কালিদাস

কালো মেঘে মরমি বার্তা

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০১৯, ১৮:৪৯

কালিদাস মেঘদূতের মতো আমাদের শিল্পাকাশে নতুন আশার বার্তা নিয়ে এসেছিলেন। চিরপুরাতনের সঙ্গে চিরনতুনের মেলবন্ধন ছিল তার শিল্পকর্ম। ছিলই বা বললাম কী করে! কালিদাস কর্মকারের শিল্পকৃতি মুছে ফেলবে অনাগত কালের সে সাধ্য নেই। কেননা তা ঠাঁই পেয়েছে চারুশীল মানুষের অন্তরে। জীবনের কোনো গভীরতর অর্থ অন্বেষণে নিবিড় অন্তর্যাত্রা থাকে সৃজনপ্রয়াসী মানুষের; কালিদাসেরও ছিল। কিন্তু সব মানুষই তো আলাদা। ভিন্ন তাদের কক্ষপথ। বিরাজ করেন যে যার আকাশে। জীবনের কোনো এক তাগিদ থেকে কালিদাস দূরাভিসারি হয়েছিলেন। তাই এই মাটির পৃথিবী আর দূর নক্ষত্রমণ্ডলের সঙ্গে তিনি তার শিল্পসত্তাকে সংরক্ত করেছিলেন নিবিড় আলিঙ্গনে। তিনি আত্মার মুক্ত সঞ্চরণ প্রত্যাশা করে শিল্প রচনা করেছেন। তার শিল্প আরাধনাশীল শিল্পীহূদয়ের রূপ ও রেখা পরিকীর্ণ মানচিত্র।

কালিদাস কর্মকার কেন প্রার্থনা-কাতর হলেন? এ প্রশ্নের উত্তর তিনি গিয়ে গেছেন তার শিল্পে। শিল্পীজীবনের উষালগ্নে তিনি শিল্পে যোগ করেছিলেন তপ্তশ্বাস; তার দেহ নাভিমূল থেকে উচ্চারণ করেছিল মুহুর্মুহু, ‘হে পৃথিবী নিরাময় হও।’ কিন্তু পৃথিবীতে মানবতার লাঞ্ছনা থামে না। এই সুন্দর নীল গ্রহের নানা কেন্দ্রে মানুষেরই তৈরি মরণাস্ত্র তাক করে আছে মানুষের হূদয়, শিশুর হূদয়—ধরিত্রীকে সহ্য করতে হচ্ছে ধর্ষণের বিষাক্ত ছোবল। এইসব নেতিবাচক অভিজ্ঞতা হয় আমাদের ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে। কালিদাস কর্মকাররা যুদ্ধে নিপীড়িত। তাদের পরিজনকে এই যুদ্ধে মরতে হয়েছে, উদ্বাস্তু হতে হয়েছে, লুট হয়ে গেছে তাদের তিনপুরুষের সঞ্চিত গৃহের স্মৃতিময় সামগ্রী।

কিন্তু সব শোক থেকে উজিয়ে নিজেকে বাঁচাতে হয়। কালিদাসকেও বাঁচাল তার শিল্প। একটা ভাস্কর্যপ্রতিম শিল্প তিনি গড়লেন মুক্তিযুদ্ধের পর। সেটা খুব সম্ভবত সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে। একটি আবক্ষ মানুষের মুখ। কৌণিকভাবে চেয়ে আছে, এমনই অভিব্যক্তি তার। কিন্তু তার গলদেশ এবং মুখমণ্ডলের কোথাও কোথাও পেরেক লাগানো। গলদেশে একটি কি দুটি গজাল ছিল বোধহয়। এই শিল্পকর্মটির তিনি অনেকগুলো সংস্করণ করেছিলেন। কাজটি দেখামাত্রই ক্রুশবিদ্ধ যিশুর কথা মনে পড়ে।

 

৮০-এর দশকের শুরুতে আমার শিল্পীর সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়। কী বলতে চান আপনার শিল্পে? এ প্রশ্ন শুনলে শিল্পীরা সাধারণত উত্তর দিতে চান না। কেউ কেউ প্রশ্ন শুনে ক্ষিপ্ত হন। আমার তরুণ দিনে এই মুর্খ প্রশ্ন শুনে কালিদাস রাগতস্বরে বলেছিলেন, ‘আমার বলার কিছু নেই, আপনি লেখালেখি করেন, আপনার যা মনে হয় তা লেখবেন।’ আমি জানতাম এই আবক্ষ প্রতিমায়নের নিহিতার্থ; ৭১-এর যুদ্ধের অসহ যাতনা। কিন্তু এই শিল্পকর্মটির মধ্যে যে প্রতিমালক্ষণ বা মানুষের অবয়ব সুচিন্তিত তা পাঠ করলে বোঝা যায় তা শিল্পী কালিদাসেরই মুখ। যিশুর কষ্টটা কতটা যন্ত্রণাদায়ক হয়েছিল, তা তিনি বুঝতে চেয়েছিলেন। পরে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলে তিনি আমার-আমাদের কালিদা হয়ে যান। আমি একদিন আড্ডালাপে তাকে এই ভাস্কর্য বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাই। তিনি বললেন, ‘ওইটা আমি হঠাত্ করেই পাইয়া যাই। আসলে তা একটা বাঁশের গোড়া। বলতে পারো ফেলনা অবজেক্ট। অবনীন্দ্রনাথ ‘কুটুম কাটাম’ সিরিজ করেছেন কুড়িয়ে পাওয়া গাছের ডালপালা দিয়ে, ওইরকম। কিন্তু ওই গোড়াটার দিকে তাকিয়ে আমার হঠাত্ মনে হলো মাটি ফুঁড়ে একাত্তরের যুদ্ধে নিহত কোনো মানুষ আমার দিকে চাইয়া রইছে। তারপর তা বাসায় নিয়ে এসে ক্রুশবিদ্ধ যিশু বানালাম। ওটা নিয়ে আমি অনেক ড্রইং ও পেইন্টিংও করেছি। এবং ওটাকে আমারই যন্ত্রণা হিসেবে নিয়েছি। তাই তা আত্মপ্রতিকৃতির আবরণে যিশুভাবনা অথবা যিশুভাবনার মধ্যে আমি।’ এ বিষয়টি সবিস্তারে বললাম এই কারণে যে, আমার মনে হয়েছে, কালিদাসের এই শিল্পকর্মটি আমাদের শিল্পচর্চায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে এবং আত্মপ্রতিকৃতির মধ্যে যুদ্ধযন্ত্রণা পুঞ্জীভূত করার নজির বোধহয় এদেশে আর একটিও নেই।

কালো মেঘ ভেসে যায় বা তাড়িয়ে দিয়ে কালো মেঘ নীলে ভাসতে সাধ হয়। কালিদাস প্রেমে জড়ালেন। প্রকৃতি ও নারী, দুই-ই তার বিষয় হলো। কিছুকাল নারী তার শরীর নিয়ে যৌবনের দেহজ ব্রীড়া প্রদর্শন করে কালির ক্যানভাস থেকে অন্তর্হিত হলো। তারপর তারা ফিরে এল রূপকের বেশে। কালিদাস মা কালীকে ডেকে আনলেন। প্রেমের পুষ্পিত শীর্ষে প্রজাপতির পাখার ক্ষীণস্বর শীত্কার ধ্যানস্থ হয়ে শুনেছেন শিল্পী। কিন্তু খুব দ্রুতই বুঝে গেছেন যে এ জগত্ সংসার এক অপার সম্পর্ক ও সঙ্গমের লীলা। সেই থেকে কালিদাসের কাজে ফুটে ওঠে মরমি আলো। সেই থেকে জাল-জালিকার জটা ভেদ করে কালিদাসের ছবির মধ্যভাগে একখণ্ড অমল আলো ফুটে থাকে। কখনো সেই আলো সূর্যোদয়ে মতো, কখনো তা একখণ্ড চৌকোণ বা বৃত্তের পরিসরে সীমায়িত।

কালিদাসের ছবির জমিনে নিধুর ইতিহাস আছে। শিশ্নোদরপরায়ণ যে কাল কিশোরীর রক্তমাংস দাঁতাল পশুর মতো কামড়ে খায় তার মুখোমুখি নিজেকে দাঁড় করিয়ে মানবিক বোধে আনত থেকে শিল্পসাধনা করেছেন কালিদাস। সবচেয়ে বেশি তিনি এঁকেছেন নারীর ধ্বস্ত মুখ। তিনি যত প্রতিমার মতো ইমেজ গড়েছেন, পৌরাণিক বৃত্তান্তকে স্পষ্টতা দিয়ে অবয়বের বিশদ বর্ণনা নিয়ে এসেছেন, তার চেয়ে বেশি চূর্ণ করেছেন নিটোল অবয়ব। যখন মানুষ মানুষকে হত্যা করে, নারীকে ধর্ষণ করে, তখন তো সে ধর্মকেই খুন করে। এই অন্তর্লীন বোধ আমৃত্যু শিল্পীকে তাড়িয়ে নিয়ে চলেছে।

প্রথমত তার ছবিতে প্রকৃতি ও মানুষের অভিন্নতার সূত্র এক নিজস্বতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নারী আর প্রকৃতি পরস্পরিত হয়েছে। তারপর সবই নিমজ্জিত হয়েছে কসমিক ভুবনে। অনেক নক্ষত্র ও আকাশের যোগাযোগে নিজের অস্তিত্বের ঠিকানা খোঁজার এক দুঃসাধ্য অভিযানে যাত্রা করেছেন কালিদাস। আমার জীবন কোনো নক্ষত্রের কুপ্রভাবে নিষ্কৃতির পথ খুঁজে পাচ্ছে না, অথবা কোনো নক্ষত্র আমাকে আলোর পথে হাঁটায়, শিল্পের রহস্যময় দেশে নিয়ে আসে, এসব ভাবনার আলোড়ন আমরা অনুভব করি এ শিল্পীর কাজে। শিল্পে কোনো স্বতঃসিদ্ধ সূত্র নেই। তবে কালিদাস নক্ষত্রপূজারী, এই সত্যে স্নাত হয়ে যায় আমাদের অন্তর, যখন নিমগ্ন হই তার কাজে।

ধর্ম ও ধর্মচর্চা অবশ্যই কালিদাসের ছবির একটা প্রধান বিষয়। কিন্তু কোন ধর্ম? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রসারিত গবেষণা প্রয়োজন। তার মধ্যে কালী আছে, ফকির-দরবেশের মন্ত্র-তন্ত্র আছে, দুলদুল ও বোরাক আছে, যেমন শিয়ারা এঁকে থাকে, তাবিজ-কবচ, তাগা, পাথর, তসবি, জপমালা-রুদ্রাক্ষসহ অজস্র অনুষঙ্গে আকীর্ণ তার চিত্রমালা। শুধু ছবি বা ইমেজ এঁকে অথবা চিত্রতলে রক্ষাকবচ যোজন করে নিদান সূত্র অন্বেষণ করেননি। কলন্দর ধর্মাচারিদের মতো তিনি নিজেকে ভারী ধাতব শেকল পরিধান করিয়ে বেদনা-চরিত্র হয়ে মঞ্চে অভিনয় করার মতো ‘পারফরমেন্স’ শিল্পে উপস্থাপিত হয়েছেন। কালিদাস এ দেশে নিরীক্ষাধর্মী শিল্পের আদি পুরোহিত। তিনি নিবিড় অনুধাবনে জেনেছিলেন মানুষরূপী দানব কেবলই শাণিত করছে মারণাস্ত্র; তাদের হিংসার আগুনে আজ মানবিকতা প্রান্তিক হয়ে পড়েছে। তাই বার বার কালিদাস রচনা করেছেন শিল্প নিরাময়ী মহৌষধির সারবত্তায় নিজেকে সমাহিত করতে চেয়েছেন, মন্ত্রের বলয়ে আশ্র খুঁজেছেন, এমনকি জ্বেলেছেন পবিত্র আগুন আত্মহুতির—যাতে নিরাময় হয় এই পৃথিবীর নিষ্ঠুর মরণব্যাধি। শেষাবধি কালিদাস নিরাশ্বাসী নন। একখণ্ড অমল আলো জাল-জালিকা ভেদ করে স্ফুটিত হয়ে তার ছবিতে। তিনি সূর্যের প্রতি আস্থাশীল। বিরামহীন ধ্যানমন্ত্র উচ্চারণ করে আত্মশুদ্ধির অঙ্গীকার অব্যাহত রেখে তিনি দিব্যচোখে দেখেন সূর্য ফুটছে, স্নাত হচ্ছে তার শিল্প আশার আলোয়।