ক্যাপিটল হিলে সন্ত্রাস এবং বৈশ্বিক হুমকি

ক্যাপিটল হিলে সন্ত্রাস এবং বৈশ্বিক হুমকি
ফাইল ছবি

প্রত্যেকটি দেশ তার রাষ্ট্র এবং জনগণের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার ব্যতিক্রম নয়। প্রত্যেক রাষ্ট্রই তার নাগরিক এবং তার সীমানা সংরক্ষণ রাখে, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং পররাষ্ট্রিক স্বছতা নির্মাণের জন্য নিরন্তর কাজ করে যায়, যা রাষ্ট্রকে বাঁচিয়ে রাখে। কিন্তু রাষ্ট্রের এই ধারণা মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে মার্কসীয় তাত্ত্বিকরা।

কাল মার্কস বলেছেন, রাষ্ট্র একসময় উবে যাবে। তার পরও গত প্রায় ১৫০ বছর ধরে রাষ্ট্র নামক প্রতিষ্ঠানটি পৃথিবীতে বহাল তবিয়তে আছে এবং প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রাষ্ট্রিক ধারণা সম্পূর্ণ নতুন অবয়বে পরিচালিত হচ্ছে। তখন থেকে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য প্রতিটি রাষ্ট্র, বিশেষ করে বৃহত্ শক্তিবর্গ তাদের সব সাধু এবং অসাধু চেষ্টা, সুস্থ এবং অসুস্থ নীতি, মানসিকতা এবং ভ্রান্ত এবং অভ্রান্ত নীতি প্রয়োগ করে নিজেদের দেশের এবং নিজেদের নাগরিকদের নিরাপত্তার জন্য যা কিছু করা দরকার তা করে যাচ্ছে। আর বৃহত্ শক্তিগুলো এ লক্ষ্যে যাচ্ছেতাই আচরণ করছে। পরের রাষ্ট্র দখল, অন্যের সীমানায় অনধিকার প্রবেশ, অর্থনৈতিক আগ্রাসন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক নিষেধাজ্ঞা প্রভৃতি মাধ্যমে বৃহত্ শক্তিগুলো ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোকে বিভিন্নভাবে শোষণ করে আসছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এদিক থেকে নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অপ্রতিরোধ্য বৃহত্ শক্তিতে পরিণত হয় এবং স্নায়ু যুদ্ধোত্তরকালে একক পরাশক্তি হিসেবে তারা পৃথিবীতে ঔদ্ধত্য দেখাতে শুরু করে। মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সমাজতাত্ত্বিক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপকগণ বিভিন্ন তত্ত্ব প্রচার করতে থাকেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে পৃথিবীর একমাত্র পরাশক্তি, পৃথিবীতে যে শোষণের ক্ষমতা তাদের আছে, মার্কিনীরা যা ইচ্ছা তা-ই যে করতে পারে—এ ধরনের ধারণা বিশ্বময় প্রচার এবং প্রতিষ্ঠা করার নিরন্তর প্রয়াস চালিয়েছে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সুশীল সমাজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, সাংবাদিক এবং আপামর মার্কিন জনগণ সবাই এক সূত্রে গাঁথা এবং একইভাবে একযোগে কাজ করে যাচ্ছে। কী আছে মার্কিনীদের এই প্রচার এবং তত্ত্বের নেপথ্যে? আমরা রাজনীতি বিজ্ঞান এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তত্ত্বের দ্বারা স্পষ্ট করে বুঝতে পারি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিক বাস্তববাদ বা পলিটিক্যাল রিয়ালিজম তত্ত্বের দ্বারা তাদের পররাষ্ট্রনীতিকে পরিচালনা করে আসছে। এ রাজনৈতিক মতবাদ কিন্তু পশ্চাত্যের কাছে নতুন নয়। সেই প্রাচীনকাল থেকে থুচিডাইড, রেনেসাঁ তাত্ত্বিক ম্যাকিয়াভেলি এবং ব্রিটিশ তাত্ত্বিক থমাস হবস প্রভৃতি রাষ্ট্র এবং সমাজবিজ্ঞানীগণ পাশ্চাত্যজগতে এমন এক ধারণা প্রচার করে আসছেন এবং তার প্রসার ঘটাচ্ছেন যে, নিজস্ব রাষ্ট্রের সীমানা, রাষ্ট্রের জনগণ, রাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য তারা যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারে। তাদের স্বার্থে, তাদের প্রয়োজনে স্বল্পমেয়াদী এবং দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্যে যে নীতি নেওয়া দরককার, সেই নীতিই তাদের নিতে হবে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে নতুন মার্কিন তাত্ত্বিকেরা সেই প্রাচীনকালের নীতিকেই বাস্তববাদ তত্ত্বের নতুন মোড়কে ধারণ করে বিশ্বময় তারা ছড়ি ঘুরাচ্ছেন। গণতন্ত্র, মানবাধিকার প্রভৃতি মুখরোচক শব্দ তারা বিশ্বময় প্রচার করে নব্য উপনিবেশবাদী করাল থাবা বিস্তার করে সমস্ত পৃথিবীকে লুটে পুটে খাচ্ছেন। কিন্তু এই প্রথমবারের মতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেই নীতি অসারতা, তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এমনভাবে বিকশিত হয়েছে, যা বিস্ফোরিত হয়ে সারা পৃথিবীকে তাদের এই রাজনৈতিক মতবাদের ভ্রান্ততা স্পষ্ট করে তুলে ধরছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হয়তো অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ক্ষেত্রে রাজনীতির বাস্তববাদকেই ধরে এগোচ্ছেন। ট্রাম্পকে টিকতে হলে এবং রিপাবলিকান দলকে রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী হতে হলে এবং তার ভিশনকে প্রতিষ্ঠিত এবং শক্তিশালী করতে হলে—তাদের সেই নীতি গ্রহণ করতে হবে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হয়তো সে পথেই এগোচ্ছেন। সেদিক থেকে তাদের বাস্তববাদের আলোকে ট্রাম্পকে তো তেমন দায়ী করা যায় না। যে নীতি তারা বহির্বিশ্বে যুক্তিযুক্ত এবং যুক্তিসিদ্ধ রূপে প্রচার করে আসছেন ট্রাম্প হয়তো অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ক্ষেত্রেও সেই নীতির বাস্তবায়ন করতে চান।

সেক্ষেত্রে ট্রাম্পকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক মতবাদের বিরোধী বলা যায় না। এখানেই সম্ভবত তাদের রাজনৈতিক তত্ত্বে চরম বিপর্যয় লক্ষ করা যাচ্ছে।

আমরা সাম্প্রতিক প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রথম থেকে যেভাবে লক্ষ করে আসছি, বিশ্ব মিডিয়া সেভাবে প্রচার করছেও। সব থেকে দেখা যাচ্ছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার গোষ্ঠী, তার পার্টির স্বার্থরক্ষার জন্য, যা কিছু করা দরকার সবকিছু তিনি করছেন। সেখানে নীতির সাধুতা অসাধুতা—এসব প্রশ্ন কোথায়? কারণ পাশ্চাত্যের যে ঐতিহাসিক শিক্ষা, সেই শিক্ষা থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এক চুলও সম্ভবত বিচ্যুত হননি। বরং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সারা পৃথিবীকে পাশ্চাত্যের রাজনৈতিক কাঠামো এবং শাসনতান্ত্রিক কাঠামো কী তা দেখিয়ে দিয়েছেন। সবশেষে যখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছিল তখন তিনি দাবি করে আসছেন এই নির্বাচনে তারই জয় হয়েছে এবং হুমকিও দিয়েছিলেন এই নির্বাচনে যদি হেরে যায়, তাহলে কোনোভাবেই মানবেন না। আমরা দেখছি যে, বিভিন্ন রাজ্য জনগণ যে রায় দিয়েছে ট্রাম্প সেটা মানতে নারাজ। মেকিয়াভেলি বলেছেন যে, রাজাকে টিকে থাকতে হবে, টিকে থাকার জন্য যা করা দরকার তাকে তা-ই করতে হবে। মেকিয়াভেলির নীতি ছিল যে লক্ষ্যে রাজাকে কাজ করতে হবে, সে লক্ষ্যে যা করা দরকার তা-ই করতে হবে এবং এই নীতি পাশ্চাত্য রাজনীতির বাস্তবতা সিদ্ধতা দিয়েছে এবং জায়েজ করে দিয়েছে। গত তিন-চার দিনের ঘটনা দেখলে আমরা এর সত্যতা উপলব্ধি করতে পারি। রিপাবলিকান পার্টির বড় বড় নেতা, যাদের ভদ্রতা, পোশাক, শালীনতা আমরা এত দিন দেখেছি এরা প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে ক্যাপিটল হিলে ঢুকেছে এবং সেখানে তারা বন্দুক তাক করেছে এবং ভাঙচুর করেছে। তারা ক্যাপিটল হিল বিশ্বের রাজনৈতিক প্রাণকেন্দ্রে তথা বিশ্বের মানবাধিকারের সূতিকাগার সেই ক্যাপিটল হিলে তারা যখন এমনভাবে বন্দুক তাক করেছে মনে হলো তখনই গুলি করবে এবং গুলি করে ঝাঁঝরা করে দেবে। অনেক আহত হয়েছে। চার-পাঁচ জন মৃত্যুবরণ করেছে। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো ঐ অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পেছনের গোপন পথে পালিয়ে গেছে। আমার কাছে যা মনে হয়েছে তা হলো, সামগ্রিকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো পাশ্চাত্যের রাজনৈতিক তত্ত্বের তাত্ত্বিক বিপর্যয় প্রতিপন্ন করেছে। এখান থেকে বেরিয়ে আসতে হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্ববাসীর শিক্ষা হলো, যারা এত দিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে মানবাধিকারের সূতিকাগার মনে করতেন, যারা মার্কিনীদের দিকে তাকিয়ে থাকতেন, যারা বিভিন্ন দেশের গণতন্ত্রের কথা বলতেন, যারা গণতন্ত্র শিখতে চাইতেন—তারা সারা পৃথিবীতে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের নামে কী না করেছে! আমরা দেখেছি, ১৫/২০ বছর তারা যেসব কাজ করেছে গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের ক্ষেত্রে কতটুকুই না ভয়ংকর? ইরাকে তারা আগ্রাসন চালিয়েছে, আফগানিস্তানের জনগণের ওপর তারা যুদ্ধ চাপিয়েছে। তালেবানের শাসনকে তছনছ করে দিয়েছে, আফগানকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে, একটি সদ্য প্রতিষ্ঠিত মুসলিম জাতিকে তারা পথে বসিয়েছে। সিরিয়ার অবস্থাও তাই, তুরস্ককে তারা হুমকি দিচ্ছে, ইরানের মতো একটা গণতান্ত্রিক দেশকে—যেখানে একটি নির্বাচিত সরকার, যেখানে নির্বাচন হয় স্বচ্ছভাবে, যেখানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয় ওপেন ব্লকে এবং শুক্রবারের জুমার নামাজের পর, যেখানে কোনও লুকোচুরি নেই, এরকম একটা নজিরবিহীন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় যেখানে নির্বাচন হয়, যেখানে তারা গত পাঁচ-সাত বছর ধরে পারমাণবিক চুক্তিকে কেন্দ্র করে কি না করছে। ইরানে যখন একনায়কতন্ত্র ছিল তখন তো তারা অস্ত্র দিয়েছে, সাহায্য করেছে কিন্তু যখনই গণতন্ত্র উদয় হলো, ছাত্ররা বিপ্লব করল তখন মার্কিনীরা কিন্তু তাদের সমর্থন দিতে চায়নি।

এভাবে তারা ঐতিহাসিকভাবে নিজেদের রাষ্ট্রের স্বার্থেই গণতন্ত্র ও মানবাধিকার ব্যবহার করেছে। এটাই তাদের রাজনৈতিক বাস্তবতা। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই রাজনৈতিক বাস্তবতার নীতির ওপর দাঁড়িয়েই দাবা খেলে যাচ্ছেন। আমরা জানি না, সামনে কী হতে যাচ্ছে। বাইডেনের ক্ষমতায় আসার কথা ২০ তারিখে কিন্তু ট্রাম্প কি সে সুযোগ দেবে? ইতিমধ্যেই বিশ্ব মিডিয়ায় খবর বেরিয়েছে যে, ট্রাম্পের সমর্থকরা সশস্ত্র বিক্ষোভের ছক এঁকেছে। বিষয়টিকে ছোট করে দেখার কোনও অবকাশ নেই। মনে রাখতে হবে—ট্রাম্প ধনীদের একজন, ট্রাম্প দমে যাওয়ার পাত্র নন, ট্রাম্পের সঙ্গে রয়েছে বিশাল একটি শ্বেতাঙ্গ গোষ্ঠী এবং শ্বেতাঙ্গরাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সেখানে বাইডেন কতটুকু নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারবেন—এই মুহূর্তে বলা মুশকিল। আমরা জানি, যেভাবে ঘটনাগুলো এগোচ্ছে বাইডেন ২০ তারিখ ক্ষমতায় বসা ততটা কুসুমাস্তীর্ণ হবে না। সে পথে ট্রাম্প ফোবিয়া সব সময়ই ঝামেলা বাধিয়ে রাখবে। বাইডেনের সামনে পথগুলো বড়ই কণ্টকাকীর্ণ। কাজেই এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্ববাসীর উচিত বৈশ্বিক নিরাপত্তা নতুন পর্যালোচনা করা এবং রাষ্ট্র, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জন্য নতুন তত্ত্বের অন্বেষণ করা।

লেখক: চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/এসআর

Nogod
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত