সয়েল টেস্ট কেন প্রয়োজন

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০১৯, ২২:০২

নদীতীরবর্তী হাউজিং প্রতিষ্ঠান হইতে প্লট বা ফ্ল্যাট বরাদ্দ নিয়া প্রতারিত না হওয়ার জন্য সবাইকে সতর্ক করিয়া দিয়াছে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়। এই মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবং বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ব্যবস্থাপনায় ঢাকার চারিপাশের নদীতীরের অবৈধ স্থাপনা অপসারণের কাজ চলিয়া আসিতেছে। বহু বেসরকারি হাউজিং সোসাইটি নদীর জায়গা অবৈধভাবে দখল করিয়া লিজ গ্রহীতাদের প্রতারিত করিয়া প্লট কিংবা ফ্ল্যাট বরাদ্দ প্রদান করিতেছে। এখন এইসব স্থাপনা অপসারণ করায় প্লট গ্রহীতারা ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণ মানুষের সচেতনতার জন্য এই সতর্কতা জারি নিঃসন্দেহে একটি ভালো উদ্যোগ। তবে নদীর আশপাশের বৈধ জমিতে যাহারা ঘরবাড়ি বা বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা নির্মাণ করেন, তাহাদের জন্য একটি জরুরি জ্ঞাতব্য বিষয় হইল সয়েল টেস্ট বা মাটি পরীক্ষা। এই মাটি পরীক্ষা করিয়া বিভিন্ন ভবন তৈরির জন্য আমরা বারবার তাগাদা দিয়া আসিতেছি। কিন্তু এই ব্যাপারে সরকারি সংস্থাগুলির তেমন জোরালো কোনো নির্দেশনা লক্ষ করা যাইতেছে না। এমনকি নদীর মধ্যেও ঘরবাড়ি নির্মাণ করা যায়, যদি ঠিকমতো সয়েল টেস্ট করিবার পর যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। ভারতের রাজস্থানে অবস্থিত ওয়াটার প্যালেস বা জলমহলই তাহার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

সঠিক ফাউন্ডেশন, ডিজাইন ও ব্যয় নির্ধারণে সয়েল টেস্ট বা মাটি পরীক্ষার কোনো বিকল্প নাই। কোনো নিচু জায়গা কিংবা ভরাট মাটির জায়গায় নির্মাণকাজে অবশ্যই মাটি পরীক্ষার কাজটি সুচারুভাবে করিতে হইবে। প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ধারণ করিতে হইবে বোরিং গভীরতা। বোরিং স্থানে মাটির অক্ষত ও বিক্ষত নমুনা সংগ্রহ করিয়া তাহা ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করিতে হয়। নির্ণয় করিতে হয় বোরিং বা ড্রিলিংয়ের সাহায্যে পাঁচ ফুট অন্তর মাটির এসপিটি (স্ট্যান্ডার্ড পেনেট্রেশন টেস্ট) ভ্যালু ও সেফ বিয়ারিং ক্যাপাসিটি বা মাটির নিরাপদ ভারবহন ক্ষমতা। কিন্তু আমাদের দেশে অধিকাংশই ক্ষেত্রেই এই সয়েল টেস্টকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। ফলে সামান্য নদীভাঙন বা অন্য কারণে অনেক স্থাপনা টেকসই হয় না। আমরা প্রায়শ পত্রপত্রিকার খবরে দেখিতে পাই, নদীভাঙনের কারণে নদীতীরবর্তী স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান সহজেই নদীর গর্ভে তলাইয়া যাইতেছে। এইসব প্রতিষ্ঠান নির্মাণের সময় মাটির পরীক্ষা-নিরীক্ষা সঠিকভাবে করা হয় নাই। আবার তাহা করা হইলেও অনিয়মের আশ্রয় নিয়া সঠিকভাবে বোরিং করা হয় নাই। আমরা শুধু ক্যাসিনোর কথাই বলি, কিন্তু রাস্তাঘাট, কালভার্ট-সেতু, স্কুল-কলেজ প্রভৃতি স্থাপনা নির্মাণে সয়েল টেস্ট বা বোরিং-সংক্রান্ত অনিয়ম করিয়া যে অনেকে রাতারাতি আঙুল ফুলিয়া কলাগাছ হইয়া গিয়াছেন, তাহার কথা আমরা বেমালুম ভুলিয়া যাই।

আশার কথা হইল, বাংলাদেশে এখন এমন নূতন মেশিন আনয়ন করা হইয়াছে যাহার মাধ্যমে সয়েল টেস্টের পর মাটি কতটুকু বোরিং করা হইয়াছে তাহা সঠিকভাবে পরিমাপ করা যাইবে। তবে এই ক্ষেত্রেও সতর্কতা অবলম্বনের প্রয়োজনীয়তা রহিয়াছে। প্রায় এক দশক আগে ই-টেন্ডারিং চালু হইলেও ইহার মাধ্যমে নানা মারপ্যাঁচের কারণে আজ ৫০ ভাগ উন্মুক্ত দরপত্রেও প্রতিযোগিতা লক্ষ করা যায় না। তদ্রূপ কেবল সয়েল টেস্ট ও মাটি ড্রিলিংয়ের পরিমাপযন্ত্র আনিলেই চলিবে না, যাহারা ইহার সহিত সংশ্লিষ্ট আছেন তাহাদের সততা ও জবাবদিহিতার প্রতিও গুরুত্ব দিতে হইবে।