নৃ : কবিতা বিকেলে উত্সবের রেখা

আপডেট : ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ২০:২৩

সম্পাদকীয় পড়ে জানা গেল, ‘কবিতা বিকেল’ অস্ট্রেলিয়ার সিডনি প্রবাসী বাংলাভাষী সাহিত্য ও সংস্কৃতিমনাদের একটি প্ল্যাটফর্ম। তাদেরই আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘কবিতা বিকেল বাংলা সংস্কৃতি উত্সব ২০১৮’-এর প্রকাশনা—‘নৃ’। প্রকাশকাল ১০ নভেম্বর ২০১৮। ‘সিন এবং সিন্ডিকেটহীন শিল্প-সাহিত্য চর্চার মানসে, প্রায়ই না গ্রাম না মফস্বলের একটি পরিত্যক্ত পোস্টাপিসের শ্যাওলাধরা ছাদে, আমরা ক’জন দেশ-জাতি উদ্ধারে বসতাম। উদ্দেশ্য লিটলম্যাগ সম্পাদনা। কাজের কাজ যা হবার তা-ই..., বরং ওসব না করে যদি কলোনিয়াল কাজিনদের ব্যাপারে মনোযোগী হতাম, তাহলে আমাদের কারো না কারো ঠোঁটে না হোক, গালে অন্তত দু-একটা সুইটেস্ট স্টোলেন কিস জুটেও যেতে পারত।’—সম্পাদকীয়তে এই আপাত স্যাটেয়ারের আড়ালে, একধরনের হাপিত্যেশ চিকচিক করলেও, পৃষ্ঠা উল্টাতেই বরং এর বিপরীত অনুভূতি উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। ঝরঝরে ভঙ্গিমায় থরে থরে সাজানো গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ ইত্যাদি রচনাগুলো যে-কারও মনে মুহূর্তেই পাঠতৃষ্ণা জাগিয়ে তুলতে সক্ষম। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের ‘পাখি ধরা’ গল্পটি দিয়ে এ যাত্রার শুরু। সমকালীন প্রেক্ষাপটে, ক্ষমতাচর্চার বলি হয়ে যাওয়া অসহায় মানুষের অস্ফুট হাহাকার ফুটে উঠেছে এ গল্পে। পড়তে পড়তে মনে হতে পারে, কখন যেন পুলিশ, সাংবাদিক, বুড়ি, গ্রামপুলিশ, শিশু, ধর্ষণ, ফতুয়া, আগুন, খিস্তি, যৌনকর্মী ইত্যাদি অনুষঙ্গ সহকারে গল্পের দুনিয়াটি ‘গিমা শাক তোলা একজন বুড়ির রগওঠা হাতের শিরার মতো’ নিরুত্তেজ ও রুগ্ণ হয়ে উঠেছে! অন্যদিকে, স্বকৃত নোমানের ‘যুধিষ্ঠিরের কুকুর’ গল্পটিতেও ফুটে উঠেছে সমকালীন রাষ্ট্রীয় ও বিশ্ব রাজনীতির এক দুরারোগ্য অপচ্ছায়ার প্রতিরূপ; তবে তা শহুরে প্রেক্ষাপটে। পলায়নপরতা, জঙ্গিবাদ, নাগরিক ক্লেদ, স্যাঁতসেঁতে শহর ইত্যাদি অনুষঙ্গ পুঁজি করে, কুকুরের মনুষ্যত্ববোধের ভেতর দিয়ে মানুষের কুকুররূপকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে আঁকার চেষ্টা করেছেন এই গল্পকার।

১১২ পৃষ্ঠার, ২৫০ টাকা দামের, ম্যাগাজিন আকারের এই ‘নৃ’তে আরো গল্প লিখেছেন মেহেদী উল্লাহ, সবাক, মাসউদ আহমাদ, আহমেদ শুভ শরিফ, সরকার কবিরউদ্দিন, রাজন নন্দী, ইসহাক হাফিজ, কাজী সাইফুল ইসলাম ও মাসুম মাহমুদ। অন্যদিকে অনুবাদ গল্পে মধ্য-আফ্রিকার চাদ প্রজাতন্ত্রের সাহিত্যিক কৌলছি লামকোর ‘অন দ্য ফোর্থ ডে’র [‘চতুর্থ দিনে’] ভাষা-বদল করেছেন ফজল হাসান, এবং ‘অস্ট্রেলিয়ান ড্রিমটাইম স্টোরিজ’ [‘গালাহ পাখি ও উলাহ গুইসাপ’] হাজির করেছেন অনীলা পারভীন। ‘নৃ’তে ছাপা আছে ফকির ইলিয়াস, আবুল হাসনাত্ মিল্টন, মজনু শাহ, পিয়াস মজিদ, জাহিদ সোহাগ, শীর্ষেন্দু নন্দী, অঞ্জন আচার্য, আল নোমান শামীম, তানবীরা তালুকদার, আহমেদ ইলয়াছ [অনুবাদ : মোহাম্মদ আবদুর রাযযাক] ও সুদর্শন ফকিরের [অনুবাদ : শাখাওয়াত্ নয়ন] কবিতা। আরো আছে সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, মারুফ রসুল, সৈকত হাবিব, এ টি এম গোলাম কিবরিয়া, সুব্রত কুমার দাস, আশরাফুল আলম, লুবানা বিনতে কিবরিয়া ও মাহমুদা রুনুর গদ্য।

 ‘নৃ’র সব লেখা নিশ্চয় একেবারেই নতুন নয়, কেননা, ‘বিজেত্রীর ঘরে আমি যাইনি সেদিন, লোকে তবু/ আমাকেই বেরুতে দেখেছে’—মজনু শাহ’র এই কবিতা তো অনেকদিন আগেই পড়া আমাদের, তার কবিতার বই থেকে। তবু সাহিত্যপ্রধান লেখা ও দুর্দান্ত গেটআপ-মেকআপে ‘নৃ’ সত্যিই সুন্দর। তাই সম্পাদক শাখাওয়াত্ নয়ন, সম্পাদনা সহযোগী শীর্ষেন্দু নন্দী ও অনীলা পারভীন, শিল্প নির্দেশক মাহবুবুল হক, প্রচ্ছদচিত্রের শিল্পী রবি খান, আর্টিস্ট মানব এবং ‘নৃ’ সংশ্লিষ্ট সবার ধন্যবাদ প্রাপ্য। অতুলনীয় বুক ডিজাইন ও প্রোডাকশনের জন্য ধন্যবাদ ইকরিমিকরি পরিবারকেও।