কথায় বলে, সব ভালো যার শেষ ভালো। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও) সেই ‘শেষ ভালোর’ পথে অগ্রসর হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাঁত কিড়মিড় করে ডাব্লিউএইচও-কে ‘হাত খরচার’ পয়সা আর দেবে না বলে শাসিয়েছিলেন, আর তা শুনে প্রেসিডেন্ট শি জিংপিং ডাব্লিউএইচও-কে আশ্বাস দিয়েছিল যে দুই বছরে বছরপ্রতি ১ বিলিয়ন ডলার দিয়ে ক্ষতির ধাক্কা পুষিয়ে দেবেন। সম্প্রতি ডাব্লিউএইচও-কে ট্রাম্প চূড়ান্তভাবে বলে দিয়েছেন যে চাঁদার টাকা বাবদ ৪০০ মিলিয়ন ডলার বাস্তবিকই পাঠানো হয়নি, হবেও না। এসব দেখেশুনে জার্মানি ও ফ্রান্স বলে যে, তারাসহ ইইউ-ও আর্থিক ভারের দায়িত্ব বহন করবে। ৫২৭ মিলিয়ন ডলার ডাব্লিউএইচও-কে পাঠিয়ে দিচ্ছে। অবশ্য ডাব্লিউএইচও-এর বাজেটের ৫০ শতাংশের অংশীদার ‘বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা ফাউন্ডেশন’ ও সব বিগফার্মা। যুক্তরাষ্ট্রের ৪০০ মিলিয়নের ঘাটতি ‘ডাব্লিউএইচও’ অনুভব করবে না।
আপাতত আমরা বলতে পারি যে, ‘ডাব্লিউএইচও’ তার ১ নম্বর বেড়া ডিঙাল। লকডাউনের মৌসুমে, ‘ডাব্লিউএইচও’ ১৯৪টি সদস্য দেশকে নিয়ে ভিডিও সম্মেলন করে (১৮-১৯ মে, ২০২০)। এই সম্মেলনে কোস্টারিকার প্রস্তাব ছিল যে কোভিড-১৯ সংশ্লিষ্ট সব রকমের ওষুধপাতি ও ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে ‘প্যাটেন্ট পুল’-এর ব্যবস্থা থাকতে হবে (অর্থাৎ কম করে দুই কোম্পানি প্যাটেন্টধারী হলে, যে কোনো একটির কাছ থেকে প্যাটেন্টের লাইসেন্স নিয়ে ওষুধপাতি বানানো যাবে)।
প্রেসিডেন্ট শি জিংপিন বলেন যে, কোভিড-১৯ চিকিৎসার ওষুধপাতি ও ভ্যাকসিন হবে জনগণের সম্পদ এবং তাবৎ ইইউ-ও মাথা নেড়ে শি-র প্রস্তাবে সম্মতি দেয়। অর্থাৎ ওষুধপাতি ও ভ্যাকসিনে একচেটিয়া এক্সক্লুসিভ প্যাটেন্ট বলে কিছুই থাকবে না। যেমন :বাংলাদেশের কলেরা চিকিত্সায় ব্যবহূত রিহাইড্রেশন থেরাপি, শাড়ি ফিলট্রেশন, ডা. জোনাস সল্কের পোলিও ভ্যাকসিনের মতো পাবলিকের সম্পদ হবে।
‘ডাব্লিউএইচও’-এর প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বে (বর্তমানে) ১০টি ভ্যাকসিনের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে। (চীনের পাঁচটি, যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি এবং যুক্তরাজ্য ও জার্মানির একটি করে)। উপরিউক্ত দুই প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য বাদে সবাই রাজি। দুই অরাজি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় জনের অবস্থা বোঝা কঠিন নয়। ‘প্রফেসর লকডাউন’ ফার্গুসনের কল্যাণে পাবলিকের কাছে সরকারের আস্থা হারানোর ক্ষতি বাদ দিলেও আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির গর্ত ঢাকা কি সহজ কথা! লাগসই ওষুধ/ভ্যাকসিন জনমনে ও অর্থনীতিতে যত্সামান্য হলেও সুস্থিত অবস্থা আনবে নিশ্চয়? তাছাড়া বিনা পয়সায় দেবে কেন? সবকিছুতে চ্যারিটি কি হয়! প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিষয়টি যৎসামান্য জটিল, তিনি ‘প্যাটেন্ট পুলিং’-এর সমর্থন করেন কী করে? তার মতে, সবাই এবং চীন তো বটেই, যুক্তরাষ্ট্রের ‘বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের অধিকার’ তথা ‘ইনটেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইট’ যে হারে চুরিচামারি করছে, এখন তারা ‘প্যাটেন্ট পুলিং’-এর নামে প্রকাশ্যে লুটপাটকে বৈধ করতে চায়! কারণ, ওষুধ/ভ্যাকসিনের ওপরে ‘একচেটিয়া প্যাটেন্ট অধিকার’ ‘বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের অধিকারের’ মধ্যে পড়ে, একে অস্বীকার বা পরিত্যাগ করা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব নয়। কাজেই ১৯২টি সদস্য দেশের পদাঙ্ক অনুসরণ করে ‘ডাব্লিউএইচও’কে যুক্তরাষ্ট্র মদত দেয় কী করে? অবশ্য কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থাকে চাঁদা প্রদান বন্ধ করার অতীত দৃষ্টান্ত যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে, যেমন :জাতিসংঘের ‘ইউনেস্কো’।
অর্থাৎ বাস্তবে দাঁড়াচ্ছে যে কোভিড-১৯ সংশ্লিষ্ট ওষুধপাতি/ভ্যাকসিনের প্যাটেন্ট যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের যে বিগফার্মার অধিকারে থাকবে তাকে গুনে গুনে দাম দিতে হবে, অন্যভাবে ‘ফেলো কড়ি মাখো তেল’-নীতি অনুসৃত হবে। এমনকি যেসব ওষুধের আবির্ভাব ও বাজারজাতকরণে সরকারি অনুদান রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রেও ‘ফেলো কড়ি মাখো তেল’ ছাড়া কথা নেই। যেমন : যুক্তরাষ্ট্রে ‘এইডস’ রোগের চিকিত্সায় ‘এজেডটি’ (AZT) নামক ওষুধের অথবা ক্যানসার চিকিৎসায় ‘কিমরিয়াহ্’ (Kymriah) নামক ওষুধের দাম হলো ৪৭৫ হাজার ডলার, অথবা হেপাটাইসিস সি (লিভার ইনফেকশনের অসুখ)-এর চিকিৎসায় ‘সোফসবুভির’ (Sofosbuvir) বড়ির একেকটির মূল্যই হলো ১ হাজার ডলার। এই দামের ওষুধপাতি, সরকারি অনুদান থাকলেও, আসলে আলট্রা সম্পদশালী রোগীদের জন্য তৈরি হচ্ছে। কিন্তু রোগবালাই তো ‘বড়লোক ছোটলোক’-এর বাছবিচার করে না! তাই অবিত্তবান পাবলিকের চিকিৎসা ব্যবস্থার কথা চিন্তা করে পৃথিবীর অধিকাংশ দেশের আইনে ‘আবশ্যিক অনুমতিপত্র বা ‘সিএল’ (কমপালসারি লাইসেন্সিং) সংশ্লিষ্ট অনুবিধি রয়েছে। এই ‘সিএল’ ব্যবস্থাটি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ‘দোহা ডিক্লেয়ারেশন’-এর (২০০১) অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ‘সিএল’-এর সারবস্তু হলো যে মহামারি লেগে গেলে বা ওষুধপাতির আকাশছোঁয়া মূল্যের জন্য চিকিৎসাব্যবস্থার শরণাপন্ন হওয়া অসম্ভব হলে, অন্যভাবে স্বাস্থ্য-জরুরি অবস্থার সৃষ্টি হলে দেশ প্যাটেন্টধারীর অনুমতি ছাড়াই যে কোনো কোম্পানিকে প্যাটেন্টকৃত ওষুধ বানানোর অনুমতি দিতে পারে বা এমনকি অন্য দেশ থেকে আমদানিও করতে পারে।
ভাবছেন যে, বাহ্ ‘সিএল’ নামক সুন্দর ব্যবস্থা তো রয়েছেই! ভাবনা কী! তবে একটি কাহিনি বলি : বিগফার্মা ‘বেয়ার’ (Bayer) প্রাগ্রসর পর্যায়ের কিডনি-ক্যানসারের ওষুধ ‘ন্যাক্সাভার’ তৈরি করে। এক বছরের চিকিৎসা বাবদ ওষুধের মূল্য হলো কম করে মাত্র ৬৫ হাজার ডলার। ২০১২ সালে ভারত হায়দরাবাদভিত্তিক ওষুধ কোম্পানি ‘নাটকো’কে সুলভ মূল্যে ন্যাক্সাভার তৈরির জন্য ‘সিএল’ মঞ্জুর করে। ফলস্বরূপ ‘বেয়ারের’ খুব রাগ হয়েছিল, কোর্ট-কাছারির ঝামেলা করেছিল। কারণ, বেয়ার বলে যে ‘এই ওষুধ আমরা তৈরি করেছি পশ্চিমের বিত্তবানদের জন্য’ এবং সর্বত্র এটিকে স্রেফ ‘চৌর্যবৃত্তি’ বলে গালাগালি পর্যন্ত করতে ছাড়েনি। যাহোক, নাটকোর তৈরিকৃত ওষুধের মাসিক মূল্য ৮ হাজার ৮৮০ রুপি এবং নেট বিক্রয় থেকে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে বেয়ার-কে ৬ শতাংশ রয়্যালটি দিচ্ছে। নাটকোর কিন্তু ‘লস’ হচ্ছে না। এটি ছিল ভারতের প্রথম ‘সিএল’। সে সময়ে আরো কয়েকটি মহার্ঘ ওষুধের ‘সিএল’ মঞ্জুরের পরিকল্পনা ছিল বটে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের শাসানির পরে সেটি বাতিল হয়ে যায়। অর্থাত্ ‘সিএল’ মেথডের সাহায্যে মহামারি, অবিত্তবানের প্রাণ বাঁচানোর পন্থা মোটেই বুদ্ধিমানের পন্থা নয়। শুধু ‘সিএল’ তো নয় ‘রিভার্স/ব্যাক ইঞ্জিনিয়ারিং’ করে ওষুধপাতির ‘অনুলিপি/নকলকরণের’ প্রতিও বিগফার্মারা অত্যন্ত অ্যালার্জিগ্রস্ত। তা সত্ত্বেও মুম্বাইভিত্তিক ‘কেমিক্যাল, ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ল্যাব’ রিভার্স-ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে এইডস চিকিৎসায় ব্যবহূত তিনটি ওষুধের মিশ্রণ ঘটিয়ে মাত্র একটি ‘অ্যান্টি রিট্রোভাইরাল’ (ARV) ওষুধ তৈরি করে। ফলস্বরূপ, ওষুধ বাবদ বার্ষিক খরচের পরিমাণ (প্যাটেন্টকৃত পশ্চিমের ওষুধ) ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার কমে হয়েছে ৩৫০ ডলার, অর্থাৎ দিনপ্রতি ওষুধ বাবদ খরচা হচ্ছে ১ ডলারেরও কম।
মার্কিন খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন এবং ‘ডাব্লিউএইচও’-এর অনুমোদনপ্রাপ্ত ওষুধটি বিশ্বের ১৭০টি দেশে ব্যবহার হচ্ছে। ‘সিএল’-অ্যালার্জি হ্রাসের বিকল্প হিসেবে বিসাসের সম্মেলনে ‘প্যাটেন্ট পুলিং’-এর সুপারিশ আনা হয়, (কেবল কোভিড-১৯-এর ক্ষেত্রে)। কিন্তু সম্মেলনের চূড়ান্ত ঘোষণায় যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে বিযুক্ত রাখে। ‘প্যাটেন্ট পুলিং’ ব্যবস্থায় বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ‘ট্রিপস’ (ট্রেড রিলেইটেড অ্যাসপেক্ট অব ইনটেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস)-এর মীমাংসা হতে হবে। চীন ও ইইউ ‘ডাব্লিউএইচও’-এর চূড়ান্ত ঘোষণায় সম্মতি দেয় যে কোভিড-১৯ সংশ্লিষ্ট সব ওষুধপাতি ও ভ্যাকসিন হবে ‘পাবলিকের সম্পদ’। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য মেনে নেয়নি। দুটি দেশ সম্মত না হলেও চিকিৎসাব্যবস্থা থেমে থাকবে না নিশ্চয়, থাকছেও না। যেসব দেশ ‘পাবলিকের সম্পদ হবে’র পক্ষে তাদের অনেকেই সফল কার্যকর ওষুধ/ভ্যাকসিন তৈরি করতে পারবেন। যেহেতু বাংলাদেশের ওষুধ তৈরির সামর্থ্য ও ধারণক্ষমতা রয়েছে, যেমন : করোনা আক্রান্তের চিকিত্সার জন্য বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ঔষধাগার ও ঔষধ প্রশাসন হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের জন্য দেশজ কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল, নিশ্চিত যে স্থানীয় কোম্পানি সদ্যলব্ধ কোভিডের ওষুধপাতি/ভ্যাকসিন তৈরিতে সক্ষম হবে। সীমিত পরিসরের কারণে আরো কিছু তথ্যাদি এখানে বাদ পড়ে গেল। পরবর্তীকালে সেসব কথা লেখার ইচ্ছা রইল।
লেখক :বিজ্ঞানবিষয়ক লেখক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক
nadirahmajumdar@gmail.com