আরাফাত শাহীন
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর দিয়ে যে রেললাইন চলে গেছে, তার দুপাশে বেশ কিছু মানুষের বসবাস। একটু মাথা গোঁজার মতো কোনোরকমে তারা সেখানে বসবাস করেন। আমি বেশ কয়েকটি সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে সেখানে শিশুদের মাঝে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করতে গিয়েছি। অস্থায়ীভাবে রেললাইনের সঙ্গে বসবাস করা এই মানুষগুলো নিঃসন্দেহে সমাজের আর দশ জন মানুষের মতো নয়। সেখানে সকল কিছুরই অভাব রয়েছে। সমাজের একটা শিশু যে শিক্ষার সুযোগ পেয়ে থাকে সেখানকার শিশুরা তার সবটুকু পায় না। আগে তাদের মধ্যে শিক্ষা গ্রহণের প্রবণতা তেমন একটা ছিল না। তবে বর্তমান সময়ে শিশুরা দলে দলে স্কুলের দিকে ছুটছে। অভাবের তাড়নায় অনেক সময় পড়াশোনা এমনিতেই বন্ধ হয়ে যায়।
শিশুদের হাতে খাতা, কলমসহ অন্যান্য শিক্ষা উপকরণ তুলে দিতে গিয়ে দেখেছি তাদের মধ্যে অসামান্য আগ্রহ এবং একাগ্রতা রয়েছে। আমাদের সমস্ত কথা তারা বেশ আগ্রহের সঙ্গেই শুনেছে। তাদের চোখে-মুখে আশা এবং সম্ভাবনার ঝিলিক দেখতে পেয়েছি। প্রাথমিক শিক্ষার জন্য কাছে-পিঠে ভালো কোনো প্রতিষ্ঠান না থাকায় শিক্ষা হয়ে পড়েছে তাদের জন্য খুবই কষ্টকর। বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তাদের জন্য স্কুল পরিচালনা করে থাকে। একটু একটু করে হলেও সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে পিছিয়ে পড়া এই শিশুরা।
আমাদের দেশে ‘পথশিশু’ শব্দটা শুনলেই সমাজের ওপরতলার মানুষরা কেমন যেন অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকান। অথচ তারাও স্বাধীন বাংলাদেশের বাসিন্দা। ভাগ্যের ফেরে আজ তাদের এই অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়েছে। ঢাকা শহরের রাস্তায় রাস্তায় আমরা অসংখ্য শিশুকে ফেরি করে জিনিসপত্র বেচাকেনা করতে দেখি। হাজার হাজার শিশু ফুল বিক্রি করে পেটের ক্ষুধা মিটিয়ে থাকে। জীবিকার তাগিদে পরিবার তাদের রাস্তায় নামিয়ে দিয়েছে। শিশুরা আজ রিকশা চালাতে কিংবা কঠিন রোদে পুড়ে ইট ভেঙে বড়ো বড়ো দালানকোঠা গড়ে তুলতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। কারো কারো আবার সামান্য একটু থাকার জায়গাও নেই। শহরের ফুটপাতকে বিছানা এবং রাতের আকাশকে ছাদ বানিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে তারা।
বাংলাদেশে পথশিশুদের প্রকৃত সংখ্যা কত হবে তা নিয়ে সঠিক কোনো জরিপ পরিচালিত হয়েছে বলে আমার জানা নেই। কে-ই বা তাদের নিয়ে কাজ করতে যাবে! সময় কোথায় মানুষের! শহরের রাস্তায় রাস্তায় ভেসে বেড়ানো কয়েক লাখ শিশুরও ইচ্ছা ছিল কাঁধে ব্যাগ নিয়ে বাবা কিংবা মায়ের সঙ্গে স্কুলে যাওয়ার। কিন্তু তাদের ভাগ্যে তো অমন সুখ লেখা নেই! পথশিশুদের জীবনে শান্তি এবং নিরাপত্তার লেশমাত্র নেই। এই শিশুদের একটা বড়ো অংশ তাদের পিতামাতার পরিচয় সম্পর্কে জানে না। কী এক দুঃসহ যন্ত্রণা নিয়ে যে বেড়ে উঠছে তারা! আমরা যারা নিজেদের সভ্য মানুষ হিসেবে গর্ব করি, তাদের বোঝার সাধ্য নেই সমাজের এই পিছিয়ে পড়া শিশুদের কষ্ট কতটুকু। একবার একটু উপলব্ধি করা প্রয়োজন। সমাজের একটা বিরাট অংশ আমাদের চোখের সামনে ধ্বংসের শেষ সীমানায় পৌঁছে যাচ্ছে।
শিক্ষা এবং অন্যান্য মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত এ সকল শিশু আজকাল সহজেই জড়িয়ে পড়ছে অনৈতিক কার্যকলাপে। সমাজের একশ্রেণির মানুষ তাদের ব্যবহার করছে নিজেদের উন্নতির হাতিয়ার হিসেবে। শিশুরা মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে খুব অল্প বয়সেই। খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, রাহাজানির মতো ঘটনার সঙ্গে তারা আজ জড়িয়ে পড়ছে। অথচ শুরুতেই যদি তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা যেত, তাদের ভেতর শিক্ষার আলো জ্বেলে দেওয়া যেত তাহলে হয়তো এমনটা হতো না। শিক্ষাসহ সকল অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে সহজেই অন্ধকার জগতে পা বাড়াচ্ছে পথশিশুরা। তাদের এই কর্মকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সমাজ এবং দেশ।
আজকে আমাদের পথশিশুদের নিয়ে ভাবতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, তারাও এই সমাজেরই একটা অংশ। এই অংশকে অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমজ্জিত রেখে সমাজ কখনো এগিয়ে যেতে পারে না। শিশুদের জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আবার শুধু রাষ্ট্রের ওপর দায় চাপিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে বসে থাকলে চলবে না। তাদের এই অবস্থার দায় আমাদেরকেও বহন করতে হবে। সমাজের যে মানুষগুলোর সামর্থ্য আছে তাদের এগিয়ে আসতে হবে পথশিশুদের পুনর্বাসন ও শিক্ষার জন্য। আমি দেখেছি, এই শিশুরা সামান্য একটু দরদ ও ভালোবাসা পেলে কেমন ফুলের মতো সুবাসিত হয়ে ওঠে। আসুন, ওদের দিকে একটু মমতার দৃষ্টিতে তাকাই; ওদের ফিরিয়ে আনি সমাজের মূল স্রোতধারায়।
n লেখক :শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
