আজ ১৪ ডিসেম্বর, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। স্বাধীনতাসংগ্রামের সূচনালগ্ন হইতে চূড়ান্ত বিজয়ের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত আমরা হারাইয়াছি এমন কিছু মানুষকে, যাহারা ছিলেন এইদেশের অমূল্য মেধাসম্পদ। এই দিবসে আমরা গভীর শোক ও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করিতেছি সেইসব মানুষের স্মৃতি, যাহারা ছিলেন দেশপ্রেম ও মননশীলতায় অগ্রণী। ডিসকভারি চ্যানেলের একটি তথ্যচিত্রের কথা এইক্ষেত্রে উল্লেখ করা যাইতে পারে। কয়েক বত্সর পূর্বে প্রদর্শিত সেই তথ্যচিত্রে দেখানো হইয়াছিল যুক্তরাষ্ট্রের মানবসম্পদের মূল্য দেশটির প্রাকৃতিক সম্পদের চাইতেও অনেক বেশি। এই তুলাদণ্ডে ইউরোপের অধিকাংশ দেশের চিত্রও যুক্তরাষ্ট্রের মতোই। আবার জাপান প্রাকৃতিক সম্পদে অত্যন্ত গরিব, কিন্তু তাহার পরও তাহারা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। ইহার নেপথ্যে রহিয়াছে তাহাদের বিপুল মানবসম্পদ। অন্যদিকে ইহার বিপরীত চিত্র আমরা দেখিতে পাই আফ্রিকার কোনো প্রাকৃতিক সম্পদশালী দেশে—যেইখানে বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ রহিয়াছে ঠিকই, কিন্তু প্রকৃত মানবসম্পদ না থাকিবার কারণে তাহারা এখনো তিমিরাচ্ছন্ন। আমরা যদি এমন একটি বিরান ভূমির কথা কল্পনা করি যেইখানে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নাই, শিক্ষক নাই, শিল্পী-লেখকসহ কোনো মননশীল মানুষ নাই, নাই কোনো মানবসম্পদ সৃষ্টির কারিগর, আছে কেবল লক্ষ লক্ষ মানুষ—তাহা হইলে কেমন হইতে পারে সেই দেশের ভবিষ্যত্?
সুতরাং ইহা স্পষ্ট যে, একটি দেশ প্রধানত সমৃদ্ধ হয় তাহার মেধাসম্পদ ও মানবসম্পদ দ্বারা। একাত্তরে পাকিস্তানের ধূর্ত-নোংরা-নৃশংস মস্তিষ্ক এই ব্যাপারটি খুব ভালো করিয়া অনুধাবন করিয়াছিল। তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা-ঘোষণার প্রথম প্রহরের পূর্ব হইতেই, অর্থাত্ ২৫ মার্চ কালরাত হইতে তাহারা শুরু করে এইদেশের মানবসম্পদ সৃষ্টির কারিগরদের হত্যা করিবার মিশন। সেই মিশনের মারণকামড় দেখা যায় পরাজয়ের অন্তিম সময়ে, একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বরে। বুদ্ধিজীবী নিধনযজ্ঞে সহযোগী হইয়াছিল এই দেশেরই কিছু মানুষ—রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনীর সদস্যরা। তাহাদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ব্যতীত বুদ্ধিজীবীদের বাছিয়া বাছিয়া হত্যা করা পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষে অসম্ভব ছিল। ঘাতকরা চিহ্নিত বুদ্ধিজীবীদের তাহাদের নিজ নিজ বাড়ি হইতে গেস্টাপো কায়দায় তুলিয়া লইয়া কালো কাপড়ে চোখ বাঁধিয়া কোনো বিশেষ নির্যাতন কেন্দ্রে লইয়া যাইত। তাহাদের উপর চলিত নির্মম নির্যাতন। তাহার পর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বেয়নেটের আঘাতে তাহাদের দেহ ক্ষত-বিক্ষত করিয়া হত্যা করা হইত। ঢাকা শহরের প্রধান প্রধান বধ্যভূমিতে বুদ্ধিজীবীদের বহুসংখ্যক মৃতদেহ বিক্ষিপ্ত অবস্থায় পড়িয়া থাকিতে দেখা যায়।
দুঃখের ব্যাপার হইল, স্বাধীনতার সাতচল্লিশ বত্সর পার হইলেও সকল শহিদ বুদ্ধিজীবীর পরিচয় দূরের কথা, তাহাদের প্রকৃত সংখ্যা এখনো নিরূপণ করা সম্ভবপর হয় নাই। পাকিস্তানিরা চাহিয়াছিল এই দেশটিকে মেধাশূন্য করিতে। তবে ফিনিক্স পাখির মতো বাংলাদেশ ভস্ম হইতে ক্রমশ মাথা তুলিয়া দাঁড়াইয়াছে। বুদ্ধিজীবীদের মৃত্যুর শোক আমাদের শক্তি দিয়াছে পূর্বদিগন্তের নূতন সূর্যকে গৌরবদীপ্ত করিতে।
