কবিতা একদিকে পৃথিবীর সব সৌন্দর্য ধারণ করে, অন্যদিকে শব্দ, বাক্য, উপমা-উৎপ্রেক্ষায় শক্তিশালী। কবিতার বোধ স্নিগ্ধ ও ক্রিয়াশীল। প্রেম বিরহ, নিবেদন, দ্রোহ, বোধ, বিচ্ছেদ যাতনা ধারণ করে কবিতা। কবি গোপনে সমাজ, সংসারের বহুতল উন্মোচন করেন। প্রচলিত ধারা কবিতা রূপান্তর করে। বিষয়ের বৈচিত্র্য, প্রকাশভঙ্গীর ভিন্নতা মিশ্রায়ণের জাদুমন্ত্র কবির হাতে থাকে। এ সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় কবি মহাদেব সাহা আত্মজৈবনিক কবি। জন্মগ্রাম, মধ্যবিত্ত, নিম্নবর্গের দিনযাপন, প্রকৃতি ও প্রণয়কে সামনে রেখে বহুপথ অতিক্রম করেছেন।
গৃহের মধ্যে থেকেও সন্ন্যাস জীবনকে বহন করে একজন কবি—এ রহস্যের সন্ধান করতে গিয়ে পেয়েছেন মুক্তোঝরানো জীবন। কবিতার নৌকা বেয়ে ঘুরেছেন ঘাটে ঘাটে। প্রেমে-দুঃখে একাকার হয়ে কীভাবে সময়কে চিহ্নিত করতে হয় আমরা তাঁর কাছ থেকে জেনেছি। কাব্যসমগ্র ১-৬, মানব এসেছি (১৯৭৪), চাই বিষ অমরতা (১৯৭৫), কী সুন্দর অন্ধ (১৯৭৮), তোমার পায়ের শব্দ (১৯৮২), ধুলোমাটির মানুষ (১৯৮২), ফুল কৈ শুধু অস্ত্রের উল্লাস, লাজুক লিরিক (১৯৮৪), আমি ছিন্নভিন্ন (১৯৮৬), মানুষ বড়ো ক্রন্দন জানে না (১৯৮৯), নির্বাচিত কবিতা, কোথা সেই প্রেম, কোথা বিদ্রোহ (১৯৯০), প্রথম পয়ার (১৯৯০), অস্তমিত কালের গৌরব (১৯৯২), আমূল বদলে দাও আমার জীবন (১৯৯৩), একা হয়ে যাও (১৯৯৩), যদুবংশ ধ্বংসের আগে, সুন্দরের হাতে আজ হাতকড়া, গোলাপের বিরুদ্ধে হুলিয়া, মহাদেব সাহার শ্রেষ্ঠ কবিতা, এত যে সুখের নৃত্য, এত যে দুঃখের অশ্রু (২০২০), কোথা পাই দিব্যজ্ঞান (২০১৯) মহাদেব সাহা রচিত কাব্যগ্রন্থের নামকরণে বিশেষত্ব এবং সমাজবাস্তবতার মেলবন্ধন স্পষ্ট। গ্রন্থভুক্ত কবিতায় কবি সত্য, সুন্দর, প্রকৃতি এবং মানুষের যন্ত্রণা ও আনন্দকে উপস্থাপন করেছেন।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনচিত্র, আত্মত্যাগ, মহত্ত্ব ও শোকগাথা রচনা করেছেন—কফিন কাহিনী, আমি বলতে পেরেছিলাম? মুজিব হত্যার বিচার চাই, ‘আবার আসিব ফিরে’ কবিতায় তিনি স্মৃতি, অশ্রু ও প্রতিবাদকে ধারণ করছেন। মহাদেব সাহা ‘এই গৃহ এই সন্ন্যাস’ কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে কাব্যাঙ্গনে নিজের অভিষেক ঘটান।
‘চারজন দেবদূত এসে ঘিরে আছে একটি কফিন
একজন বললো দেখো ভিতরে নবীন
হাতের আঙুলগুলি আরক্ত করবী
রক্তমাখা বুক জুড়ে স্বদেশের ছবি!’
(কফিনকাহিনী)
মৃত্যু কিংবা দুঃখ এই গ্রহের মানুষকে স্পর্শ করে না। মানুষ বৈষয়িক এক চাহিদার কাছে ছুটে যাচ্ছে। পরিবার, পারস্পরিক সম্পর্কের ভাঙনের চিত্র প্রকটভাবে মহাদেব সাহার কবিতায় দেখা যায় না। পৃথিবীতে এখন শূন্যতা, দৌড় চলছে। প্রতিহিংসাগ্রস্ত মানুষের সাথে দার্শনিক, মানবিক কর্মী, দিন আনে দিন খায় মানুষের দূরত্ব বাড়ছে। মানুষ এখন নিজের কাছে পরাস্ত। চেনা নামগুলো ভুলে থাকার মন্ত্রে সে অভ্যস্ত। ‘কারো জন্য কারো চোখে জল জমে না। / কে কাকে মনে রাখে? / বরফখণ্ডের চেয়েও শীতল ফাইলের নীচে নাম চাপা পড়ে যায় / মুহূর্তে মানুষ কতো মুখ ভুলে যায়, কতো নাম মুছে যায় / তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ অন্ধ হয়ে যাবে / কেউ ফিরে আসবে না... / কেউ বেশি দিন কিছুই মনে রাখে না / একটি দুটি বসন্ত/ মানুষ ভুলে যেতেই ভালোবাসে / তার মন খুব অস্থির / সে নাম লেখে না / মুছে ফেলে / ভুলে যেতেই পছন্দ করে মানুষ / কেন দুঃখ করো / কারো জন্য কারো চোখে জল জমে না’ (কারো জন্য কারো চোখে জল জমে না, কোথা পাই দিব্যজ্ঞান)
তুমুলভাবে আলোড়িত করে : ‘কেউ জানে না একেকটি মানুষ বুকের মধ্যে কী গভীর দীর্ঘশ্বাস / নিয়ে বেড়ায়—’ পৃথিবী যান্ত্রিক, নিষ্ঠুর ও নানা অপরাধে যখন ভরে যায় তিনি তখন ভালোবাসার কাছে নত। ‘একবার ভালোবেসে দেখো, একবার কাছে ডেকে দেখো / আবার আগের মতো কীভাবে ফুটাই এক লক্ষ একটি গোলাপ / অনায়াসে কীভাবে আবার অনুভূতি সঞ্চারিত / একবার ভালোবেসে দেখো আবার কীভাবে লিখি দু’হাতে কবিতা।’
সমসাময়িক কালে নিজেকে নিঃশেষ করে কোনো কবির কবিতা লেখার দৃষ্টান্ত চোখে পড়ে না। মহাদেব সাহা কবিতার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। কবিতাই যে তাঁর ধ্যান-জ্ঞান। অশেষ কষ্টের মধ্যেও, সীমাহীন দুঃখের মধ্যেও তিনি কবিতা ছাড়েননি। কবিতা তাঁর একমাত্র অবলম্বন। একদিকে সবকিছুই তাঁর কবিতা। এই হচ্ছে তাঁর জীবন, কবিতার জীবন। দুঃখকষ্টকে ছাপিয়ে তিনি উপহার দিয়েছেন অনেক মহৎ কবিতা। এরকম তো হতেই পারে আমরা তাকে বুঝিনি। তিনি অবহেলা তাচ্ছিল্য উপেক্ষা করে ধ্যানী কবির মতো রচনা করেছেন একেকটি কবিতা যা অনবদ্য ও মর্মস্পর্শী। তাঁর কবিতা হৃদয়গ্রাহী। একেকটি পঙ্ক্তি গেথে যায় স্মৃতিতে। আমাদের অনেক ভালোবাসা, স্বপ্নকে তিনি ধারণ করেছেন। তাঁর রচিত কবিতা হয়ে উঠেছে জীবনদর্শন। আত্মমগ্নতার বাণী বিধৃত হয় বলেই তিনি জনপ্রিয়। আমরা যেহেতু তাঁর জীবন ও কবিতা পাশাপাশি পাঠ করি তাইতো দেখি মহাদেব সাহা কীভাবে বেদনার মধ্যে গোলাপ ফুটিয়েছেন। তিনি আনন্দ ও বেদনার পাশাপাশি সমকালকে স্পর্শ করে চলেছেন। বিচ্ছিন্ন এক দ্বীপের অশেষ বেদনা বহন করে চলেছেন তিনি। মহাদেব সাহার জন্মদিনে শুভেচ্ছা।
ইত্তেফাক/এমআর