ভোলার ঘটনা অতীতের ষড়যন্ত্রেরই পুনরাবৃত্তি

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০১৯, ২১:০০

ফেসবুক পোস্ট। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত। অতঃপর বিক্ষোভ, মিছিল, প্রতিবাদ, অরাজকতা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আক্রমণ; সংঘর্ষ, অ্যাকশন, গোলাগুলি। নিহত-আহত। বাংলাদেশে যারা আত্মস্বীকৃত ইসলামের হেফাজতকারী, তারা মাঝেমধ্যে এসব ঘটনায় জ্বালানি ঢেলে আইনশৃঙ্খলার অবনতির সুযোগ গ্রহণ করে হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতে চায়। ২০ অক্টোবর ২০১৯ ভোলার বোরহানউদ্দীন উপজেলায় ফেইসবুক পোস্টে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগে বিক্ষোভ, পুলিশের ওপর হামলা, পুলিশ কর্তৃক আত্মরক্ষার্থে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার, চারজন নিহত ও শতাধিক আহত হওয়ার ঘটনা অতীতের ধারাবাহিক ঘটনারই নিদর্শন।

বিপ্লব চন্দ্র শুভ নামে জনৈক ব্যক্তির ফেসবুক একাউন্টে ধর্মীয় অবমাননার স্ট্যাটাস দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। এদিকে বিপ্লব পূর্বেই থানায় গিয়ে পুলিশকে জানায়, তার ফেইসবুক হ্যাক করা হয়েছে এবং হ্যাকাররা তার কাছে চাঁদা দাবি করছে। এই মর্মে সে থানায় জিডি এন্ট্রি করে। কিন্তু পুলিশ বিপ্লবকে ছাড়েনি। পুলিশ বিপ্লবকে গ্রেফতার করে এবং আরো দুই জনকে হ্যাকার সন্দেহে গ্রেফতার করে। তারপরও তৌহিদি জনতার ব্যানারে প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া প্রতিবাদ সভা করা হয়। পুলিশ সভা পণ্ড করেনি। শুধু সভা দীর্ঘায়িত না করার অনুরোধ করেছিল। সভার শেষ দিকে বিনা উসকানিতে সভা থেকে একদল উচ্ছৃঙ্খল যুবক পুলিশের ওপর ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। পুলিশ সভাস্থল-সংলগ্ন মসজিদের দোতলায় একটি কক্ষে গিয়ে আশ্রয় নেয়। উচ্ছৃঙ্খল জনতা মসজিদের দোতলায় উঠে পুলিশকে কক্ষ থেকে বের করে আক্রমণ করতে চেষ্টা করে। তারা কক্ষের দরজা শাবল ও অন্যান্য বস্তু দিয়ে ভাঙার চেষ্টা করে। উচ্ছৃঙ্খল যুবকেরা অত্যন্ত বেপরোয়া ও মারমুখী ছিল। তাদের আক্রমণে পুলিশের কয়েকজন সদস্য আহত হন। একজন বুলেটবিদ্ধ হন। তাকে ঢাকা সিএমএইচে জরুরি ভিত্তিতে হেলিকপ্টারে স্থানান্তর করা হয়। পুলিশ আত্মরক্ষার্থে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে। গুলি হয়। ঐ ঘটনায় চারজন প্রাণ হারায়। পুলিশসহ শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়।

এ ঘটনা কেন ঘটল? যার ফেসবুকে ইসলামের অবমাননামূলক স্ট্যাটাস দেওয়া হয়েছিল, সে তো গ্রেফতার হয়েছিল। থানায় ছিল। তারপরও কেন এত অরাজকতা সৃষ্টি করা হলো? বিপ্লব ফেসবুকে নিজে লিখেছে, না অন্য কেউ হ্যাক করে লিখেছে, তা তদন্তের জন্য তো তাকে থানা থেকে ছাড়া হয়নি। সে গ্রেফতার হয়েছে। মামলা রুজু হচ্ছিল। তারপরও ইসলামের আত্মস্বীকৃত হেফাজতকারীরা আর কী চেয়েছিল? তাকে কি মেরে ফেলতে চেয়েছিল? বিচার না করে সঙ্গে সঙ্গে ফাঁসি দিতে চেয়েছিল? ইসলাম কি তা বলে? কেউ খুন করে পুলিশের কাছে এসে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলে, অর্থাত্ সে খুন করেছে এ কথা স্বীকার করলেই তো তদন্ত ও বিচার ছাড়া তাকে তাত্ক্ষণিকভাবে ফাঁসি বা সাজা দেওয়া যায় না। আইনেও সেই বিধান নেই, ধর্মেও নেই। মামলা করতে হয়। তদন্ত করতে হয়। সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করতে হয়। আদালত বিচারকার্য শেষ করে অভিযোগের পক্ষে সাক্ষ্য-প্রমাণ পেলে তাকে সাজা দিয়ে থাকে। হেফাজতিরা কি এটা বোঝেন না? নিশ্চয়ই বোঝেন। তারা বুঝে-শুনে পরিকল্পিতভাবে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি কাজে লাগিয়ে এ ধরনের নাশকতামূলক ঘটনা ঘটায় কেবল হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য।

আমি একজন মাওলনা সাহেবের সঙ্গে আলোচনা করেছিলাম। তিনি পবিত্র কোরআনের সূত্র উল্লেখ করে বললেন, ‘ইসলাম ও কোরআনের হেফাজত আল্লাহ নিজেই করবেন। সূরা হিজরতের ৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘অবশ্যই আমি উপদেশ (কোরআন) নাযিল করেছি এবং এর সংরক্ষণকারী আমি নিজেই।’ সূরা ছফ-এর ৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘এই লোকেরা আল্লাহর নূরকে (ইসলাম) নিভিয়ে দিতে চায়। অথচ আল্লাহ ইসলামকে পরিপূর্ণ করতে চান।’ অর্থাত্ ইসলামকে আল্লাহই টিকিয়ে রাখবেন। আলেম মহোদয়ই এভাবে বললেন। ইসলাম শান্তির ধর্ম। ইসলাম বিশৃঙ্খলা, ফ্যাসাদ ও ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি না করার শিক্ষা দেয়, যাতে পৃথিবীতে মনুষ্য সমাজে শান্তি-সম্প্রীতি বজায় থাকে। অথচ একশ্রেণির আলেম সংকীর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অরাজকতা সৃষ্টি করেন। এতে তারা ইসলামের হেফাজতের চেয়ে ক্ষতিই বেশি করেন।

অতীতেও একই কায়দায়, একই অভিযোগে ঐ বিশেষ মহল এ ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়েছিল। ২০১২ সালে কক্সবাজারের রামুতে, ২০১৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে এবং ২০১৭ সালে রংপুরে একই কায়দায়, একই অভিযোগে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের বাড়িঘর ও ধর্মীয় উপাসনালয়ে আক্রমণ করে ক্ষতিসাধন ও ভীতিকর পরিবেশের সৃষ্টি করে। রামুতে ১২টি বৌদ্ধ মন্দির এবং ৫০টির অধিক বৌদ্ধ সম্প্র্রদায়ের বাড়িঘর ব্যাপকভাবে ভাঙচুর করে। নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্র্রদায়ের ১৯টি মন্দির এবং তিন শতাধিক বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়। রংপুরেও একই কায়দায় হিন্দু সম্প্র্রদায়ের উপাসনালয় ও বসতবাড়িতে হামলা ও আগুন দিয়ে ব্যাপক ধ্বংসলীলা চালানো হয়।

রামুর ঘটনায় অভিযোগ ছিল এক বৌদ্ধ যুবক তার ফেইসবুকে পবিত্র কোরআন শরীফ পায়ের নীচে রেখে দাঁড়িয়ে থাকার ছবি পোস্ট করে ধর্মীয় অববাননা করেছে। তদন্তে দেখা যায়, ঐ ফেইসবুক ভুয়া (Fake) ছিল। ওটা ঐ যুবকের ফেইসবুক নয়। বান্দরবানের উপজেলার চেয়ারম্যান ও সাবেক শিবির নেতা তোফায়েল ঐ ঘটনার নেপথ্যে সক্রিয় ছিলেন। নাসিরনগরেও এক জেলে যিনি লেখাপড়া জানে না তার নামে Facebook খুলে ধর্ম অবমাননাকর পোস্ট দিয়ে হিন্দুদের মন্দির ও বাড়িঘর আক্রমণ করে। রংপুরে যে টিটু রায়ের নামে Fake Facebook খুলে ধর্ম অবমাননাকর পোস্ট দিয়ে ধর্মপ্রাণ লোকদের উত্তেজিত করে লঙ্কাকাণ্ড ঘটায় তদন্তে জানা যায়, ঐ টিটু এ সংক্রান্তে কিছুই জানে না। সে একজন খেটে খাওয়া গো-বেচারা টাইপের সাধারণ লোক।

২০১৩ সালে ২৮ ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ অপরাধী দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর ফাঁসির আদেশ হলে চাঁদে দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর ছবি দেখা গেছে, ফেইসবুকে এ ধরনের একটি পোস্ট দিয়ে সারাদেশে ব্যাপক ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালানো হয়েছিল। বাড়িঘর ও দোকানপাট ভাঙচুর ও আগুনে পুড়িয়ে দেয়। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। যানবাহন ভাঙচুরসহ ব্যাপক ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালিয়ে বগুড়া, চট্টগ্রাম, সাতক্ষীরা, ও অন্যান্য এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। এ ঘটনায়ও জামায়াত শিবির মুখ্য ভূমিকা পালন করে।

২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজত ইসলাম ঢাকা মহানগরীতে যে তাণ্ডব চালিয়েছিল তা মনে হলে এখনো গা শিউরে উঠে। তারা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ করে অনেককে আহত করেছে। একজন এস আইকে হত্যা করেছে। শান্তিনগরে ট্রাফিক অফিসে আগুন দিয়ে পুলিশকে পুড়িয়ে মারার প্রচেষ্টা চালায়। একজন পুলিশ সদস্য আগুনে পুড়ে মৃতপ্রায় ছিল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাকে সিঙ্গাপুরে চিকিত্সার জন্য প্রেরণ করায় আল্লাহর রহমতে তিনি কোনো রকমভাবে বেঁচে আছেন। সংঘর্ষে আরো কয়েকজন নিরীহ ব্যক্তি নিহত হয়। অসংখ্য যানবাহন ভাঙচুর ও আগুন দিয়ে পুঁড়িয়ে দেয়। দোকানপাট ধ্বংস করে। আইল্যান্ডের গাছগুলো কেটে ফেলে। অনেকগুলো কোরআন শরীফ পুড়িয়ে ফেলে। আওয়ামী লীগ অফিস পুড়িয়ে দেওয়ার জন্য চেষ্টা চালায়। পুলিশের বাধা পেয়ে ব্যাপক সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। পরের দিন হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরীকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি আদালতে ১৬৪ ধারায় দীর্ঘ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তার জবানবন্দিতে প্রকাশ পায় বিএনপি জামায়াতপন্থি মাওলানারা বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের পরিকল্পনা মোতাবেক তাণ্ডব চালিয়েছিল। তাদের কথায়ই শাপলা চত্বরে অবস্থান অব্যাহত রেখেছিল। পরের দিন বিএনপি-জামায়াত তাদের সঙ্গে এক হয়ে সরকারের পতন ঘটাতে চেয়েছিল। তত্কালীন মেয়র সাদেক হোসেন খোকা আন্দোলনকারীদের খাবার সরবরাহ করেছিলেন এবং পরের দিনের খাবার ও সকল প্রকার সহায়তা প্রদান করার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। বাবুনগরী স্বীকার করেছিলেন ঐ আন্দোলন বিএনপি-জামায়াতপন্থি আলেমদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তাদের কথায় তিনি নিজেও উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছিলেন। বাবুনগরীর জবানবন্দিতে এ সকল তথ্য ছিল। রাতে অবস্থানকারীদের শাপলা চত্বর থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। তাড়িয়ে দেওয়ার অভিযানে একটি লোকেরও প্রাণহানী হয়নি। অথচ মিথ্যাচার করা হয়েছিল যে শত শত লোক মারা গিয়েছে। আমি সাংবাদিক সম্মেলন করে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিলাম এ বলে যে, অবস্থানকারীদের তাড়িয়ে দেওয়ার সময় একটি লোকও মারা যায়নি। পুলিশ কোনো আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেনি। সাউন্ড গান ব্যবহার করে তাদেরকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। ঐদিন হেফাজত পুলিশের সঙ্গে ওয়াদা ভঙ্গ করে শাপলা চত্বরে তাদের অবস্থান অব্যাহত রেখেছিল। আল্লাহ ওয়াদা ভঙ্গকারীকে পছন্দ করেন না।

প্রত্যেকটি ঘটনায় পুলিশ একাধিক মামলা করেছে। তদন্ত শেষে অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় কোনো মামলারই বিচারকার্য সম্পন্ন হয়নি। বিচারের মাধ্যমে দোষীদের সাজা দেওয়া সম্ভব হলে হয়তো এ ধরনের ষড়যন্ত্রের প্রবণতা হ্রাস পেতে পারে বলে অনেকের ধারণা।

সাধারণ দেশপ্রেমিক নাগরিকদের উচিত এ ধরনের ষড়যন্ত্রে সম্পৃৃক্ত না হওয়া। গুজবে কান না দিয়ে ঠান্ডা মাথায় সঠিক তথ্য সংগ্রহ করে দেশের প্রচলিত আইনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

সরকার বাংলাদেশকে ডিজিটালাইজড করেছে দেশ ও জনগণের কল্যাণে। তথ্যপ্রযুক্তির সুফল জনগণ পাচ্ছে। সরকারের উন্নয়ন ও কোনো ভালো কাজই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী মহলের চোখে দৃশ্যমান হয় না। অথচ তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে তারা সরকারের বিরুদ্ধে নানারকম মিথ্যা প্রচারণা ও ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছে। একটির পর একটির ঘটনা ঘটিয়ে যাচ্ছে। মনুষ্যত্ব ও বিবেকসম্পন্ন কোনো ব্যক্তি এহেন জঘন্য কাজ করতে পারে না। যারা করে তাদের হূদয়ে বিবেক, মনুষ্যত্ব ও নৈতিকতা দ্বাররুদ্ধ হয়ে গেছে। তারা দেশ ও জনগণের শত্রুতে পরিণত হয়েছে। কাজেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও সাধারণ জনগণকে তাদের ব্যাপারে সর্বদা অত্যন্ত সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

n লেখক :সাবেক ইন্সপেক্টর জেনারেল, বাংলাদেশ পুলিশ