মেরুন রঙের জাগুয়ার গাড়িটির ছাদ খোলা। তাতে বসতেই দেহমনে কেমন যেন স্পোর্টি ফিলিং চলে আসে। ড্রাইভ করে ইহোনিকা গাড়িটিকে নিয়ে আসে হৌগটনের রাজপথে। পেছনের সিটে বসে একপাশ থেকে আমি তার দিকে তাকাই। সে কালো রোদচশমায় চোখ ঢেকে ড্রাইভ করছে, তাই তাকে কেমন যেন স্পাই থ্রিলারে বর্ণিত দুর্ধর্ষ নারী এজেন্টের মতো দেখায়।
জোহানেসবার্গের শ্বেতাঙ্গ বুয়ার কন্যা ইহোনিকার সাথে হলেণ ও আমার নিবিড় পরিচয় নব্বই দশকের পয়লা দিকে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যামহার্স্ট শহরে। বিশ্ববিদ্যালয় ভিত্তিক একটি প্রশিক্ষণ কর্মশালায় যোগ দিতে ইহোনিকা ওখানে এসেছিল। হলেণ ছিল ওই কর্মশালার প্রশাসক, আমি কাজ করছিলাম প্রশিক্ষক হিসেবে। এত বছর পরও যে আমাদের অন্তরঙ্গতা জারি আছে, তার প্রমাণ—আমরা দুজন জোহানেসবার্গে আসা-মাত্র ইহোনিকা আমাদের নগরীর পর্যটকপ্রিয় হটস্পটগুলো দেখানোর উদ্যোগ নিয়েছে। আজ সে আমাদের নিয়ে যাচ্ছে— ম্যান্ডেলার স্মৃতিবিজড়িত একটি ফার্মে। কথা আছে, আমরা তারপর একটি স্পা-তে বেড়াতে যাব।
জোহানেসবার্গের ট্রাফিক দেবতা আজ আমাদের প্রতি প্রসন্ন। আমরা ধন্য বোধ করি লিলিজলিফ ফার্মে খুব অল্প সময়ে পৌঁছাতে পারার জন্য। এলাকাটির নাম রিভোনিয়া। এখানেও গাছাপালা প্রচুর, কান ঝালাপালা হচ্ছে না নগরের কোলাহলে—দেখে দারুণভাবে ভালো লাগে। জাগুয়ারখানা পার্ক করে আমরা চলে আসি ফার্মের স্বত্বাধিকারী আর্থার গোল্ডরিচ ও তাঁর স্ত্রী হ্যাঝেল গোল্ডরিচের পারিবারিক বাসভবনের সামনে। অতীত দিনের ভিলাটির আদি নকশা বজায় রেখে দালানটিকে নতুনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। পুরো ফার্মটি বর্তমানে সাউথ আফ্রিকান হেরিটেজ মিউজিয়ামগুলোর অন্তর্ভুক্ত। সামনের ছাঁটা ঘাসের লনটির প্রান্তিকে লাগানো সাইনবোর্ডে আছে লিলিজলিফ ফার্ম সম্পর্কিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। আমরা দালানে ঢোকার আগে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে নিই—সাউথ আফ্রিকার মুক্তির লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ খামারের ইতিহাস।
১৯৬০ সালের ৭ এপ্রিল, তত্কালীন সম্পূর্ণ শ্বেতাঙ্গ নিয়ন্ত্রিত দক্ষিণ আফ্রিকায় জারি হয় ‘আনলোফুল অরগেনাইজেশন অ্যাক্ট’ নামক একটি কালাকানুন। এ আইনটি বহাল হলে নিষিদ্ধ ঘোষিত হয় ‘এপারটাইট’ বা ‘বর্ণবিভাজন’ প্রথার বিরুদ্ধে সকল ধরনের প্রতিবাদ ও আন্দোলন। অন্য দুটি বর্ণবিভাজন বিরোধী দল তথা পিএসি বা প্যান আফ্রিকানিস্ট কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট পার্টির সাথে এএনসি বা আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসও বাধ্য হয় আন্ডারগ্রাউন্ডে যেতে। কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য গোল্ডরিচ নামে এক শ্বেতাঙ্গ দম্পতি ১৯৬১ সালে খামারটি খরিদ করেন—সঙ্গোপনে তা কমিউনিস্ট পার্টির হেড কোয়ার্টার হিসেবে ব্যবহার করার জন্য। এএনসি বর্ণবিভাজন প্রথার বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধের উদ্যোগ নিলে—অতঃপর কমিউনিস্ট পার্টির সম্মতিতে গোল্ডরিচ দম্পতি ফার্মটি আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে এএনসি-র তত্পরতা চালানো নেতাদের ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহার করতে দেন।
নেলসন ম্যান্ডেলা—দক্ষিণ আফ্রিকার মুক্তিসংগ্রামের অন্য দুই জনগুরুত্বপূর্ণ নেতা আহমেদ খাতরাদা ও ওয়াল্টার সিসুলু প্রমুখের সাথে এ খামারে আত্মগোপন থাকাবস্থায় সংগঠিত করেন এএ.সি-র ‘এমকে’ নামে পরিচিত সশস্ত্র উইং; যা কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার হাসিলের আন্দোলনে ‘উমখনটো ইউ সিজউই’ বা ‘বর্শার ধারালো অগ্রভাগ’ নামে লোকপ্রিয় হয়ে ওঠে। ডেভিড মোটসামায়ি ছদ্মনামে কৃষিশ্রমিকের নীল অভারঅল পরে ম্যান্ডেলা এ চত্বরে দিন গোজরান করেছেন অন্তত বছর দুয়েক। তাঁর গ্রেফতার হওয়ার আগে এ ফার্ম থেকে পরিচালিত হয় শ্বেতাঙ্গ নিয়ন্ত্রিত বর্ণবাদী সরকারের বিরুদ্ধে ‘মায়ি বুয়ি’ নামক গেরিলা অপারেশন।
আমি ও হলেণ ইহোনিকার সাথে দালানঘরের করিডোর ধরে আগাতে আগাতে দেখি, দেয়ালে বড়-বড় হরফে লেখা ম্যান্ডেলার বাণী। ইহোনিকা থেমে তাঁর একটি উদ্ধৃতি জোরে জোরে পড়ে :
‘যে শিকল তোমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে তা ছিন্ন করাই মুক্তি নয়, প্রকৃত মুক্তি হচ্ছে—জীবনযাপনে অন্যদের মুক্তির প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করা এবং তাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া।’
ম্যান্ডেলার বক্তব্যের খণ্ডাংশ শুনতে শুনতে তাঁর আত্মজীবনীতে বর্ণিত একটি ঘটনা মনে পড়ে। তরুণ আইনজীবী হিসেবে ফ্যাশনেবল স্যুট পরে ঘুরে বেড়াতেন ম্যান্ডেলা। তাঁর সামাজিক প্রতিপত্তিও বাড়ছিল। চাইলে এভাবে তুলনামূলকভাবে রিস্কফ্রি দিনযাপন করতে পারতেন তিনি। কিন্তু একদিন মনে হলো—এ ধরনের আত্মকেন্দ্রিক জীবনযাপনকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাবেন সামনে, ঝুঁকি নিয়ে দাঁড়াবেন বর্ণবাদী প্রথার বিরুদ্ধে, লড়াই করে অবসান ঘটাবেন এ সামজিক বেইনসাফির। এ সংকল্প থেকেই তিনি যুক্ত হন সশস্ত্র সংগ্রামের পরিকল্পনায়। ঘরসংসার ছেড়ে ফার্মে আন্ডারগ্রাউন্ড হালতে কৃষিশ্রমিকের ছদ্মবেশে নেতৃত্ব দিতে শুরু করেন চলমান বর্ণ-যুদ্ধে।
আরো কয়েক কদম আগ বাড়তেই কেন জানি আমার মন ভরে ওঠে অনুশোচনায়। আমি যে ধরনের দিনযাপন করছি, তাতে আছে ফ্যাশনেবল কার রাইড, কখনো-সখনো আপস্কেইল রেস্তোরাঁয় পানভোজন, দূর কোনো দেশের আধচেনা রাজধানী শহরে বসে শোনা শ্রুতিনন্দন কনসার্ট, আর আছে ক্রমাগত ভ্রমণের উত্তেজনা, ছিনতাই বা বিমান ধরতে না পারার বিড়ম্বনা; কিন্তু এসব তত্পরতায় আমি প্রদান করছি যে মেহনত, ব্যয় করছি যে বিত্ত, তাতে উপকৃত হচ্ছে না অন্য কেউ।
ম্যান্ডেলার আরেকটি বাণীর সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে হলেণ আমাকে তা পড়তে অনুরোধ করে। আমি অতিকষ্টে ক্বোসা ভাষায় রচিত বিরাট আকারের দু’টি শব্দ উচ্চারণ করি : ‘নদিউইলিমিলামবো ইনামগামা’ অর্থাত্ ‘আমি অতিক্রম করেছি অনেকগুলো বিখ্যাত নদী।’ এ প্রবাদবাক্যের ব্যাখ্যা হিসেবে ম্যান্ডেলা লিখেছেন :‘আমাদের ভাষায় এর মর্মার্থ হচ্ছে, ভ্রমণের প্রক্রিয়ায় একজন ঋদ্ধ হয় প্রভূত অভিজ্ঞতায়।’
প্রবাদবাক্যটি পড়তে পড়তে আমরা পরস্পরের দিকে তাকাই। অনেক বছর আগে নিশিরাতের ট্রেনে চড়ে কানাডার মনট্রিয়লের দিকে যাওয়া থেকে আমাদের যুগল ভ্রমণের শুরুয়াত। দক্ষিণ আফ্রিকাকে যদি হিসাবে ধরা যায়—তাহলে আমরা একত্রে সফর করেছি কুল্লে এগারোটি দেশ। আমি আঙুলের আঁকে দেশশুমারী করে বলি, ‘এখনো খুঁজে পাইনি একটি ভুবন যাকে স্বদেশ বিবেচনা করে বাঁধা যায় মোখতোসর একটি ঘর।’ হলেণ আমার মন্তব্যে দ্রুত দ্বিমত প্রকাশ করে পাল্টি দেয়, ‘পারহেপ্স, হোয়ার উই আর অ্যাট দিস মোমেন্ট ইন লাইফ ইজ আওয়ার হোম।’ আমি তার বক্তব্য নিয়ে ঈষত্ ভাবি, তবে কি জোহানেসবার্গের যে গেস্টহাউসে আমরা হালফিল দিনযাপন করছি, সেটাই আমাদের বসতবাড়ি, নিত্যপ্রয়োজনের আদনা কুড়েঘর? নাকি তত্পর হব এ গেস্টহাউসকে বেসক্যাম্প হিসেবে ব্যবহার করে অন্য আরেকটি নগরের সন্ধানে বা ভিন্ন এক দেশের অভিযানে?
আমরা ভেতরের হল-কামরার এক কোনায় আর্থার গোল্ডরিচের সাথে বাটিকের ব্রাইট একটি শার্ট পরা নেলসন ম্যান্ডেলার ছবি দেখতে পাই। তাঁর পোশাক-আশাকের জেল্লা দেখে আন্দাজ করি, দক্ষিণ আফ্রিকান প্রেসিডেন্সি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করে ম্যান্ডেলা পুরনো দিনের কমিউনিস্ট সুহূদ গোল্ডরিচ সাহেবের সাথে দেখা করতে এসেছিলেন তাঁর রাজনৈতিক তত্পরতার গোপন আস্তানায়। বিরাট এ আলোকচিত্রটির সামনে দাঁড়িয়ে বিচিত্র এক অনুভূতি হয়। শ্বেতাঙ্গ হওয়ার ফলে গোল্ডরিচ পারিবারটি ছিল সবরকমের সন্দেহের ঊর্ধ্বে। মনশ্চক্ষে দেখি—ম্যান্ডেলা ডেভিড মোটসামায়ি ছদ্মনামে শ্রমিক সেজে, আবার কখনো রাঁধুনির ভূমিকায় আজ থেকে প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর আগে এ শ্বেতাঙ্গ পরিবারের সেবা করছিলেন।
একটি করিডোর অতিক্রম করে আমরা চলে আসি আরেকটি বড়-সড় কামরায়। এখানে তরুণ ম্যান্ডেলার জোহানেসবার্গে আইনজীবী হিসেবে কাজ করার সময়কার একটি বৃহত্ আলোকচিত্রের সামনে দাঁড়িয়ে নানা দেশ থেকে আগত কতিপয় পর্যটক। এরাও মনে হয় দিনবদলের ব্যাপারে ব্যাপকভাবে সচেতন হয়ে পরিবর্তনের চালিকাশক্তি মানুষটির ছবির সামনে দাঁড়িয়ে নীরবে জানাচ্ছেন শ্রদ্ধা। আমরাও বিনম্র শ্রদ্ধায় একটু সময় মৌন হয়ে দাঁড়াই। সাথে সাথে মনে পড়ে, যে মানুষটি শ্রমিক বা গৃহকর্মীর ছদ্মবেশে এখানে আত্মগোপন করেছিলেন, তিনি বর্তমানে এ শহরেই সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে কাটাচ্ছেন অখণ্ড অবসর।
ইহোনিকা লিলিজলিফ ফার্ম-এর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে করছে পোস্ট ডক্টরেল লেভেলে গবেষণা। তো সে ফার্মের কোনো এক কর্মকর্তার সাথে কথা বলতে গেলে আমি ও হলেণ একটু হাঁটাহাঁটি করতে বেরিয়ে আসি কমপাউন্ডে। হাঁটতে হাঁটতে আমরা অবশেষে চলে আসি বড় বড় গাছপালায় ছায়াচ্ছন্ন একটি প্রাঙ্গণে। বেশ কতগুলো ব্লু-স্প্রুস ও চায়নিজ ম্যাপোল বৃক্ষ দেখে আমরা একটু অবাক হই। আন্দাজ করি, এক জামানায় বিদেশ থেকে আমদানি করে এসব অলংকৃত বৃক্ষ এখানে লাগানো হয়েছিল। চোখেমুখে রঙের অলীক ফাগ ছড়িয়ে সামনের পায়ে চলা সড়কে নামে কতগুলো সবুজ রঙের ঝলমলে পালকওয়ালা বনকপোত। পথের পাশে বেড়ে ওঠা দীর্ঘ সাভানা-গ্রাসে কেন জানি ঢেউ খেলে যায়। আমাদের পদশব্দে সন্ত্রস্ত্র না হয়ে বনকপোতগুলো সড়কে খুঁটে খাচ্ছে ঘাসের বীজ। অনেকটা পেট মোটা হুজ পাইপের মতো দেখতে কালচে-ধূসর একটি দীর্ঘ নল দ্রুত বেরিয়ে আসে সাভানা-গ্রাস এর ঝোপ থেকে। চোখের পলকে একটি বনকপোত মুখে নিয়ে ফের ঘাসবনে ফিরে যায় অজগরটি! আমরা দারুণভাবে তাজ্জব হয়ে পরস্পরের মুখের দিকে তাকাই। মনে হয়, আফ্রিকা যেন চোখের পলকে আমাদের সামনে দেখা দিয়ে ফিরে গেল তার জঙ্গলের নিবিড় আশ্রয়ে।
ফার্ম হাউসটির সামনের আঙিনায় ফিরতেই দেখি—ইহোনিকা শ্বেতাঙ্গ এক প্রৌঢ়ের সাথে কথা বলতে বলতে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। আমরা পরিচিত হই আর্থার গোল্ডরিচ সাহেবের পুত্রের সাথে। কথাবার্তায় জানতে পারি, এ বাড়িতেই ইনি কাটিয়েছেন শৈশবের কয়েকটি বছর। ম্যান্ডেলাকে ইনি জানতেন গল্প বলিয়ে একজন শ্রমিক হিসেবে। আমরা তাঁকে একটু আগে দেখতে পাওয়া বনকপোত মুখে অজগরের ঘাসবনে ফিরে যাওয়ার কথা বলি। এতে অবাক না হয়ে পার্কিং-লটের দিকে হাঁটতে হাঁটতে তিনি তাঁর বাল্যজীবনের ইন্টারেস্টিং একটি স্মৃতি শেয়ার করেন। ব্লু-স্প্রুস ও চায়নিজ ম্যাপোল গাছে ছাওয়া প্রান্তরে তিনি হারিয়ে যাওয়া ক্রিকেট বল খুঁজতে গিয়েছিলেন। ঝগড়াটে হুলো বিড়ালের মতো গরগরে আওয়াজ শুনে বড় একটি বোল্ডারের ওপর দাঁড়িয়ে ঘাসঝোপের ওপর দিয়ে উঁকি দেন। ঝোপের ওপাশে দাঁড়িয়ে লেজ নাড়ছে একটি চিতাবাঘ। চিতাটি আলবাইনো বা তার পশম শ্বেতীগ্রস্ততার কারণে সম্পূর্ণ ধবধবে সাদা। তার সামনে ব্যুহ রচনা করে কাঁটা ছড়িয়ে দাঁড়ানো পাঁচটি নাদুস নুদুস শজারু। চিতাবাঘটি রাগে ঘরঘরাচ্ছে, কিন্তু কাঁটাওয়ালা শজারুদের আক্রমণ করতে হিম্মত পাচ্ছে না। আমাদের তিনি জাগুয়ারে তুলে দিয়ে স্মিত হেসে হাত নেড়ে সি অফ করেন।
লিলিজলিফ ফার্ম থেকে বেরিয়ে রাজসড়কে ওঠার মুখে ইহোনিকাকে ব্রেক কষতে হয়, কারণ সড়কে শুয়ে পড়েছে কয়েকটি কৃষ্ণাঙ্গ তরুণ। গাড়ি থামতেই এরা উঠে পড়ে ঘিরে ধরে জাগুয়ারটি। এদের গায়ে পরা কাঁটাওয়ালা শজারুর ছবি আঁকা টিশার্ট। নিজেদের ‘জোবার্গ পরকোপাইনস্ ক্লাব’ বা ‘শজারু ক্লাব’-এর সদস্য পরিচয় দিয়ে তারা হলেণ ও ইহোনিকার কাছে ‘সিন ট্যাক্স’ বা পূর্বপুরুষের কৃত পাপকর্মের গোনাগারি হিসেবে পঞ্চাশ-পঞ্চাশ একশত রেন্ড চাঁদা দাবি করে। ইহোনিকা কোনো প্রকারের তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত না হয়ে টাকা দিয়ে ফের গাড়ি ছোটায়। হাইওয়েতে ধেয়ে আসা বাতাসের ঝাপটার ভেতর আমার মন ফিরে যায় একটু আগে শোনা শ্বেতীগ্রস্ত চিতাবাঘ ও পাঁচটি কাঁটাওয়ালা শজারুর শোডাউন সম্পৃক্ত কাহিনিতে। মনে হয়, চিতাবাঘটি খাঁচাবন্দি হয়েছে, এবং প্রান্তরে হালফিল দৌরাত্ম্য চলছে কাঁটাওয়ালা শজারুর।
জোবার্গের জটিল ট্রাফিকে আমরা মিনিট চল্লিশেক খাবি খাই। আকাশ থেকে তেড়ছা হয়ে নামছে রোদ্দুরের ধারালো ফলা। গোনাগারি হিসেবে শজারু ক্লাবের সাঙ্গাতদের চাঁদা দেয়ার পর থেকে ইহোনিকার মেজাজ তেড়িয়া হয়ে আছে। সে নিচের ঠোঁট কামড়ে ড্রাইভ করছে। গরমের চোটপাট আরেকটু বৃদ্ধি পেতেই সে কার্ভারটেবোল জাগুয়ারের ছাদটি তুলে দিয়ে চালু করে এয়ারকন। আমরা সড়কের পাশে দাঁড় করানো কালচে কাচের দেয়ালওয়ালা কয়েকটি অফিস-দালান অতিক্রম করে যাই। যেতে যেতে গ্লাস-ওয়ালে প্রতিফলিত মেরুন রঙের স্পোর্টস্ জাগুয়ারের চলমান ছায়াকে দারুণ দেখায়।
একটি আপস্কেইল ডে স্পা’র দোরগোড়ায় আমরা এসে পৌঁছাই ভাটি বেলায়। রোদ মরে যেতেই ইকোনিকা ফের গাড়িটির ছাদ সরিয়ে দেয়। গাড়ি স্লো হতেই রোদে পুড়ে পুরো তামাটে হয়ে যাওয়া এক শ্বেতাঙ্গ সাহেব এসে খয়রাতের জন্য হ্যাট পাতেন। তাঁর মাতৃভাষা আফ্রিকানস্, কী বলেন আমরা ঠিক বুঝতে পারি না। ভদ্রলোকের চোখমুখে সানবার্নের পরিষ্কার দাগ। সম্ভবত মদ্যপান করে বেঘোর হয়ে আছেন। লাঠিতে ঠেকা দিয়েও ঠিক মতো দাঁড়াতে পারছেন না। ইহোনিকা তার হ্যাটে পাঁচ রেন্ডের কয়েন ফেললে—হলেণ ‘এক্সকিউজ মি’ বলে জানতে চায়—হ্যাট মাথায় না দিয়ে তিনি কাটফাটা রোদে পুড়ছেন কেন? চোখমুখ অসহায় করে তিনি ইশারায় যা বলেন, তার সারমর্ম হচ্ছে, হ্যাট আমার মাত্র একটা, এটা তো ব্যবহার করছি খয়রাত গ্রহণের কাজে, মাথায় দিলে ভিক্ষা করব কী দিয়ে? হলেণ ছোঁ মেরে আমার মাথা থেকে হ্যাটটি তুলে নিয়ে পরিয়ে দেয় সাহেব ভিখারির শিরে। আমি টুপি খোয়ানো ভিকটিম হিসেবে কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার সুযোগ পাই না, ইহোনিকা একসেলেটরে চাপ দিয়ে জাগুয়ারটিকে দক্ষ হাতে নিয়ে আসে ডে স্পা-টির অন্দরমহলে।
গাড়ি পার্ক করে কৃত্রিমভাবে ডোয়ার্ফ করা বেটেখাটো কতগুলো বিচিত্র গাছ দিয়ে সাজানো প্রাঙ্গণের ভেতর দিয়ে আমরা মোরাম বিছানো পথে আগ বাড়ি। প্রৌঢ় এক শ্বেতাঙ্গ পথচারি মাথা ঝুঁকিয়ে বাও করে সরে গিয়ে একটি পুষ্পিত ফিরিঙ্গিপানি গাছের তলায় দাঁড়িয়ে পড়েন। তাঁর দাঁড়ানোর ভঙ্গি থেকে ঝরছে একধরনের এটিকেট দুরস্ত আভিজাত্য। সাহেবটি পরে আছেন রঙচঙে ইন্দোনেশিয়ান বাটিকের ফুলহাতা শার্ট। এ ধরনের একটি শার্ট আমি ইন্দোনেশিয়া ভ্রমণের সময় জগজাকার্তা শহর থেকে কিনেছিলাম। এ সূত্র থেকে আলাপ জমানো যেতে পেরে ভেবে আমি দাঁড়িয়ে পড়ে বলি, ‘গুড আফটারনুন স্যার, আপনি তো দেখছি জগজাকার্তার দারুণ একটি শার্ট পরে আছেন।’ তাঁর হাতে বকলসে ধরা ক্রকার স্প্যানিওল প্রজাতির কুকুরটিও পরে আছে ব্রেলক্রো লাগানো একই মোটিফের বাটিকের জ্যাকেট। সারমেয় সন্তানটির চোখে পরা সবুজ রঙের রোদচশমা। সে আমার হাঁটুতে সামনের দু’পা তুলে ব্যাপকভাবে লেহনের শুরুয়াত করলে—আমি ইন্দোনেশিয়া সফর করেছি কি-না—জানতে চেয়ে সাহেব কুত্তার বাচ্চাকে ‘কাম ডাউন বেইবি অ্যান্ড সিট’ বলে শাসন করেন। জগজাকার্তা শহরের সাথে সফরসূত্রে আমার পরিচিতি আছে জানতে পেরে তিনি বলেন, ‘আই ওয়াজ বর্ন দেয়ার... লং টাইম অ্যাগো... ঔপনিবেশিক জামানায় যখন ইন্দোনেশিয়া ছিল ডাচ কলোনি। ওখানে মারডেকা বা সুকর্ণর নেতৃত্বে স্বাধীনতা হাসিল হলে পর আমাদের পরিবার জেহানেসাবার্গে ইমিগ্রেট করে।’ কালচে সিল্কের অফশোল্ডার সানড্রেস পরে এক তরুণী ঘাসের ওপর দিয়ে হাইহিলে হেঁটে এসে সাহেবের শরীরসংলগ্ন হয়ে রোদচশমাওয়ালা সারমেয়টির বকলস হাতে তুলে নেয়। আমাদের কথাবার্তা শুনতে শুনতে মিষ্টি করে নীরবে হাসে সে। তাকে দেখামাত্র যুবতীটির নৃতাত্ত্বিক পরিচয় জানতে আমি কৌতূহলী হয়ে উঠি। মেয়েটির খানিক হলুদাভ গাত্রবর্ণ কি ডাচ ও ইন্দোনেশিয়ান জাতিসত্তার সংকরজাত? তার খোলা কাঁধে বিকালের মোলায়েম রোদ পড়ে ছলকাচ্ছে গ্রানাইট পাথরের মসৃণতা। সাহেব হাত মিলিয়ে বিদায় নেন, তখন খেয়াল হয়—তাঁর কপাল, কানের নিচ ও করতলে কস্টটেপ দিয়ে আটকানো ছোট্ট-ছোট্ট ব্যান্ডেজ। তবে কি তিনি আজ ভোরে ছাড়া পেয়েছেন কোনো ক্লিনিক থেকে? তারা লনের ঘাস মাড়িয়ে ভিন্ন দিকে যেতে শুরু করলে আমরাও আগ বাড়ি। আর আমি চোখের কোণ দিয়ে ফের দেখে নিই নারীটির রোদ-ছোঁয়া খোলা কাঁধ। প্রাঙ্গণের সর্বত্র উড়ছে প্রচুর প্রজাপতি। মনে হয়, একটি প্রজাপতি এখনই তার গ্রীবার নিচে বসে নরোম ত্বকে এঁকে দেবে পুষ্পিত উল্কি।
আমরা এসে পড়ি পাথরের চাকলা দিয়ে ঘেরা একটি কৃত্রিম জলশয়ের পাড়ে। পড়ন্ত বিকালে জায়গাটি ঝিঁঝিঁ পোকার সমবেত আওয়াজে তীব্রভাবে মশগুল হয়ে আছে। জলের ওপর দিয়ে ঝিলিক পেড়ে উড়ে যায়—অনেকটা স্বদেশের মৌটুসি পাখির মতো ছোট্ট ক্বদের সবুজাভ-পার্পোলে ঝলমলানো আফ্রিকান সানবার্ড। হলেণ উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে, ‘হোয়াট অ্যা লাভলি আর্বান এসকেইপ।’ হ্যাট হাতে খয়রাত মাঙ্গা সাহেব ভিখারির খিন্ন মুখটি মনে ফিরে আসে। জানতে কৌতূহল হয়—কিছুদিন আগের সম্পূর্ণ শ্বেতাঙ্গ-শাসিত দক্ষিণ আফ্রিকায় এনার আর্থসামাজিক হালহকিকত কী রকমের ছিল?
