দীর্ঘ সাড়ে তিন বছরের অচলাবস্থা নিরসন কল্পে সম্পাদিত ‘সংহতি ও স্থায়িত্ব’ চুক্তি নিঃসন্দেহে কাতার ও উপসাগরীয় তিনটি দেশ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন এবং মিশরের জন্য একটি ভালো পদক্ষেপ। এই চুক্তির মাধ্যমে উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান সংকটের সমাধান হলো। ফলে কাতারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সব নিষেধাজ্ঞা উঠে গেল।
২০১৭ সালের মাঝামাঝি হঠাত্ করে কতগুলো অভিযোগ এনে উপসাগরীয় ক্ষুদ্র দেশ কাতারের ওপর অবরোধ দেয় তার উপসাগরীয় তিন মিত্র পরে যুক্ত হয় সৌদি আরবের আরেক মিত্র মিশর। ইরান ও তুরস্কের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক শিথিল, আলজাজিরা টেলিভিশন বন্ধ এবং সন্ত্রাসীদের অর্থায়ন বন্ধসহ মোট ১৩টি শর্ত দেওয়া হয়। কাতার বরাবরই সন্ত্রাসীদের সঙ্গে নিজেদের সংশ্লিষ্টতার কথা অস্বীকার করে এসেছে।
কোনোরূপ পূর্বঘোষণা ছাড়াই কাতারের সঙ্গে সব ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থগিত করে দেশগুলো। কাতারের সঙ্গে জল, স্থল ও আকাশপথও বন্ধ করে দেয় দেশগুলো। কাতার তার বেশির ভাগ খাদ্যদ্রব্য প্রায় ৭৫ শতাংশ আমদানি করত সৌদি আরবের সঙ্গে স্থলসীমান্ত দিয়ে। সৌদি আরব এবং বাকি তিন মিত্র হয়তো ভেবেছিল কাতারের ওপর অবরোধ দিলে তার অর্থনৈতিক ক্ষতি করা সম্ভব হবে এবং চাপে পড়ে হয়তো শর্ত মেনে নেবে, ফলাফল হয়েছে তার উলটো। কাতারের ওপর অবরোধ দিলে তাত্ক্ষণিকভাবে আকাশপথে সব ধরনের খাদ্যদ্রব্য পাঠিয়ে পাশে দাঁড়ায় তুরস্ক ও ইরান। দেশ দুটির সহযোগিতায় কাতার কিছুদিনের মধ্যেই তার বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে পায়। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণভাবেও অনেক কিছু উত্পাদনে নজর দেয়।
আরও পড়ুন: সেনাবাহিনীর ওপর ভর করে ক্ষমতায় আসতে চায় পাকিস্তানের বিরোধী দল
প্রথমেই আসা যাক, ইরানের সঙ্গে কাতারের সম্পর্কের গভীরতা নিয়ে, ইরানকে উপসাগরীয় বেশির ভাগ দেশ শত্রু ভাবলেও দেশটির সঙ্গে কাতারের অনেক আগে থেকে সুসম্পর্ক। কাতারের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার পরপরই যেভাবে কাতারের পাশে দাঁড়িয়েছে দেশটি। ইরানের আকাশপথ ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয় কাতারকে। ২০১৮ সালের প্রথম দিকে কাতারের আমির এক টেলিফোন কলে ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানিকে কল করে বলেন, ‘ইরান যেভাবে কাতারি জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছে, কাতার কোনো দিন তা ভুলবে না।’ এক বছর আগে ইরানি মিসাইলের আঘাতে ইউক্রেনের বিমান বিধ্বস্ত হলে ইরান সফর করেন কাতারের আমির এবং তেহরানের পাশে থাকার ঘোষণা দেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের চলমান উত্তেজনা হ্রাস করতে একাধিক বার কাতারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা তেহরান সফর করেছেন। করোনা মহামারির শুরুর দিকে জাতিসংঘের শিশু তহবিলের সহায়তা বিনা মূল্যে পৌঁছে দেয় কাতার এয়ারওয়েজে। সব মিলে কাতার-ইরান সম্পর্ক অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে ।
তুরস্কের ক্রমবর্ধমান উত্থানে যেখানে সৌদি আরবের ঘুম হারাম হতে চলেছে, সেখানে কাতারের সঙ্গে তুরস্কের দহরম মহরম সম্পর্ক। অবরোধ আরোপ আরো কাছাকাছি করেছে দেশ দুটিকে। কাতারে তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তুরস্কের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি যখন দেশটির মুদ্রাস্ফীতি বাড়িয়ে দিয়েছে, তখন কাতারের আমিরের আঙ্কারায় ছুটে যাওয়া এবং ১৫ বিলিয়ন বিনিয়োগের ঘোষণা তুরস্কের অর্থনীতির জন্য নিঃসন্দেহে সুখবর। কাতারেও তুরস্কের ১২ বিলিয়ন বিনিয়োগ রয়েছে।
কোনোরূপ শর্ত আরোপ ছাড়াই কাতারের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেওয়া নিঃসন্দেহে সৌদি আরবের উচ্চাভিলাষী যুবরাজের জন্য ছিল বড় রকমের কূটনৈতিক ব্যর্থতা। কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য তো অর্জিত হয়নি বরং কাতার এখন আরো বেশি শক্তিশালী। মাথাপিছু আয়ে কাতার এখনো বিশ্বের এক নম্বর দেশ। সৌদি আগ্রাসনের শঙ্কায় কাতার তার সামরিক সক্ষমতাকে যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গেছে। কাতারের নিরাপত্তায় এখন কাজ করবে তুরস্কও।
আরও পড়ুন: ক্যাপিটল হিলে সন্ত্রাস এবং বৈশ্বিক হুমকি
গত ৯ তারিখে একটি ব্রিটিশ পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরিষ্কার জানিয়েছেন, ‘জিসিসি সংকট নিরসন হলেও তার দেশের সঙ্গে ইরান ও তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্কের কোনো পরিবর্তন আসবে না।’ তাহলে বিষয়টি দাঁড়াল আগে যে কাজটি করতে কখনো কখনো আড়ালে করতে হতো, এখন সেটি প্রকাশ্যে করতে পারবে কাতার।
ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ইরান আরো বেশি শক্তিশালী হবে। ইতিমধ্যে তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী হয়েছে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। সব মিলে ইরান, তুরস্ক ও কাতার তিনটি দেশই আঞ্চলিকভাবে বেশ সুবিধাজনক স্থানে রয়েছে। আর দেশ তিনটির মধ্যে একধরনের অলৈখিক সমঝোতা এই জোটটিকে আঞ্চলিক রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হিসাবে দাঁড় করাবে।
ইত্তেফাক/এএইচপি