ধারাবাহিক থ্রিলার

সাইকোপ্যাথ (পর্ব-১)

সাইকোপ্যাথ
ধারাবাহিক থ্রিলার: সাইকোপ্যাথ (পর্ব-১)

‘চার্লস শোবরাজ। কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার।

অবশ্য তার নিকনেম বিকিনি কিলার। দুর্ধর্ষ এক সাইকোপ্যাথ এই চার্লস শোবরাজ। প্রতিটি খুন সে এতই নিখুঁতভাবে করেছে যে, একজন সুস্থ মানুষ তো দূর কি বাত, খেপাটে মানসিক রোগীও তার ধারে কাছে ঘেঁষতে পারে না। সত্যি বলতে, খুনোখুনি ব্যাপারটাকে এই চার্লস শোবরাজ ওরফে বিকিনি কিলার রীতিমতো শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল।

চার্লস শোবরাজের জন্ম ৬ এপ্রিল ১৯৪৪, সাইগন, ফ্রেঞ্চ ইন্দোচিন। পুরো নাম হাতচাঁদ বাওয়ানি গুরুমুখ চার্লস শোবরাজ। তার বাবা ছিলেন ভারতীয় সিন্ধি ব্যবসায়ী, শোবরাজ হাতচাঁদ বাওয়ানি, আর মা ভিয়েতনামিজ সেলস গার্ল ত্রান লোং ফুন। শোবরাজের জন্মের মাত্র সাত বছর পর তার বাপ আচমকা কোথায় যেন নিরুদ্দেশ হয়ে যান, ফলে একা পড়ে যায় শোবরাজ আর তার মা লোং ফুন। সামান্য সেলস গার্লের চাকরি দিয়ে কি সংসার চলে! লোং ফুন আবারও বিয়ে করলেন, তার নতুন স্বামী এক ফ্রেঞ্চ আর্মি লেফটেন্যান্ট চার্লস শোবরাজকে দত্তক নিয়ে নেন। সেই থেকে মূলত শোবরাজের খুনোখুনির শুরু। সৎ-বাপের সংসারে থেকে পুরো দুনিয়াটাই তার কাছে একরকম নরক বলে মনে হয়।’

এইটুকু পড়ে থামল উর্বী, প্রাইভেট ডিটেকটিভ অলোকেশ রয়ের সহযোগী কাম বিশেষ বন্ধু। ওদের দুজনের বিয়ের কথা রয়েছে, তবে করবে করবে করেও বিয়ের ব্যাপারটা এখনো ঠিক মিটিয়ে উঠতে পারেনি। কিন্তু তাই বলে বিদেশযাত্রায় তো আর বাধা নেই! অলোকেশ ক্রিমিনাল সাইকোলজির ওপর ইউনিভার্সিটি অব সুইনবার্নে একটি পেপার উপস্থাপনের জন্য মেলবোর্ন এসেছেন। মওকা পেয়ে ঝুলে পড়ল উর্বীও।

এই, আমাকে তোমার সঙ্গে নেবে! টাকাকড়ি নিয়ে কিচ্ছু ভেবো না। এয়ার-টিকিট কেনার মতো টাকা আমার জমানো আছে। চাই কি, তোমার টিকিটও আমি কিনে দিতে পারি, অ্যাজ অ্যা ফ্রেন্ড। মিটিমিটি হাসে উর্বী।

সত্যি যাবে! চলো তাহলে। আর আমার এয়ার-টিকিট নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না উর্বী। ওটা সুইনবার্ন কর্তৃপক্ষ অলরেডি পাঠিয়ে দিয়েছে। আমি জাস্ট সেখানে যাবো, খাবো-দাবো, বগল বাজাবো। ব্যস।

কিন্তু বাস্তবে অলোকেশের আর বগল বাজানো হয়নি। কারণ এখানে পেপার প্রেজেন্ট করতে গিয়ে তার রীতিমতো গলদঘর্ম অবস্থা। বাঘা বাঘা সব প্রফেসর এসেছেন, আরো এসেছেন এফবিআই-এর এজেন্ট লুসি এন্ডারসন, স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের ডেপুটি কমান্ডার জন ইয়ার্ন, ক্রেমলিন থেকে এসেছেন মাইকেল ক্রোঁ। এরা সব বলতে গেলে অপরাধ তদন্তের শিরোমণি। সিরিয়াল কিলার আসলে কে এবং কী কী টাইপ হতে পারে, সব তাদের জানা। অলোক সেখানে মামুলি মুষিক বললে কিছু ভুল বলা হয় না।

সে যাক, সময়মতো মেলবোর্নের উদ্দেশে উড়াল দিলেন প্রাইভেট ডিটেকটিভ অলোকেশ রয় ও তার সহযোগী উর্বী। যে কিনা পেশায় আবার একজন আর্কিটেক্ট। বুয়েটের ‘বাঘী ছাত্রী’ ছিল একসময়। ইউনিভার্সিটি অব সুইনবার্ন অলোকের জন্য আগে থেকেই বাসা বরাদ্দ করে রেখেছে। মেলবোর্নের কাছেই ইয়ারা নদীর পাড় ঘেঁষে আইভান হো শহরতলি, রোজানা মিউনিসিপালিটির চেরি স্ট্রিটে আপাতত অলোকেশের ডেরা। আইনের ব্যাপারে এরা খুব কড়া, তাই উর্বীর জন্য তাদের খরচে কোনো বাসা নেই। ভাগ্যিস, অলোকের বাড়িটার কাছেই চেরি স্ট্রিটে আরেকটা বাসা ভাড়া পাওয়া গেল। ডুপ্লেক্স বাড়ি। মালিকের নাম মিকেল ড্যারেন, তার পূর্বপুরুষের বাড়ি হংকংয়ে। কাজের সূত্রে অস্ট্রেলিয়া এসেছিলেন ড্যারেন, পরে জায়গাটা ভালো লেগে যাওয়ায় এখানেই বাড়ি করেছেন। ড্যারেন মোটামুটি সস্তায় তার বাড়িতে উর্বীর জন্য একটা রুম দিলেন। অলোকেশের বাড়ির খুব কাছে, দুই বাড়ির দুটো জানালা বলতে গেলে মুখোমুখি, হাতের ইশারায় ডাকা যায়।

উপস্থাপনের জন্য অলোকেশের পেপার প্রস্তুত হচ্ছে, এই কাজে সার্বক্ষণিক সঙ্গ দিচ্ছে উর্বী। তখন অনেক রাত। অলোক নিজের হাতে দু’ মগ কফি বানিয়ে বললেন, এই নাও কফি। ফাইন ভিক্টোরিয়ান ব্লেন্ড। তারপর? চার্লস শোবরাজের কেসটা পড়ো, দেখি কদ্দূর কী এগোলে! কেজো গলায় অলোকেশ বললেন।

কফির মগে ঠোঁট ছোঁয়ায় উর্বী। সময়টা জুনের মাঝামাঝি। বাংলাদেশে এখন কাঁঠালপাকা গরম হলেও এখানে বেশ ঠান্ডা। ভিন্ন গোলার্ধ, তাই বাংলাদেশের সাথে এখানকার ক্লাইমেট একদম মিলবে না। আমাদের গরমকাল মানে মেলবোর্নে কনকনে শীত।

আবার পড়তে শুরু করে উর্বী—

ছোটোখাটো চুরিচামারি দিয়ে মূলত চার্লস শোবরাজের অপরাধজগতে প্রবেশ। তার সৎ-বাবা শোবরাজকে মোটেই দেখতে পারত না, ফলে পালাতে হয় তাকে। কুড়ি বছর বয়সে সে ইন্দোচীন থেকে পালিয়ে প্যারিস চলে যায়। মজার ব্যাপার কী জানো অলোকেশ, এই চার্লস শোবরাজ কিন্তু দেখতে অসাধারণ, বেশ ম্যাচো টাইপ চেহারা, বুদ্ধিদীপ্ত, মায়াবী চোখ আর নিষ্পাপ চাহনি। চট করে কেউ তাকে খুনি বলে ভাবতেই পারতো না।

তা-ই নাকি!

ইয়েস, মাই বস। মজা করে বলল উর্বী। আর জানো তো, এটাই তার মস্ত সুবিধা। তার এই আপাত ইনোসেন্স চার্লস শোবরাজের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়ালো। প্রথম প্রথম কেউ তাকে সন্দেহই করতো না।

বুঝলাম। এবার তার কিলিং স্ট্র্যাটেজি নিয়ে কিছু বলো উর্বী। কীভাবে সে টার্গেট ফিক্স করতো, কাদেরকে সে বেশি বেশি মারতো, খুনের পরে সে কী করতো, লাশের পাশে বসে থাকতো, নাকি মেরেই পালাতো!

ওয়েট, বলছি। মাথা নাড়ে উর্বী। সে কফি খায়। বুঝলে অলোক, ওর নিকনেমের মধ্যেই কিন্তু টার্গেটের একটা ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কী নাম ছিল? বিকিনি কিলার। চার্লস শোবরাজ সারা জীবনে প্রায় দুই ডজন খুন করেছে। খুনের ধরনে বৈচিত্র্য ছিল, তবে টার্গেটে নয়। তার নব্বই ভাগ টার্গেট ছিল উঠতি বয়সী মেয়ে, যাদের বয়স কোনোভাবেই ত্রিশের বেশি নয়। কেউ কেউ মনে করেন যে, চার্লস শোবরাজ তার মায়ের ওপর প্রতিশোধ নিতে গিয়েই এসব করেছে। কারণ তার মা লোং ফুন যখন দ্বিতীয় বিয়ে করেন, তখন তার বয়স ছিল ঊনত্রিশ বছর চার মাস।

হুম! হতেই পারে। মাথা নাড়লেন ডিটেকটিভ অলোকেশ। কিন্তু তাই বলে সে বেছে বেছে শুধু মেয়েদের খুন করবে! মোটিভ কী? খুনের কায়দা-কৌশলই বা কেমন ছিল?

অদ্ভুত স্ট্র্যাটেজি বলতে পারো। অলোককে একটা প্রিন্টেড কপি থেকে পড়ে শোনাচ্ছে উর্বী। চার্লস শোবরাজ কিন্তু চট করে কাউকে মেরে দিতো না। শুরুতে সে তার সঙ্গে গভীর ভাব জমাতো, সদাচরণের মাধ্যমে ভিকটিমের বিশ্বাস অর্জন করতো, একসাথে নিয়ে খেতো, শুতো, চাই কি, বেড়াতেও নিয়ে যেতো। তারপর একসময় তাকে বেমক্কা মেরে দিতো চার্লস শোবরাজ। ফলে পুলিশের কাছে কমপ্লেন কম হতো। কেউ বিশ্বাসই করতে পারতো না যে, শোবরাজ তার এত কাছের মানুষটাকে এভাবে বিনা নোটিশে কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ মেরে দেবে।

বলো কী! এ তো পুরাই পাগল! বিস্ময় প্রকাশ করেন অলোকেশ।

পাগল নয় তো কী! পারফেক্ট সাইকোপ্যাথ এই চার্লস শোবরাজ। যে কিনা দৃশ্যমান কোনো কারণ ছাড়াই যখন তখন মানুষ খুন করে, অন্যকে কষ্ট দিয়ে আনন্দ পায়। স্যাডিস্ট বলতে পারো।

তারপর বলো, চার্লসের প্রথম শিকার কে?

বলছি, দাঁড়াও। উর্বী বলল। সে লেখা হাতড়াচ্ছে। এত এত পেইজ, কোথায় কোন তথ্য আছে কে জানে!

সত্যি দাঁড়াবো! বসে শুনলে হতো না! হা হা হা! অলোকেশ হাসতে থাকে।

এই তো পেয়েছি। শুরু করে উর্বী। শোবরাজ তখন কাবুলে। সেখানে তার আলাপ হয় এক ইন্ডিয়ান যুবকের সঙ্গে, নাম তার অজয় চৌধুরী। বলে রাখা ভালো, চার্লস শোবরাজ দেখতে কিন্তু অনেকটাই ভারতীয়দের মতো, কারণ তার বাপ সিন্ধি ছিলেন। সে চশমা পরতো, অবশ্য ওটা তার ছদ্মবেশও হতে পারে। তার হাইট কম, সম্ভবত তার মায়ের ধারা পেয়েছিল। ছোটখাটো দেখতে লোকটার প্রচণ্ড মনের জোর, সাইকোপ্যাথদের যেমন হয়।

হুঁ! তারপর বলো, এগিয়ে যাও উর্বী। খুব ইন্টেরেস্টিং মনে হচ্ছে আমার।

শোবরাজের প্রথম শিকার তার প্রেমিকার বড় বোন। যাকে সে খুন করেছে, তার ছোট বোনকে পরে সে বিয়েও করেছিল। ১৯৭৫ সাল, কাবুলের ঘটনা। মেয়েটির নাম ছিল তেরেসা নোলটন। মৃত্যুর আগে অন্তত দেড় মাস তারা একসঙ্গে কাটিয়েছে। শোবরাজ, অজয়, তেরেসা আর তার বোন অলিভিয়া। বিপদে পড়ে বোনদের সঙ্গে শোবরাজের আলাপ হয়। বেড়াতে এসে ওরা পাসপোর্ট হারিয়ে ফেলেছিল। মজার ব্যাপার এই, শোবরাজ আর অজয় মিলে কৌশলে ওদের পাসপোর্ট হাতিয়েছিল। যাতে মেয়ে দুটো ওদের কাছে সাহায্য চায়। এ যেন অনেকটা সেই যে, সাপ হয়ে ছোবল মারা, আবার ওঝা হয়ে বিষ ঝাড়ার মতো ব্যাপার! দুর্দান্ত চালাক ছিল এই চার্লস শোবরাজ।

কীভাবে সে তেরেসাকে মারলো? উসখুস করেন ডিটেকটিভ অলোকেশ।

ওই যে, পানিতে ডুবিয়ে। কাবুল শহরের প্রধান সড়কের পাশে ছিল এক লেক। সেখানেই তেরেসার লাশ পাওয়া যায়। পুলিশ ভাবলো, সাঁতার কাটতে গিয়ে ডুবে মরেছে মেয়েটা। কারণ তখন তার পরনে সুইমিংস্যুটের মতো সিল্কের তৈরি বিকিনি ছিল শুধু। সেই থেকে চার্লস শোবরাজের নাম হয় বিকিনি কিলার।

কী সাংঘাতিক! মন্তব্য করলেন ডিটেকটিভ অলোকেশ। মৃত্যু নিয়ে রীতিমতো মশকরা করেছে চার্লস শোবরাজ। নইলে কেউ কাউকে অমন খেলিয়ে তেলিয়ে তারপর মারে! আগে প্ল্যানমাফিক কারো উপকার করে বিশ্বস্ত হওয়া, তারপর তার সঙ্গে অনেকটা সময় কাটানো, ভিকটিমের বোনকে বিয়ে করা, অবশেষে যুক্তি করে তাকে মেরে দেওয়া। এসব বুঝি কেবল একজন সিরিয়াল কিলারের পক্ষেই সম্ভব, কী বলো উর্বী।

উর্বী কিছু বলে না, তখনও সে বিকিনি-কিলার শোবরাজের গল্পে ডুবে আছে। একসঙ্গে সে অনেকগুলো পাসপোর্ট ব্যবহার করতো। অপরাধ করেই সে চট করে পালাতো না, বরং পুলিশের নাকের ডগা দিয়ে কিছুদিন ঘুরঘুর করতো শোবরাজ। লোকটা এমনই ঘাগু যে, পুলিশের তাকে সন্দেহ করতেও অনেকটা সময় লেগে যেতো। কোনো কোনো কেসে পুলিশের সঙ্গে একাট্টা হয়ে কেসের তদন্তও করেছে সে। পুলিশকে সে নানারকম ক্লু দিয়ে হেল্প করেছে, যা কিনা তার নিজেরই বিরুদ্ধে যায়। কী আজব, তা-ই না!

চলবে . . .

সাইকোপ্যাথ (পর্ব ২)

সাইকোপ্যাথ (পর্ব ৩)

ইত্তেফাক/আরএ

ঘটনা পরিক্রমা : ধারাবাহিক উপন্যাস,ধারাবাহিক থ্রিলার

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত