ফারসিতে শেষ বুধবারকে বলা হয় আখেরি চাহার শোম্বা। আরবিতে যেমন দশমকে আশুরা বলা হয়। কিন্তু এই আশুরা বলতে আমরা বুঝি মুহররম মাসের দশ তারিখকে। কারণ এই তারিখের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা। তেমনি আখেরি চাহার শোম্বা অর্থ শেষ বুধবার হলেও এটা বিশেষ মর্যাদা এবং সৌকর্ষ শোভিত হয়েছে সফর মাসের শেষ বুধবাররূপে। এই সফর মাসের শেষ বুধবার বা আখেরি চাহার শোম্বা প্রিয়নবি হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লামের পার্থিব জীবনের শেষ সুস্থতার দিন। গত বুধবার পালিত হয়েছে এই দিবসটি।
প্রিয়নবি হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের ১২ রবিউল আউওয়াল সোমবার সুবিহ সাদিকের ওয়াক্তে নুরের অবস্থান থেকে মানব অবয়বে পৃথিবীতে আবির্ভূত হন আল্লাহর খলিফা বনি আদমকে পূর্ণ মানবতা দান করবার জন্য। এখানে উল্লেখ্য যে, হযরত আদম ‘আলায়হিস সালামকে সৃষ্টি করবার হাজার হাজার বছর পূর্বে আল্লাহ জাল্লা শানুহু প্রিয়নবি হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লামের নূর মুবারক তথা নুরে মুহম্মদী সৃষ্টি করে তার থেকে বিশ্বজগত্ সৃষ্টির সূচনা করেন। আলমে আরওয়া বা আত্মার জগতে প্রিয়নবি হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লামকে নবুওয়াত ও রিসালত দান করেন। মূলত তিনিই প্রথম নবি। কিন্তু আল্লাহ জান্না শানুহু পৃথিবীতে নবি আগমনের ধারাবাহিকতায় তাকে সবার শেষে প্রেরণ করেন। তিনি সর্বশেষ নবি হিসেবে পৃথিবীতে তশরীফ আনেন। তার মাধ্যমেই ইসলামের পূর্ণতা আসে। আল্লাহ জাল্লা শানুহু নিয়ামত পরিপূর্ণভাবে পৃথিবীর মানুষের জন্য দান করেন। ইসলামকে পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা হিসেবে সানন্দ অনুমোদন দান করেন, ইসলামের বিজয় বারতা ঘোষিত হয়। আল্লাহর রবুবিয়ত কায়েম হয়।
সেই প্রিয়নবি নূরে মুজাসসম তাজেদারে মদীনা সরওয়ারে কায়েনাত রহমাতুল্লিল ‘আলামীন সাইয়েদুল মুরসালিন নুরুন আলা নুর হযরত মুহম্মদ মুস্তাফা আহমদ মুজতাবা সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়াসাল্লাম পৃথিবীতে যে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে প্রেরিত হয়েছিলেন তা সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করে তার প্রিয় বন্ধু, তার শ্রেষ্ঠ বন্ধুর কাছে যাবার প্রস্তুতি নিলেন। যেদিনটাতে শেষ বারের মতো তিনি কয়েক দিন রোগভোগের পর বেশ সুস্থ হয়ে উঠলেন সেই দিন মুসলিম মননে এক মহা আনন্দ মেখে স্মরণীয় হয়ে আছে। মুসলিম জাহানে সর্বত্র দিবসটি পালিত হয়। বিশেষ করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া, দূরপ্রাচ্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের কোনো কোনো অঞ্চলে এটি পালিত হয়। আমাদের দেশসহ এই অঞ্চলে এই দিবসটি আখেরি চাহার শোম্বা নামেই পালিত হয়ে আসছে।
১১ হিজরির সফর মাসের শেষ বুধবারে তিনি সুস্থ হন। এর আগে ১১ হিজরির ১৮ সফর অভ্যাসমতো রাতের বেলায় হযরত ‘আয়িশার হুজরা শরিফ থেকে পূর্বদিকে প্রায় দেড়শো মিটার দূরে অবস্থিত জান্নাতুল বাকীতে গিয়ে কবরসমূহ জিয়ারত শেষে ফিরে আসবার সময় তিনি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। দ্রুত পায়ে তিনি হযরত ‘আয়িশার হুজরা শরিফে শয্যাশায়ী হন।
খবর পেয়ে সবাই এসে ভিড় জমায় মসজিদুন নববিতে। সবারই মনে ভয় জাগে, প্রিয়নবি হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম কি আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছেন! সবার কাজকর্ম বন্ধ হয়ে যায়। অনেকের নাওয়া-খাওয়া পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়। সবারই মুখে একই প্রশ্ন তিনি এখন কেমন আছেন? অনেকেই ডুকরে ডুকরে কাঁদতে থাকেন। মা ফাতিমা রাদিআল্লাহু তাআলা আনহা পাগলিনীর মতো হয়ে যান। সে এক মহাবিষাদময় অবস্থার সৃষ্টি হয়।
১১ হিজরির সেই শেষ বুধবার শেষ রাতে তার দেহের তাপমাত্রা স্বাভাবিক হয়ে গেল। সারা জিসম মুবারক ঘেমে গেল। শরীরের সব যন্ত্রণা দূর হয়ে গেল। হযরত ‘আয়িশা সিদ্দিকা রাদিআল্লাহু তাআলা আনহা তার ওড়না দিয়ে তার সমস্ত শরীরের ঘাম মুছে দিলেন। তিনি গোসল করার ইচ্ছা প্রকাশ করলে কয়েক ডোল পানি নিয়ে আসা হলো, তা দিয়ে তিনি গোসল করলেন। প্রায় ১০ দিন পর তৃপ্তি সহকারে খাদ্য গ্রহণ করলেন। এক প্রশান্তির অনুভব সঞ্চারিত হলো। প্রিয় দুই নাতি ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন নানাজান সুস্থ হয়েছেন শুনে সেই অতি প্রত্যুষেই ছুটে এলেন। তিনি তাদেরকে বুকে চেপে ধরে আদর করলেন, সোহাগ করলেন। মসজিদে নববিতে সালাতে ইমামতী করলেন। মসজিদে নববিতে জনতার ঢল নামল। হযরত আবু বকর রাদিআল্লাহু তাআলা আনহু, হযরত উমর রাদি আল্লাহু তাআলা আনহু, হযরত উসমান (রা), হযরত আলী (রা), হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা) প্রমুখ সাহাবায়ে কেরাম প্রচুর পরিমাণে দান খয়রাত করলেন। অনেকেই দরিদ্রজনকে খাদ্য দান করলেন, শোকরানা নামাজ আদায় করলেন। প্রিয়নবি হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম মসজিদুন নববিতে উপস্থিত সকলের উদ্দেশ্যে খুতবা দিলেন। সর্বত্র যেন ঈদের আমেজ। সে আনন্দ যেন ঈদের আনন্দকেও ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু তার পর দিন তিনি আবার অসুস্থ হয়ে পড়লেন এবং ১২ রবিউল আউয়াল দুপুর বেলার দিকে তিনি তার রফীকুল আলার কাছে চলে গেলেন। রেখে গেলেন তার অনুপম আদর্শ, রেখে গেলেন আল্লাহর মনোনীত একমাত্র পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা আল ইসলাম। রেখে গেলেন তার মহান সুন্নাহ। তাই আখেরি চাহার শোম্বা বিশ্ব মুসলিম মননে এক মহাপ্রেম আন্দোলিত করবার দিন। এ দিন নবি প্রেমে আপ্লুত হবার দিন।
লেখক :পীর সাহেব দ্বারিয়াপুর শরীফ। সাবেক পরিচালক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ
