশ নেন।
এদিকে, আগত সাধু ভক্তরা শান্তিপূর্ণভাবে তাদের কর্ম সম্পন্ন করেছেন, জানালেন লালন মাজারের প্রধান খাদেম ফকির মহম্মদ আলী। মহামতি ফকির লালন সাঁইজির ১২৯তম তিরোধান দিবস উপলক্ষ্যে দেশের নানাপ্রান্ত থেকে আসা সাধু ভক্তরা সাঁইজির সান্নিধ্য লাভ করেছেন এমনটিই আশা নিয়ে ধাম ত্যাগ করেন।
গতকাল সমাপনী দিনে মূলমঞ্চে প্রথম পর্বে আলোচনা ও দ্বিতীয় পর্বে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের লালন শিল্পীদের সমন্বয়ে পরিবেশিত হয়েছে লালন সংগীত। সন্ধ্যায় আলোচনা পর্বে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন খুলনা বিভাগীয় কমিশনার লোকমান হোসেন মিয়া। কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমির সভাপতি মো. আসলাম হোসেনের সভাপতিত্বে স্বাগত বক্তব্য রাখেন কুমারখালি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাজিবুল ইসলাম খান। দ্বিতীয় পর্বে লালন একাডেমির শিল্পীদের পরিবেশনায় অনুষ্ঠিত হয় লালন সংগীতানুষ্ঠান।
