ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী

কিছু স্মৃতি কিছু কথা

কয়েক বছর আগে ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীর ৭৫তম জন্মদিন পালিত হয়েছিল। সেই উপলক্ষ্যে বুয়েটের প্রাক্তন ছাত্রদের সংগঠন একটি সংবর্ধনা সভার আয়োজন করে। এর কিছুদিন পর ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী, ড. আনিসুজ্জামান এবং ড. রফিকুল ইসলাম জাতীয় অধ্যাপক নিয়োগপ্রাপ্ত হলে বুয়েট অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন আরেকটি সংবর্ধনা সভার আয়োজন করে। এই দুটি সভায় ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীর উপস্থিতিতে অনেকেই তার সম্পর্কে বেশ কিছু বাক্য উচ্চারণ করেন।

আসলে ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীর বহুমুখী প্রতিভার সব কটি বিষয়ের সঙ্গে পরিচয় বোধ হয় অল্প লোকেরই আছে। সেই অল্প কজনের মধ্যে আমি নিজেকে একজন দাবিদার মনে করি। কারণ ছাত্রজীবন, সেই বুয়েটের সময়কাল থেকে এবং অনেকগুলো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে আমি তার সহযোগী হিসেবে কাজ করি। এ কারণে পেশাগতভাবে তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশেছি, যার জন্য তার গুণাবলির সঙ্গে, তার জ্ঞানের গভীরতার সঙ্গে এবং একজন পেশাজীবী হিসেবে তার কমিটমেন্টের অবিচলতা দেখে এবং তার একাগ্রতা ও নিষ্ঠা দেখে অভিভূত হয়েছি। আমি তাকে অনেকটা আমার একজন অভিভাবকের মতো মনে করতাম এবং তাকে একজন গুরুর মতো অনুসরণ করতাম। আমার ধারণা, এই বিষয়টি তিনিও জানতেন। কাজেই আমি যখনই তার কাছে যেতাম কিংবা যখনই তার কাছে কোনো জিনিস জানার জন্য গিয়েছি তিনি উদারভাবে তার জ্ঞানের ভান্ডার থেকে কিছুটা তত্ত্ব আমার সঙ্গে বোধ করি আনন্দেই শেয়ার করতেন।

স্যারের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয় ১৯৬৮ সালের শেষের দিকে, আমি তখন বুয়েটের ৪র্থ বর্ষের ছাত্র। উনি ইলেকট্রিকে পিএইচডি করে ফিরে এসে এই বিভাগের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। আমাদের তখন উচ্চতর জরিপবিদ্যা শেখার জন্য হাতে-কলমে কাজ করতে মাঠ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হতো। গাজীপুরের এখন যেখানে টেলিফোন বিভাগের ট্রেনিং সেন্টারসহ বিভিন্ন স্থাপনা রয়েছে তখন সেখানে একটি কি দুটো সুউচ্চ টাওয়ার ছাড়া বাকি এলাকাটাই ছিল ফাঁকা মাঠ। পাশেই শালের গভীর জঙ্গল, জঙ্গলের ফাঁকে ফাঁকে কিছু ধানখেত। জয়দেবপুর চৌরাস্তায় দুটি ধানখেত ছিল আর এখনকার গাজীপুর শহরে কিছু বাড়িঘর ছিল। এখানে এই টেলিফোন অধিদপ্তর প্রাঙ্গণের একধারে শিক্ষকদের জন্য তাঁবু এবং অন্যধারে ছাত্রদের তাঁবু। ক্লাস শুরু হতো সকাল ৭টায়। ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী স্যারসহ শিক্ষকরা সকালে এসেই আমাদের নির্দেশনা দিতেন ঐ দিনের কাজের বিষয়ে। ছাত্রদের কয়েকটি দলে ভাগ করে আলাদা আলাদা শিক্ষকদের হাতে ন্যস্ত করা হয়। আমি পড়েছিলাম স্যারের গ্রুপে। তখন থেকেই স্যারের সঙ্গে কিছুটা হূদ্যতা হয়। পাশ করার পর ১৯৭২ সালে আমি পুরকৌশল বিভাগে লেকচারার হিসেবে যোগদান করি। এবং ড. জামিল স্যার তখন একজন সিনিয়র শিক্ষক। কিছুদিন পর পুরকৌশল বিভাগ বিভক্ত হয়ে পানিসম্পদ কৌশল বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হলে আমাকে নতুন বিভাগে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু জামিল স্যারের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা দিনে দিনে বৃদ্ধি পেতে থাকে।

প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা দেশের বিভিন্ন প্রকল্পে পরামর্শদাতা হিসেবে নিয়োজিত হয়। এরকম কয়েকটি প্রকল্পে জামিল স্যার দলনেতা হিসেবে কাজ করেন এবং আমার সৌভাগ্য হয় তার সহযোগী হিসেবে কাজ করার। কয়েকটি প্রজেক্টের কথা বলতে চাই। প্রথমটি হলো উপকূলে জলোচ্ছ্বাস আশ্রয়কেন্দ্র মাস্টার প্ল্যান। দ্বিতীয়টি হলো যমুনা সেতু এবং তৃতীয়টি বর্তমানে নির্মাণাধীন পদ্মা সেতু। এই তিনটি প্রকল্পেই ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয় ছাড়াও সামাজিক বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় আনতে হয়েছে, পরিবেশগত সমীক্ষা পরিচালনা করতে হয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনসাধারণের পুনর্বাসনের বিষয়ে কাজ করতে হয়েছে। আমি লক্ষ করেছি যে জামিলুর রেজা চৌধুরী অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে প্রতিটা বিষয়ে তার সুচিন্তিত মতামত দিয়ে প্রকল্পগুলোকে সাফল্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় জামিলুর রেজা চৌধুরীর প্রচুর অবদান আছে। ভূমিকম্পের বিষয়ে তিনি একজন অগ্রণী বৈজ্ঞানিক। বাংলাদেশের বহু গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ভূমিকম্প শক্তি সহনশীলতা করার লক্ষ্যে তিনি পরামর্শ দিয়েছেন। ভূমিকম্প বিষয়ে পৃথিবীতে যেসব নামকরা বৈজ্ঞানিক রয়েছেন তাদের মধ্যে জামিলুর রেজা চৌধুরীকে অন্যতম মনে করা হয়।

বাংলাদেশে কম্পিউটার জনপ্রিয় করার জন্য তার অবদান অনস্বীকার্য। দেশের উচ্চ পর্যায়ের লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ থাকার কারণে কম্পিউটারকে সহজলভ্য করার জন্য উঁচু মহলকে তিনি প্রভাবিত করতে পেরেছিলেন। সফটওয়ার ডেভেলপ করে দেশে তরুণ সমাজ প্রচুর অর্থ উপার্জন করতে পারবে, এটা তিনি বিশ্বাস করতেন এবং এ লক্ষ্যে সরকারকে বহু পরামর্শ দিয়েছেন।

আমার বিবেচনায় জামিলুর রেজা চৌধুরী একজন সফল শিক্ষক ও গবেষক ছিলেন। জীবনের প্রথমদিকে বহুতল ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে তার সুপারিশগুলো দীর্ঘদিন আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করবে। তিনি বৈশ্বিক পর্যায়ে উঁচুতলা ভবন নির্মাণের বিষয়ে গবেষকদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি সহকর্মীদের প্রতি অত্যন্ত উদার মনোভাব পোষণ করতেন। রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে থেকে তিনি দেশসেবা করে গেছেন তার জ্ঞানের মাধ্যমে। তিনি নিয়মিত ইন্টারনেটে ঢুকে জ্ঞান আহরণ করতেন এবং অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে নিজেকে আপ-টু-ডেট রাখতেন। আর একটি কথা না বললে নয়, স্যার অসম্ভব পরিশ্রমী ছিলেন এবং প্রচণ্ড পড়াশোনা করতেন, অনেক শিক্ষক বর্তমানে পড়াশোনা করেন কিংবা পিএইচডি করার পর পড়াশোনার চর্চা বাদ রাখেন কিন্তু তিনি ছিলেন উলটো। নতুন বিষয়ে জ্ঞান আহরণে তার আগ্রহ যেন বেশি ছিল।

আমি তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে পেরে নিজেকে গর্বিত মনে করি এবং তার তিরোধান আমার কর্মজীবনে একটা বিরাট গ্যাপ সৃষ্টি করল। আমি তার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।

লেখক: পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ