বাংলাদেশে সারা বছরই কোনো কোনো মেলার আয়োজন করা হয়ে থাকে। কৃষিমেলা, সবজিমেলা, ফলমেলা, মাছমেলা, গাছমেলা, বাণিজ্যমেলা, পিঠামেলা, বৈশাখীমেলা, এমনকি পর্যটনমেলা— আরো কতকি মেলা তা বলে শেষ করা যাবে না। এক কথায় বলতে গেলে মেলা বাঙালি কালচারের সঙ্গে মিশে গিয়ে এমন একটি কালচারে পরিণত হয়েছে যা খুবই গুরুত্ব বহন করে। আর একথা ঠিক যেভাবেই এসব মেলা শুরু হয়ে থাকুক না কেন প্রত্যেকটি মেলার রয়েছে আলাদা গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা। এমনি একটি মেলা হলো পাখি মেলা। সময়ের ব্যবধানে এটি অন্যতম প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণে পরিবেশবাদী একটি মেলায় পরিণত হয়েছে।
বলছিলাম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ১১ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া পাখি মেলার কথা। পত্রিকান্তরে এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পারি, ঐদিন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ১৮তম পাখি মেলা। অর্থাত্ যদি প্রতিবছরে তা একবার অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে তাহলে ১৭ বছর আগে থেকে তা শুরু হয়েছে যা মোটেও কম সময় নয়। আর যাদের উদ্যোগে এ মহত্ কার্যটি সম্পন্ন হয়ে থাকে তাদেরকে আন্তরিক অভিনন্দন। জানা গেছে এবারের (২০১৯) ১৮তম পাখি মেলাটি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. ফারজানা ইসলাম উদ্বোধন করেছেন। অনুষ্ঠানটি প্রতিবছর আয়োজন করে গৌরবের ভূমিকায় থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগ। সঙ্গে আরো ছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পাখি বিশারদ ড. ইনাম আল হক, বিশিষ্ট প্রকৃতিপ্রেমি ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মুকিত মজুমদার বাবু।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবছর শীতকালে যে অতিথি পাখিকুলের আগমন ঘটে তা দেশবাসী সকলেই কমবেশি অবগত। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যাঁরা আছেন তাঁরা তো এ অতিথি পাখি গমনাগমনের বিষয়টি উপভোগ করেনই, সেইসঙ্গে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এমনকি বিদেশের অনেক জায়গা থেকেও ছুটে আসেন মানুষ সেখানকার ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি উঠা-নামার নয়নাভিরাম দৃশ্য উপভোগ করার জন্য। অথচ সেখানে মাত্র কয়েকটি বদ্ধ জলাশয়ে এ পাখিগুলো সুদূর ইউরোপ, আফ্রিকা থেকে হাজার হাজার মাইল অর্থাত্ সাত সাগর তেরো নদী পাড়ি দিয়ে চলে আসে। শীত চলে গেলে আবার তারা ফিরে যায়। কী মধুর প্রাকৃতিক যোগসূত্র!
দেশে এমন আরো অনেক জায়গা রয়েছে যেখানে এভাবে ভিনদেশি পাখিগুলো উড়ে আসে। এটি একটি প্রাকৃতিক সমন্বয়। মানুষ যেমন কর্মের খাতিরে এক দেশ থেকে অন্য দেশে চরে বেড়ায়, ঘুরে বেড়ায়, ঠিক তেমনি এ অতিথি পাখিগুলো দেশ হতে দেশান্তরে ছুটে বেড়ায়। এদেরকে অতিথি পাখি বা মাইগ্রেটরি বার্ডস কিংবা পরিযায়ী পাখি বলে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। এসব পাখি নিয়ে এখন অনেক গবেষণা চলছে।
শুধু তাই নয়, পাখি বিশ্রাম নেয় গাছ-গাছালির ডালে বসে। তাছাড়া অনেক পাখি আছে যারা ডিম পাড়ে গাছের গুহায়, নিরাপদ বাসা তৈরি করে গাছের ডালে, গাছের পাতা কিংবা খরকুটো দিয়ে। কিন্তু এখন বনজঙ্গল উজাড় হয়ে যাচ্ছে। সে কারণে হুমকির মুখে পড়ছে পাখির নিরাপদ আবাসস্থল। দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনসহ যেকোনো স্থানের গাছগাছালি উজাড় হয়ে যাওয়ার কারণে অতিথি পাখির আগমন দিনে দিনে কমে যাচ্ছে। আর তা আমাদের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে। কারণ জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য প্রাকৃতিক পরিবেশের সব জীবজন্তু মানুষ পক্ষীকুল সবকিছু একে অপরের পরিপূরক হয়ে থাকতে হবে। তাই এমন পাখি মেলা করে বাংলাদেশে অতিথি পাখির গুরুত্ব অনুধাবন করার বিষয়টি খুবই তাত্পর্যপূর্ণ। এভাবে চলতে থাকলে মানুষের মধ্যে সচেতনতা গড়ে উঠবে এবং প্রকৃত অর্থেই রক্ষা পাবে অতিথি পাখিসহ অন্যান্য পক্ষীকুল, সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।
n লেখক: কৃষিবিদ ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়