পাঁচ.
ইউরেকা টাওয়ার। সাউথ ব্যাংক, মেলবোর্ন।
তিনশ মিটার উচ্চতার এই আবাসিক টাওয়ারে কিছু খাবারের দোকানও আছে। সেখানেই রিপোর্টার রিনি সেনের সঙ্গে অলোকের দেখা হয়। সঙ্গে উর্বীও ছিল। তাকে টুকটুক করে নোট নিতে হবে।
মজার ব্যাপার এই, ইউরেকা টাওয়ারের নিচের দিকে মৌমাছির চাকের মতো একটা স্থাপনা রয়েছে, চট করে দেখলে বি-হাইভ বলে ভ্রম হয়। বায়ান্ন হাজার এসকিউ জানালা আছে এই টাওয়ারে। আবাসিক অ্যাপার্টমেন্টের সংখ্যা ৫৬০টি।
তেত্রিশ তলার ওপরে সোনসা বার্গার অ্যান্ড ক্যাফে’তে এক কোণে বসে কথা হচ্ছিল। মিস রিনি সেন বেশ নামি জার্নালিস্ট এখানে। বয়স আর কত! খুব জোর বত্রিশ। উর্বীর চেয়ে হয়তো একটু বেশি। খুব স্মার্ট দেখতে রিনির পরনে জিন্স-টপস। ছাইরঙা জিন্সের ওপর দুধসাদা টপসে বেশ মানিয়েছে তাকে।
তারপর বলুন মিস্টার রয়, কেমন যাচ্ছে সব?
আই’ম ফাইন, মিস রিনি। সেদিন প্রফেসর কিমের চেম্বারে বসে আপনার রিপোর্ট দেখলাম ওই নাককাটা কেসটা নিয়ে।
গুড। প্রফেসর আমাকে আপনার কথা বলেছেন। আপনি একজন তুখোড় প্রাইভেট গোয়েন্দা, বাংলাদেশে আপনার বেশ নামডাক আছে। আপনি নাকি চোখ দিয়ে নয়, মেধা দিয়ে দেখেন, এইসব আর কি!
হা হা হা! একটু বাড়িয়ে বলেছেন প্রফেসর। আই নো দ্যাট হি লাইক্স মি। হাসলেন অলোকেশ। বাই দ্য ওয়ে, এই আমার সহযোগী ও বন্ধু মিস উর্বী। পেশায় আর্কিটেক্ট, কিন্তু গোয়েন্দাগিরি তার নেশা। রহস্যের গন্ধ পেলে তাকে আর আটকে রাখা যায় না। ইনি জাস্ট ছুটে বেরিয়ে যান।
নাইস মিটিং ইউ, উর্বী। রিনি অমনি উর্বীকে বুকে টেনে নেয়। বাঙালি বলেই হয়তো। তারপর রিনি বলল, আই’ম ফ্রম কোলকাতা। সেই ছোট্টকাল থেকে মেলবোর্নে আছি। বাবা-মাও এখানে ছিলেন, বছর চারেক হয় দেশে ফিরে গেছেন। বাকি জীবনটা তারা সেখানেই কাটাতে চান। মৃদু হাসল রিনি সেন। তারপর দম নিয়ে আবার বলল , বাট আই প্রেফার লিভিং ইন মেলবোর্ন। বলতে পারেন, এখানে কাজ করে সুখ আছে। একদম নোংরামি নেই, মানুষ মানুষকে সম্মান করে, ভালোও বাসে। মিনিংফুল লাইফ লিড করা যায়।
সত্যি বাসে! মাঝখান থেকে ফুট কাটলেন অলোকেশ। যা যান্ত্রিক জীবন!
বাসে তো! হেসে বলল রিনি। কেউ অন্তত কারো পেছনে কাঠি করে না মিস্টার অলোকেশ।
ওকে, বুঝলাম। কিন্তু মিস রিনি, এই কেসটা কী, একটু বলবেন? আই মিন নাককাটা। ইন্সপেক্টর গ্রোভার হুক আবার আমাকে সন্দেহ করেননি তো! কারণ নাককাটা লোকটা আমার ঘরের দরজায় গিয়ে হত্যে দিয়ে পড়েছিল।
নো নো, তা কেন হবে। তবে কী জানেন, এমন ঘটনা কিন্তু এখানে এই প্রথম নয়! আগেও ঘটেছে। রিনি সেন বলল।
ওর কথা শুনে উর্বী ও অলোকেশ দুজনেই বিস্মিত হয়। সে কি, কেন?
মাস দুয়েক আগে আরেকজনের লাশ উদ্ধার হয়েছিল। তার নাকটাও গোড়া থেকে কাটা। তিনি ছিলেন একজন মহিলা। মধ্যবয়সী। তার পরিচয় অবশ্য মেলবোর্ন পুলিশ পায়নি। পত্রপত্রিকায় তার ছবি ছাপা হয়, ট্রেন স্টেশনে পোস্টার পড়ে, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত কেউ তাকে শনাক্ত করেনি। পরে বেওয়ারিশ হিসেবে মহিলার লাশ দাফন করা হয়।
রিনির কথা শুনে অলোকেশ চুপ। উর্বী কাগজের গায়ে আঁকিবুঁকি কাটছে। অর্থাৎ তার মাথায়ও কিছু ঢুকছে না। রিনি উঠে কাউন্টারে গেল। এখানে সেল্ফ-সার্ভিসিং সিস্টেম। আগেভাগে দাম চুকিয়ে নিজের খাবার নিজেই নিয়ে নাও। ‘পে ফার্স্ট। রেলিশ ইওর ফুড’। সাইনবোর্ডে লেখা আছে।
খাবারের ট্রে হাতে রিনি এগিয়ে এল। উর্বী উঠে গিয়ে তাকে হেল্প করতে চাইল। এও বলল যে নেক্সট টাইম কিন্তু আমি বিল পে করব, রিনি।
সে হবে ক্ষণ। মিষ্টি হাসল রিনি।
দুটো কেস-একটা খুন, আরেকটা ভিকটিমের স্মৃতিবিভ্রম। দুজনেরই নাক কাটা গেছে। কে বলতে পারে, আরো হয়তো কেউ সেই নিষ্ঠুর খুনে লোকটার শিকার হয়েছিল, কিন্তু পুলিশ তার হদিস পায়নি!
রিনি অবশ্য এক্ষেত্রে ডিসেন্ট দিল। সে মাথা নেড়ে বলল, উঁহু, তেমনটি হবার চান্স নেই। কেননা, মেলবোর্ন পুলিশ বেশ দক্ষ ও দায়িত্বশীল। এই শহরে লাশ গুমের খবর আমার অন্তত জানা নেই। অবশ্য খুনি কাউকে মেরে যদি ইয়ারা নদীতে ঠেলে ফেলে দেয় আর মাছে তা খেয়ে নেয়, তাহলে সত্যি কিছু বলার নেই।
উর্বী বলল, কাউকে মারতে চাইলে তার নাক কাটতে হবে কেন! গুলি করেও মারতে পারতো, তা-ই না!
ইয়েস উর্বী, আই ডু অ্যাগ্রি উইথ ইউ। আমার মনে হয় এটা কোনো সিরিয়াল কিলারের কাজ। কিন্তু এখনো এমন কারো খোঁজ মেলবোর্ন পুলিশ পায়নি। লোকটা বেশ চালাক, বোঝা যায়।
বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। হঠাৎ বৃষ্টি যাকে বলে। বিড়াল-কুকুর বৃষ্টি নয়, ছোটোদানার ঝিরঝিরে বর্ষণ। তেত্রিশ তলার ওপরে কাচের শার্সিতে পিছলে যাচ্ছে বৃষ্টির ফোঁটা।
ইস, কী রোম্যান্টিক! অলোকের দিকে তাকিয়ে উর্বী বলল। খটোমটো ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েও মেয়েটার রোম্যান্টিকতা মোটেও হ্রাস পায়নি। শি’জ সো নাইস! মনে মনে উর্বীর প্রশংসা করেন অলোকেশ।
হেলিবাট মাছের কাটলেটে কামড় বসিয়ে রিনি বলল, সিরিয়াল কিলাররা এমনই হয় উর্বী। তারা তো আসলে স্বাভাবিক মানুষ নয়। ওরা একরকম ডার্ক পারসোনালিটির অধিকারী।
ডার্ক পারসোনালিটি! সেটা আবার কী? উর্বী উৎসুক চোখে রিনির দিকে তাকায়। মেয়েটা সুন্দরী, উর্বীর চেয়েও। হঠাৎ একটা কথা মনে হয় তার। রিনি কি বিয়ে করেছে, বা কোনো বয়ফ্রেন্ড! যেন সুশ্রী সুন্দরী মেয়ে হলেই তার বিএফ থাকতে হবে! এমন কেজো কেঠো শহরে প্রেম করবার সময় কই?
অলোকেশ মনোযোগ দিয়ে রিনিকে শুনছেন। রিনি এই শহরে দীর্ঘদিন আছে। তাই নাককাটা কেসের কিনারা করতে হলে রিনির হেল্প তার লাগবেই।
বলুন মিস রিনি, এই ডার্ক পারসোনালিটিসম্পন্ন লোকেরা আসলে কেমন!
বলতে পারেন এরা আদতে ঊনমানব। পুরোপুরি মানুষ নয় এরা। ক্যানিবাল বা নরখাদকের মতো বিহেভ করে, এদের মনে মায়াদয়া, সহানুভূতি বলে কিছু থাকে না, প্রচণ্ড নিষ্ঠুর হয়, একগুঁয়ে, নার্সিসিস্ট, আত্মকেন্দ্রিক, স্বাভাবিক সামাজিক বোধ এদের নেই।
হুঁ! তা-ই হবে। নইলে একটা লোককে মারবার আগে তার নাক কেটে নেওয়া বা শরীরে প্রোজ্যাক পুশ করবে কেন! খুনের তো আরো অনেক উপায় আছে, তা-ই না রিনি? অলোকেশ বললেন।
একদম ঠিক বলেছেন। কিন্তু মুশকিল কী জানেন অলোকেশ, এই শহরে চট করে কাউকে ইন্টারসেপ্ট বা জেরা করা যায় না, তাতে নাকি মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়। অথচ কিলারটা একের পর এক মানুষকে কষ্ট দিয়ে মারে, নাক কাটে, কান কাটে বা হাই ডোজেস মরফিন পুশ করে, তাতে কিছু দোষ নেই। খেদের স্বরে রিনি বলল।
রাইট রিনি। সবসময় অত নীতিকথা কপচালে চলে না। মানুষ কি আর ছাগল নাকি যে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখলে সেখানেই বেশ বসে থাকবে! উর্বী বলল। রিনি মেয়েটাকে তার দারুণ লাগছে। যেমন দেখতে, তেমনি ওপেন মাইন্ডেড। ওর কাছ থেকে একটা নতুন শব্দ শিখলো উর্বী। ডার্ক পারসোনালিটি। এরা দেখতে শান্তশিষ্ট মনে হলেও ভেতরে ভেতরে দুরভিসন্ধির চাষ করে। যাকে বলে নিমচা শয়তান।
বৃষ্টি থেমে গেছে। রিনিকে এবার অফিসে ফিরতে হবে। মেলবোর্নের ‘সেন্ট্রাল বিজনেস ডিস্ট্রিক্ট’ সিবিডিতে রয়েছে ফেডারেশন স্কয়ার। শহরের যত রকম আর্ট, কালচার ও পাবলিক ইভেন্টস-সব এখানেই হয়ে থাকে। ফেডারেশন স্কয়ারের কাছেই ইয়ারা ভবনে রিনির পত্রিকা অফিস। ‘দ্য এইজ’ মেলবোর্নের মোটামুটি সকলেই পড়ে। ভুলভাল নিউজ এরা ছাপে না, ঘটনা মানেই সংবাদ নয়, এই নিয়ম মেনে খবর পরিবেশন করে দ্য এজ। ইয়েলো জার্নালিজম রিনির পত্রিকায় একেবারেই নিষিদ্ধ।
চলুন, এবার যাই তাহলে? রিনি সেন বলল।
মাথা নাড়লেন অলোকেশ। উঠে পড়লেন তিনি। সাথে উর্বীও।
আর শুনুন, আপনি আমার চেয়ে বয়সে বড়ো। অভিজ্ঞতাও বেশি। দয়া করে আর আমাকে আপনি আপনি করবেন না। তুমি করে বললেই আমি বেশি খুশি হবো। রিনি অমায়িক হেসে বলল।
ওকে, থ্যাঙ্কস রিনি। সেম টু ইউ। আশা করি খুব শিগগিরই আবার আমাদের দেখা হবে। আমি এই কেসটা নিয়ে ভাবছি। আপনার, স্যরি, তোমার হেল্প আমার দরকার পড়বে।
রিনিকে গুড বাই জানিয়ে ওরা রাস্তায় নেমে এল। ইউরেকা সেন্টারের ঝলকানি ওদের চোখ ধাঁধায়। উর্বী ওপরে তাকিয়ে দেখে আকাশে থোকা থোকা তুলোমেঘ খেলা করে। লন্ডনের মতো মেলবোর্নের ওয়েদারও খুব খেয়ালি। কখন মিষ্টি রোদ খেলা করে আর কখন বৃষ্টি নামে, বোঝা ভার।
এখনই বাসায় ফিরবে, নাকি একটু হ্যাঙ-আউট মানে শহরটা ঘুরেফিরে দেখবে? বললেন অলোকেশ। এখনই তার ডেরায় ফেরার ইচ্ছে নেই। নাককাটার কেসটা নিয়ে অলোক খুব চিন্তিত। এমন অদ্ভুত টাইপ খুনির কথা তিনি আর শোনেননি।
উর্বী উড়তেই পছন্দ করে। ঘরের ভেতরে সেঁধিয়ে থেকে লাভ কী! বলল, অ্যাজ ইউ উইশ, মাই লর্ড।
চলো, আমরা বরং একবার প্রফেসর কিমের চেম্বারে গিয়ে হানা দিই। ভদ্রলোক চমকে যাবেন। সত্যি বলতে, লোকটাকে আমার দারুণ লাগে। অনেকটা সেই ‘ঠাকুরমার ঝুলি’র দাদাঠাকুরের মতোন।
তা যা বলেছ! প্রফেসর কিম সত্যিই জেন্টেলম্যান। তোমাকে বেশ পছন্দও করে। উর্বী বলল।
ওরা ফ্লিন্ডার্স স্টেশন থেকে ট্রেনে চড়ল। মাত্র পাঁচটা স্টেশন পরেই সুইনবার্ন ইউনিভার্সিটি। প্রফেসর কিম তার রুমেই ছিলেন।
আরে, এসো এসো অলোকেশ। হোয়াট অ্যা প্লেজেন্ট সারপ্রাইজ! হা হা করে উঠলেন কিম। সঙ্গে দেখছি ‘হুরবি’ও আছে।
উর্বী উচ্চারণ করতে পারেন না প্রফেসর কিম। তার ভাষায় হুরবি। মজা না! দেশে দেশে মানুষে মানুষে কত তফাৎ! উচ্চারণেও।
কী খাবে বলো? কফি নাকি স্মুদি? পমেগ্রেনেট উইথ ইওগার্ট।
উর্বী অলোককে দেখল। ওর স্মুদি পছন্দ। আর অলোকের কফি চাই।
ওক্কে, নো প্রবলেম। দুটোই পাবে। মাথা ঝাঁকিয়ে হাসছেন প্রফেসর কিম। একেবারে নিটোল নিষ্পাপ হাসি। তার পরনে গ্রে-কালার স্যুট এবং লাইট ব্লু শার্ট। চোখে রিমলেস চশমা। চাহনিতে প্রজ্ঞা আর সততা যেন চুইয়ে নামছে।
তারপর বলো, কেমন আছো হে ডিটেকটিভ? হোপ, এভরিথিং গোজ ফাইন!
ইয়েস প্রফেসর। নাককাটা লোকটার ব্যাপারে কিছু জানা গেল?
ইয়েস মিস্টার রয়। তোমার জন্য ‘গরম খবর’ আছে, আই মিন ভেরি আরজেন্ট নিউজ। তুমি না এলে আমিই তোমাকে ফোন করতাম। শোনো, নাককাটার পরিচয় পাওয়া গেছে। সে এই শহরেই থাকে। তবে রোজানা বা আইভান হো মিউনিসিপালিটি নয়, বরং তার উল্টোদিকে আলিমা অ্যাভিনিউতে। পাশেই প্লেন্টি রিভার।
তা-ই নাকি! দ্যাটস গ্রেট প্রফেসর। লোকটার নাম কি জানা গেল? জানতে চান অলোকেশ। কৌতূহলে তার চোখদুটো জ্বলজ্বল করছে।
এই নাও, দ্যাখো। ইন্সপেক্টর গ্রোভার হুক পাঠিয়েছেন। একটা লোকাল পত্রিকার কাটিং।
প্রফেসর কিম কফি বানাতে উঠে গেলেন। অলোক মনোযোগ দিয়ে নিউজ পড়ছেন। পিটার নামে এক লোক নাককাটাকে আইডেন্টিফাই করেছে। তারা নাকি প্রতিবেশী। আলিমা রোডে পাশাপাশি বাড়িতে থাকে।
কী বলেছে পিটার? কে এই নাককাটা? উর্বীও খবরের ওপরে হামলে পড়ল। মসলাদার খবর কিনা!
এই দ্যাখো কী লিখেছে, নাককাটার নাম আসলে টনি। হি ইজ ফ্রম হংকং। তার নাকি কাঁচা মাছের কারবার। নদীতে মাছ ধরার ট্রলার আছে তার। আরো আছে ফিশিং নেট, হুক ইত্যাদি।
তার মানে পুরোদস্তুর জেলে। উর্বী বলল। একজন মেছুয়ার সঙ্গে আততায়ীর কি শত্রুতা থাকতে পারে! বা থাকলেও এতকিছু থাকতে সে ওর নাক কেটে নিল! মানে হয়!
টনির সম্পর্কে রিপোর্টে আর তেমন কিছু নেই। খানিক বাদে কফি আর স্মুদি নিয়ে এলেন প্রফেসর কিম। হেসে বললেন, কী বুঝলে অলোকেশ? কেসটা আসলে কী?
জানি না প্রফেসর। নাককাটার নাম টনি, সে আলিমা রোডে পিটারের প্রতিবেশী। কাঁচা মাছের কারবার তার। টনির পরিবারে আর কে কে আছে, তা অবশ্য জানা যায়নি।
হুম। কিম বললেন, দ্যাখো ডিটেকটিভ, আমি যদ্দুর বুঝি, একজন সাইকোপ্যাথ কখনো হিসাব-নিকাশ করে খুন করবে না। সে ঝোঁকের বশে বা তার অসুস্থ লালসা মেটানোর জন্য এসব করে থাকে। সো ‘লজিক্যাল অ্যানালজি’ এখানে আশা করা যায় না।
লালসা! কীসের লালসা প্রফেসর! টনি তো মেয়েলোক নয়? আশ্চর্য হন অলোকেশ।
অমনি খলখল করে হাসতে থাকেন ক্রিমিনাল সাইকোলজির বর্ষীয়ান প্রফেসর রিচার্ড কিম। বললেন, তুমি তো ভারি জেন্ডার-বায়াসড ভায়া! এটা কিন্তু ঠিক নয়।
মানে! আপনি কী বলছেন প্রফেসর? আমি মোটেও এমন নই।
ইয়েস, ইউ আর। নইলে তুমি কী করে ভাবলে যে নাককাটার আক্রমণকারী পুরুষই হবে! সে তো নারীও হতে পারে।
নিজের ভুল বুঝতে পারেন অলোকেশ। তা-ই তো! কেন তিনি ধরে নিচ্ছেন যে আততায়ী মেয়েমানুষ! অলোকেশ বললেন, স্যরি প্রফেসর, আমি যেখানকার মানুষ সেখানে অপরাধমূলক কাজ মানেই ছেলেদের ধরা হয়। মেয়েরাও যে এ-কাজে কিছু পিছিয়ে নেই, সত্যি ভুলে গেছিলাম। কিন্তু তাই বলে মানুষ মেরে লালসা চরিতার্থ করা! হয় নাকি?
আবারও হাসি। বস্তুত, প্রফেসর কিম হাসতে ভালোবাসেন। বললেন, তুমি এই দুনিয়ার ক’জন সিরিয়াল কিলারকে জানো? টেড বান্ডির নাম শুনেছো? সে ছিল একজন জঘন্য সিরিয়াল কিলার। আমেরিকান এই কিলার সুযোগ পেলেই মেয়েদের তুলে আনতো। কিন্তু আশ্চর্যজনক ব্যাপার কী জানো, টেড বান্ডি কিন্তু কাউকে রেপ করতো না। শুধু ধারালো ছুরি দিয়ে তাদের স্তন কেটে নিয়েই লালসা চরিতার্থ করতো টেড।
কথা শুনে উর্বী ভয়ে শিউরে ওঠে। কী নিষ্ঠুর! কী মর্মান্তিক! উন্মাদ নাকি!
টেড বান্ডি অন্তত ত্রিশ জন মেয়েকে কিডন্যাপ করেছে। তাদের মধ্যে একটা বিষয়ে খুব মিল ছিল, এদের কেউ শ্বেতাঙ্গ নয়, এবং সবার স্তন বেশ ভারী।
তার মানে বর্ণবাদী কিলার! মুখ ফসকে বলে ফেলল উর্বী। পরে বুঝলো, ওর কথা শুনে প্রফেসর কিম কষ্ট পেতে পারেন। কারণ তিনি নিজেও শ্বেতাঙ্গ। তার পূর্বপুরুষ আইরিশ। ডাবলিন থেকে সাগর পাড়ি দিয়ে অস্ট্রেলিয়া এসেছেন।
ঝটপট উর্বী গুগলে সার্চ দেয়। এই তো টেড বান্ডি! ১৯৭০ সালে তার প্রথম অপরাধ ধরা পড়ে। ১৯৮৯ সালে তার ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়। এর মধ্যেই ত্রিশটি মেয়ে বান্ডির হাতে খুন হয়। প্রকৃত সংখ্যা হয়তো আরো অনেক বেশি। সুভেনির হিসেবে এই দুর্ধর্ষ সিরিয়াল কিলার ভিকটিমের মাথার খুলি সংগ্রহ করে রাখত। প্রথমে স্তন ছেদ, তারপর মু্ণ্ডু কেটে তার খুলি সংগ্রহ করা। কী বীভৎস ব্যাপার, ভাবা যায়!
চলবে . . .
ইত্তেফাক/আরএ