প্রাণঘাতী ইবোলায় এখন পর্যন্ত কয়েক হাজার মানুষ মারা গেছে আফ্রিকার কয়েকটি দেশে। ইবোলার হানায় ধ্বংস হয়ে গেছে কতো পরিবার, কতো স্বপ্ন। একুশ শতকের উন্নত বিশ্বের স্বাস্থ্য, চিকিত্সা পদ্ধতির কাছে এখন পর্যন্ত হার না মানা মরণ ব্যাধি ইবোলায় একদিকে ঘটেছে প্রাণহানি অন্যদিকে অর্থনৈতিক, সামাজিক নানা ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েছে গোটা আফ্রিকা মহাদেশ। আফ্রিকার কয়েকটি দেশে এই ক্ষতি অবর্ণনীয়। ইবোলার শিকার দেশগুলোর মধ্যে সিয়েরা লিয়ন অন্যতম। দেশটিতে আরো অনেক সামাজিক সমস্যার সাথে সাথে যে বিষয়টি মানুষকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে তা হলো, ইবোলার কারণে দেশটির শিক্ষা ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়েছে।
ইবোলা বিধ্বস্ত সিয়েরা লিয়নের রাজধানী ফ্রি-টাউনের স্কুলগুলোতে পর্যন্ত শুরু হয়নি শ্রেণি কার্যক্রম। স্কুলগুলোর স্বাভাবিক পরিবেশ তৈরি হওয়ার ক্ষেত্রে অনেক প্রতিবন্ধকতার অন্যতম বড় কারণ শিশুদের ইবোলা ভীতি। মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়া এখানকার মানুষের প্রয়োজন এখন কাউন্সেলিং। চারিদিকে শুধু মৃত্যু আর মৃত্যু। আতঙ্কগ্রস্ত এসব শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক উন্নয়ন ছাড়া লেখাপড়ার পরিবেশ বা জীবনযাত্রার মান কোনটাই ফিরিয়ে আনা সম্ভব না। রাজধানীর একটি খ্রিস্টান প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চার্চে শিক্ষার্থীদের প্রার্থনা করাচ্ছিলেন স্কুলটির শিক্ষক এন্ড্রু কাবিয়ার। ইবোলা পরবর্তী সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে আলোকপাত করতে .গিয়ে কাবিয়ার বলেন, এখানকার বেঁচে যাওয়া মানুষগুলো ঈশ্বরের কাছে কৃতজ্ঞ। এতোদিন আমরা শুধু ছুটিই কাটিয়েছি কিন্তু এখন আবার আমাদের লেখাপড়ার বিষয়টিতে গুরুত্ব দিতে হবে। আমরা অতীতের ভয়াবহ দিনগুলো ভুলে যেতে চাই এবং এর জন্য আমাদের প্রধান লক্ষ্য হলো কাজে মনযোগী হওয়া। লেখাপড়ার বিষয়বস্তুর সাথে যুক্ত হয়েছে স্বাস্থ্য ঝুঁকির বিষয়টিও। এখন তাদের কাছে ‘এ’ ‘বি’ ‘সি’ মানে শুধু অক্ষর নয়। এ বি সি’র মধ্যে দিয়ে তারা যে বার্তাটিকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে চাইছে তা হলো ‘এভয়েড বডি কন্টাক্ট’।
সিয়েরা লিওনের প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীর উপস্থিতির হার তুলনামূলক ভাবে কম হলেও ইবোলা আতঙ্কের পর থেকে স্কুলগুলোতে উপস্থিতির হার ১০ শতাংশের কাছাকাছি পর্যায়ে নেমে এসেছে। খ্রিস্টান প্রাথমিক বিদ্যালয়টির ষষ্ঠ শ্রেণিতে দেড়শ’র মতো শিক্ষার্থী হলেও বর্তমানে ২০ জনেরও কম শিশু স্কুলে আসছে। তাদের কাছে এখন লেখাপড়ার চেয়ে জান বাঁচানো বড়। স্কুল থেকে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার ক্ষেত্রে আতঙ্কের পাশাপাশি অর্থনৈতিক বিপর্যয়ও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ইবোলার কারণে অনেক শিশুই বাবা-মাকে হারিয়েছে। হয়তো পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে কেড়ে নিয়েছে মরণঘাতী এই রোগ। ফলে অনেক শিশুকেই পরিবারের বোঝা কাঁধে তুলে নিতে হয়েছে। এসব হতভাগ্য শিশুদের একজন ইদ্রিসা কামারা। বয়স মাত্র ১৪। যে সময়টাতে তার থাকার কথা ছিলো স্কুলে, তখন তাকে রাস্তায় নামতে হয়েছে চাইনিজ এলইডি লাইট বিক্রি করতে। ইদ্রিসা এখনো স্বপ্ন দেখে বড় হয়ে চিকিত্সক হবে। ইদ্রিসার মাও স্বপ্ন দেখেন ছেলে আবার ফিরবে স্কুলে- মা বলেছে, এগুলো বিক্রি করে টাকা জমাতে থাক, তোকে আবার স্কুলে পাঠাবো। তবে ইদ্রিসা জানে হয়তো তার আর কখনোই ফেরা হবে না স্কুলে। কারণ প্রতিদিন অনেক কষ্ট করে রাস্তায় ফেরি করে লাইট বিক্রি করতে হয়। কখনো কখনো কিছুই বিক্রি হয় না।
এক সময় তারাও মোটামুটি সচ্ছল ছিলো। নিজেদের ছোটখাটো ব্যবসা ছিলো। যা আয় হতো ভালোই চলে যেতে। কিন্তু ইবোলা ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে সবকিছুই বন্ধ। এক বছরে জমানো টাকাও শেষ। শুধু ইদ্রিসা নয় এ চিত্র সিয়েরা লিওনের অধিকাংশ পরিবারের। দেশটিতে নামমাত্র বেতনে শিক্ষার সুযোগ রয়েছে, সবকিছু মিলিয়ে বছরে ৪৬ মার্কিন ডলার (৩২২০ টাকা) খরচ হয়। তবে অভিভাবকদের কাছে সেটাও যেন এখন জোগাড় করা কষ্টসাধ্য।
সেভ দ্য চিলড্রেনের কান্ট্রি ডিরেক্টর রব ম্যাকগিলভারির মতে, ইবোলা ছড়িয়ে পড়ার পরে সতর্কতার জন্য এখানকার মানুষ সাধারণত ভিড় এড়িয়ে চলেছে। বাজার, ক্ষুদ্র ব্যবসা কিংবা জন সাধারণের আনাগোনা সেসব জায়গা বেশি সেখান থেকে সবাই নিজেকে গুটিয়ে রেখেছে দীর্ঘদিন। ফলে দেশটির স্বাভাবিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। অনেক পরিবারের আয়ের একমাত্র উত্সটিও হয়তো বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে তারা বাধ্য হয়েই শিশুদের কাজে পাঠাচ্ছে।
গত বছর আফ্রিকাতে ইবোলা ছড়িয়ে পড়ার পর প্রায় এক বছর পরে স্কুলে ফিরতে শুরু করেছে শিক্ষার্থীরা। তবে এখনো তারা হাতে পায়নি নতুন বই। ঠিকমতো ক্লাশও শুরু হয়নি। ইবোলার কারণে নানা সমস্যায় জর্জরিত দেশটিতে শিক্ষা কার্যক্রম ভেঙ্গে পড়লেও নতুন করে মাথা উঁচু করে দেখতে শুরু করেছে সেখানকার মানুষ।