ধারাবাহিক থ্রিলার

সাইকোপ্যাথ (পর্ব ৩)

দুই.
ইয়ারা নদীর ধার ঘেঁষে রোজানা কাউন্টির চেরি স্ট্রিটে অলোকের বাড়ির দরজা খুলতেই দড়াম করে কে যেন পড়ল। ‘পড়বি তো পড় মালীর ঘাড়ে, সে ছিল গাছের আড়ে!’ লোকটা প্রায় অলোকেশের পায়ের ওপর এসে পড়ল। উর্বী ত্রস্তহাতে বাইরের ঘরের লাইট জ্বেলেই দিল এক চিল-চিৎকার। ওঁ-আঁউচ!

একটা লোক, পাঁচ ফুটের মতোন হাইট, গায়ের রং সাদাটে কিন্তু সে সায়েব নয়, তার বয়স আন্দাজ পঁয়ত্রিশ বা একটু বেশি—এত রাতে সে এখানে এল কোত্থেকে! অলোকের দোরগোড়ায় পড়তেই তার জবান বন্ধ হয়ে গেল। দাঁতকপাটি লেগে গেছে বোধ হয়। একেবারে স্পিকটি নট।  

অলোক, ওই দ্যাখো রক্ত! উর্বী ভয়ার্ত স্বরে বলল। তার মানে লোকটা জখম হয়েছে। খুব বড়ো রকমের আঘাত পেয়েছে সে।

অলোক দেরি না করে এমারজেন্সি নম্বরে ডায়ার করলেন। তিনি নয় নয় করে ডজন খানেক দেশ ঘুরেছেন, তাই তিনি জানেন, বিদেশের মাটিতে জরুরি নম্বরটাই বিপদে-আপদে দিশা খুঁজে দেয়। অস্ট্রেলিয়ার জরুরি নম্বর ৯১১।

ওপাশ থেকে তৎক্ষণাৎ সাড়া এল। না না, কোনো কল সেন্টার নয়, রেকর্ডেড ভয়েসও নয়, একেবারে জলজ্যান্ত মানুষ তার জন্য জেগে বসে আছেন।

ইয়েস, প্লিজ টেল মি, হাউ ক্যান আই হেল্প ইউ, স্যার?

দিস ইজ অলোকেশ রয় ফ্রম বাংলাদেশ, অ্যা প্রাইভেট ডিটেকটিভ। আই’ম নাউ ইন দ্য চেরি স্ট্রিট, রোজানা, আইভান হো। হাউজ নাম্বার ১১। প্লিজ কাম অন ইন, সামওয়ান ইজ ডিপলি উন্ডেড। সংক্ষেপে বললেন অলোকেশ।    

ততক্ষণে উর্বী লোকটাকে দেখে নিয়েছে। বড়ো অদ্ভুত দেখতে মানুষ। চিনেম্যান হতে পারে, আবার না-ও হতে পারে। অদ্ভুত তার মুখের গড়ন। দ্যাখো অলোকেশ, লোকটার নাকটা কী ভোঁতা, যেন নাকটাই নেই।  

আরে, এসব কী বলছো! ওর নাক থাকবে না কেন? নাক ছাড়া মানুষ হয়!

আঃ তুমি দেখোই না অলোক! চাপাচাপি করে উর্বী।  

অলোকেশ উবু হন। তিনি জানেন, এসব কেসে ভিকটিমের গায়ে হাত না লাগানোই সমীচীন। আঙুলের ছাপ-টাপের একটা ব্যাপার থাকে। নিজে গোয়েন্দা হয়ে এসব বিষয় মানবেন না, তা কি হয়!

লোকটার তো নাক কাটা গেছে। সেখান থেকে রক্ত ঝরছে। হতাশার ভঙ্গি করলেন অলোকেশ। লোকটা বেশ ভীতু মনে হয়, নইলে নাক কাটা গেলেই সে জ্ঞান হারাবে কেন!

উর্বীর অমনি রামায়ণে বর্ণিত সেই দশমাথাঅলা রাবণের বোন শূর্পনখার কথা মনে পড়ে, রামচন্দ্রের ভাই লক্ষ্মণ তির মেরে যার নাক কেটে দিয়েছিল।    

কয়েক মিনিটের মধ্যে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে পুলিশ এসে গেল। বেলফিল্ড পুলিশ স্টেশন কাছেই, হাইডেলবার্গ ইস্ট রোডে। রোজানা থেকে বেলফিল্ড সাত কিলোমিটার মাত্র।  

সুপিরিয়র কনস্টেবল জেসিকা অ্যাস্টন বো করে বলল, ইউ আর অলোকেশ, রাইট?

ইয়েস মিস জেসিকা। দিস ইজ মাই ফ্রেন্ড অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস উর্বী। সুইনবার্ন ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি আমাদের একটা সেমিনারে ইনভাইট করেছে। পুরো কেসটা খুলে বললেন অলোক। বাইরে হঠাৎ গোঙানির আওয়াজ শুনে যে তিনি দরজা খুলেছেন তা-ও জানালেন।

সঙ্গে ডাক্তার ও নার্স ছিলেন। তারা ঝটপট লোকটাকে স্ট্রেচারে করে অ্যাম্বুলেন্সে তুললেন। তবে তার আগে লোকটাকে ভালো করে দেখলেন অলোকেশ। নাকটা বেশ কায়দা করে গোঁড়া থেকে কেটে নেওয়া হয়েছে। লোকটা বোধ হয় ঘোরের মধ্যে আছে, তাই কনস্টেবল জেসিকার কোনো প্রশ্নের উত্তর সে দিচ্ছে না।

জেসিকা অলোককে অনেক ধন্যবাদ দিলেন। এও বললেন, তুমি যা করেছ তা যেকোনো সুনাগরিক মাত্রই করা উচিত। শব্দ পেয়ে তুমি দরজা না খুললে সেটা খুব দুর্ভাগ্যজনক হতো, যদিও আমি বা মেলবোর্ন পুলিশ তোমাকে কারো পাশে দাঁড়াতে জোর করতে পারি না। এটা তোমার ঔদার্য, এই জন্যে তোমাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।  

সুপিরিয়র কনস্টেবল জেসিকা চলে গেলে উর্বী আর অলোকেশ কিছুক্ষণ নিশ্চুপ বসে রইল। ওরা বুঝে উঠতে পারছে না, কেসটা আসলে কী ঘটল! মাঝারি উচ্চতার একজন মানুষ, হতে পারে মেলবোর্নের নাগরিক বা পর্যটক, এভাবে এত রাতে নাক খুইয়ে তাদের বাসার সামনে এসে পড়ল! ওরা জানে না, লোকটা নিজে অপরাধী নাকি কোনো অপরাধচক্রের নিষ্ঠুরতার শিকার!

রাত আর বেশি বাকি নেই। কিছুক্ষণ পর উর্বী তার নিজের বাসায় ফিরে গেল। ওরা একে অপরের একটা বাড়তি চাবি নিজেদের সঙ্গে রাখল! কী জানি, কখন আবার কাজে লেগে যায়!

পরদিন সবক’টা লোকাল পত্রিকা এই ঘটনাকে বেশ গুরুত্ব দিয়ে ছাপল। ফলে কী হলো, মিস জেসিকার বরাতে একের পর এক রিপোর্টার অলোকের বাড়িতে এসে হামলে পড়ল। এমন উদ্ভট ঘটনা নাকি তারা আগে আর কখনো শোনেনি।  

সবার একটাই প্রশ্ন, লোকটাকে তুমি চেনো? না চিনলে অত রাতে তুমি তার জন্যে দরজা খুলে বসে রইলে কেন?

স্বভাবতই অলোকের উত্তর ‘না’ হবে। কিন্তু পরের প্রশ্নটা তার জন্য অপমানজনক। রিপোর্টাররা কি তাকে অপরাধী ভাবছে, নাকি ওই নাককাটা লোকটার আত্মীয়! যেচে পড়ে কারো উপকার করা নিশ্চয়ই অপরাধ নয়!

সে যাক, অলোক নিজেকে বাঁচাতে চটজলদি সুইনবার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলেন। এখানে অন্তত তাকে কোনো রিপোর্টারের বোকা বোকা প্রশ্নের জবাব দিতে হবে না। বলে কিনা নাককাটা লোকটা তার রিলেটিভ কি না! যত্তোসব উজবুকের দল কোথাকার! তার মানে বিশ্বের সকল প্রান্তেই কিছু স্টুপিড টাইপ জার্নালিস্ট থাকে, যারা কিনা এও জানে না যে, কাউকে অপমান বা আহত না করে কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়।  

১৯০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত সুইনবার্ন ইউনিভার্সিটির ক্রয়ডন ক্যাম্পাসে প্রফেসর কিম রিচার্ডের চেম্বার। তিনিই মূলত এই সেমিনারে অলোকেশের নাম সাজেস্ট করেছিলেন।

আসুন, বসুন মিস্টার অলোকেশ। আপনি মেলবোর্ন এসেই তো দেখি পত্রিকার ক্যাপশন হয়ে গেলেন!

সে কি! কেন? অলোক যেন আকাশ থেকে পড়লেন। তিনি ভাবতে পারেননি, সেই নাককাটা লোকটার খবর প্রফেসর কিম অব্দি চলে এসেছে।

এই দেখুন অলোকেশ, রিপোর্টার রিনি সেন কী লিখেছেন! আপনি নাকি একটা আহত লোকের জীবন বাঁচিয়েছেন। সত্যি বলতে, আপনার কারণে আমিও এখন হিরো। আপনার নামে সবাই ধন্য ধন্য করছে মিস্টার অলোকেশ। ইউ আর রিয়েলি গ্রেট। অন্য কেউ হলে এত রাতে ঘরের দরজাই খুলত না।  

রিনি সেন নামটা মগজে টুকলেন অলোকেশ। তার মনে হচ্ছে এই কেস অনেক দূর অব্দি গড়াবে।

প্রফেসর কিমের টেবিলে একটা নিউজ পেপারে রিনির নামটা দেখলেন অলোকেশ। ডেইলি নিউজ পেপার দ্য এজ। ভিক্টোরিয়া আর তাসমানিয়ায় মূলত ‘দ্য এজ’ পত্রিকা ছাপা হয়।

কেসটা কী একটু খুলে বলবে, মিস্টার অলোক? বললেন প্রফেসর কিম রিচার্ড।

মনে মনে হাসলেন অলোকেশ। বললেন, প্রফেসর, তুমিও! রিপোর্টারদের কথা শুনে শুনে আমি অতিষ্ঠ। ইটস অ্যা সিম্পল কেস, প্রফেসর। আমি আর উর্বী রাত জেগে বিকিনি-কিলার চার্লস শোবরাজকে নিয়ে পেপার বানাচ্ছিলাম। রাত তখন একটা-দেড়টার মতো হবে। উর্বী ওর বাসায় যাবে, ঠিক তখনই দরজায় কারো গোঙানির আওয়াজ। উর্বী ভয় পেয়ে যায়। কিন্তু আমি সাহস করে এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলি। দেখি একটা লোক দরজায় দাঁড়িয়ে। তার নাক কেটে রক্ত চোয়াচ্ছে। সহসা লোকটা আমার পায়ের উপর দড়াম করে পড়লো। আমি ৯১১ ডায়াল করি। বেলফিল্ড পুলিশ স্টেশন থেকে সুপিরিয়র কনস্টেবল মিস জেসিকা এলেন অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে। নাককাটা লোকটাকে তুলে নিয়ে গেলেন। ব্যস, সেখানেই ঘটনার ইতি। এক নিশ্বাসে কথাগুলো বললেন ডিটেকটিভ অলোকেশ রয়।

ওকে মিস্টার ডিটেকটিভ, কুল ডাউন। আমি আর তোমাকে বিরক্ত করবো না। আই প্রমিজ। কফি খাবে তো?

মাথা নাড়লেন অলোকেশ। ইয়েস, আই লাইক কফি। ইন ফ্যাক্ট, কফি না খেলে আমার মগজ খোলে না।

রিয়েলি? টাট্টু ঘোড়ার মতোন মাথা দোলান প্রফেসর কিম।

ইয়েস প্রফেসর। অ্যান্ড আই’ম সরি টু মিসবিহেভ উইথ ইউ। অন্তরঙ্গ সুরে অলোকেশ বললেন। সাদাচুল এই প্রফেসরটিকে বড্ড ভালো লেগেছে অলোকের। এর কাছে তার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। দ্য গার্ডিয়ানে একটা কেস-স্টাডি পড়ে প্রফেসর কিম তাকে খুঁজে এনেছেন। তারপর পাঠালেন নিমন্ত্রণের চিঠি। একজন সিরিয়াল কিলারের ওপর তাকে পেপার উপস্থাপন করতে হবে। অলোকেশের ক্যারিয়ারে এটা একটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। বলা যায়, গৌরবের পালক।  

আমি কি পত্রিকাটা একটু নিতে পারি? অলোক বললেন।

শিওর। দ্য এজ পত্রিকা মেলবোর্নে খুব বিখ্যাত। রিপোর্টার রিনি সেন কিন্তু আমার বিশেষ পরিচিত। চাইলে আমি তোমার সঙ্গে তার আলাপও করিয়ে দিতে পারি। নিজে থেকে বললেন প্রফেসর কিম।

খুব খুশি হন অলোকেশ। বললেন, তাহলে তো খুব ভালো হয়। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে প্রফেসর, এই নাককাটা লোকটা আমাকে বেশ ভোগাবে।

কেন, কেন? তা কেন বলছো মিস্টার রয়? তুমি নিজে তো আর তার নাক কাটনি।

কিন্তু পুলিশ যদি সে কথা মানতে না চায়! মনের ভেতর লুকিয়ে থাকা ভয়ের কথাটা ভাঙলেন অলোকেশ। তিনি বুঝতে পারছেন, এই প্রফেসর লোকটিকে ঠিক বিশ্বাস করা যায়। বিদেশের মাটিতে ইনি তার প্রকৃত বন্ধুর মতো। নইলে নিজের হাতে কফি বানিয়ে খাওয়াতেন না।

তা বটে। মাথা নাড়লেন ডিটেকটিভ অলোকেশ।

একটু সময় নিয়ে কফি খান প্রফেসর। খুব বেশি গরম কফি খেলে তার ঠোঁটে আগুনের আঁচ লাগে। রোগা-পাতলা চেহারার প্রফেসরটি দেখতে কিন্তু বেশ, অনেকটা ঠাকুরদাদের মতো, আবার বেশ জমিয়ে গল্পও করেন। গল্পবাজ না হলে কি ভালো শিক্ষক হওয়া যায়! যারা মেপে মেপে কথা বলেন তারা কখনো ছাত্র-ছাত্রীদের মন জয় করতে পারেন না।  

প্রফেসর কিম তার ঘরের জানালার খড়খড়ি টেনে দিয়ে বললেন, আমি ভাবছি অন্য কথা।

কী কথা মিস্টার কিম?

কাজটা আসলে কে করলো? আমি স্বচক্ষে নাককাটা লোকটাকে দেখিনি বটে, তার পরিচয়ও আমি জানি না, ঠিক বুঝতে পারছি না কে এমন গাড়ল যে একটা জলজ্যান্ত লোকের নাক কেটে নেবে! আমি এখানে সাইকোপ্যাথের গন্ধ পাচ্ছি অলোক। পরের কথাটা কিম একটু নিচুস্বরে বললেন। যেন নিজের সঙ্গে কথা বলছেন।

অলোকেশ খেয়াল করলেন প্রফেসরের ঘরের মধ্যে টবে এক রকম গাছ। তাতে ফুল ফুটে আছে। অনেকটা আমাদের কলমিফুলের মতন। এর নাম রুয়েলা, বা পিটুনিয়া বলে অনেকে। কী করে জানলেন! পাশেই একটা বোর্ডে নানারকম ফুলের সচিত্র নাম লেখা আছে। তার মানে প্রফেসর কিম ফুলেরও সমঝদার। বড়ো ভালোমানুষ এই প্রফেসর।  

অলোক বললেন, কী প্যাথের গন্ধ পাচ্ছেন প্রফেসর কিম? খুলে বলবেন প্লিজ?  

সাইকোপ্যাথ। আমি দীর্ঘ ত্রিশ বছর ক্রিমিনাল সাইকোলজি নিয়ে কাজ করছি, কিন্তু এমন আজগুবি কাণ্ড আগে আর দেখিনি। এ কথা আমাকে স্বীকার করতেই হয়, নাককাটার কেসটা অনন্য! রীতিমতো অভূতপূর্ব।  

অলোকেশ কী বলবেন ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না। তিনি নানারকম খুনে-ডাকাত দেখেছেন বা ধরেছেন, কিন্তু অযথাই কারো অঙ্গহানির কেস তিনি নিজেও দেখেননি। কেন মিছে একটা লোক অন্যের নাক বা কান কেটে নেবে! লোকটা পাগল, নাকি তার পেট খারাপ!

প্রফেসর কিম কফিটা বেশ ভালো বানান। বাইরে কনকনে ঠাণ্ডা, অলোকের পরনে লম্বা ঝুলঅলা ওভারকোট, গলায় কমফর্টার, পায়ে মোটা উলেন মোজাসহ জুতো। পাক্কা সাহেবের মতোন দেখতে লাগছে তাকে। এই ঠাণ্ডায় কফি না হলে ঠিক জমে না।

চলবে . . .

সাইকোপ্যাথ (পর্ব ১)

সাইকোপ্যাথ (পর্ব ২)

ইত্তেফাক/আরএ