‘মধুর চেয়ে মিষ্ট’ সম্পর্ক

 
চীনের প্রেসিডেন্ট জি জিনপিং অতিসম্প্রতি প্রথমবারের মতো পাকিস্তান সফর করেন। এ সময় দু’দেশের মধ্যে সম্পন্ন হয় ৪৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অবকাঠামো ও জ্বালানি চুক্তি। আর এ খবরটি চীনা রাষ্ট্রীয় মিডিয়া ওয়েবসাইটগুলোর শিরোনাম হয়েছিল কয়েকদিন। এই চুক্তিটি চীনের উচ্চাকাঙ্ক্ষী “নতুন সিল্ক রোড” কৌশলেরই অংশ, যার লক্ষ্য চীনের পশ্চিমাঞ্চলকে দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সংযুক্ত করতে একটি অর্থনৈতিক কোরিডোর সৃষ্টি। গত ২০ এপ্রিল চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া এই দুই দেশের সম্পর্ককে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করে “ইস্পাতদৃঢ় বন্ধুত্ব” হিসেবে। কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র পিপল’স ডেইলি উদ্ধৃতি প্রকাশ করে জানিয়েছিল যে, পাকিস্তানের রাস্তায় কেউ কেউ এমন কথাও বলছে যে, তারা হাতের সামনে সোনা পেয়েও ছেড়ে দিতে পারবে; কিন্তু ছাড়তে পারবে না চীন-পাকিস্তান বন্ধুত্ব।
 
শি জিনপিং ইসলামাবাদ সফরে যাওয়ার পর পাকিস্তানি কর্মকর্তারা  বারবার বলছেন, চীন-পাকিস্তানের সম্পর্ক এখন ‘মধুর চেয়েও মিষ্ট’ আর ‘হিমালয়ের চেয়েও উঁচু’। ১৯৫১ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের সঙ্গে সরকারি সম্পর্ক স্থাপনকারী গোড়ার দেশগুলোর একটি হচ্ছে পাকিস্তান। চীন পাকিস্তানের সর্ববৃহত্ বাণিজ্যিক অংশীদার এবং শীর্ষ অস্ত্র সরবরাহকারী। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় এ দুই প্রতিবেশী একে অপরের প্রতি দ্রুত বাড়িয়ে দেয় সাহায্যের হাত। এটি ধরে নেয়াই স্বাভাবিক যে, চীন ও পাকিস্তানের নাগরিকরা পরস্পরের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করে; কিন্তু বাস্তব অন্য। দুই দেশের তৃণমূল পর্যায়ের সেন্টিমেন্ট অভিন্ন নয়। গত বছরের জুলাইয়ে একটি পিউ রিসার্চ সেন্টার জরিপে দেখা গিয়েছিল, ৭৮ শতাংশ পাকিস্তানি চীনকে বন্ধুপ্রতিম মনে করে। অন্যদিকে দক্ষিণ এশীয় প্রতিবেশীর প্রতি চীনাদের মনোভাব ততোটা ইতিবাচক নয়। চীনের মাত্র ৩০ শতাংশ লোক পাকিস্তানকে বন্ধুপ্রতিম মনে করে।
 
চীন ও পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ বন্ধনের কথা জানা সত্ত্বেও বেশিরভাগ চীনা পাকিস্তানকে সহিংস, বিশৃঙ্খল ও দুর্বল শাসনের দেশ মনে করে। চীনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ জিনজিয়াংয়ের সঙ্গে পাকিস্তানের রয়েছে ৩৭২ মাইল দীর্ঘ সীমান্ত। এই অঞ্চলেই ১০ মিলিয়ন প্রধানত মুসলিম ও তুর্কি ভাষী উইঘুরের বসবাস। আর উইঘুর ও সংখ্যাগুরু হ্যান জনগোষ্ঠীর মধ্যে সহিংসতা যেন নিত্যদিনের। ২০১১ সালের আগস্টে জিনজিয়াংয়ের দক্ষিণাঞ্চলীয় কাসগর অঞ্চলের কর্মকর্তারা দাবী করেছিলেন, উইঘুর যোদ্ধারা পাকিস্তানে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছে। এরপর থেকে চীন পাকিস্তানকে বহুবার চাপ দিয়েছে সেখানে বসবাসরত উইঘুর বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বহিষ্কার করার ব্যাপারে।
 
চীনাদের উল্লেখযোগ্য একটা অংশ পাকিস্তানকে শুধুমাত্র সহিংস দেশই মনে করে না, তাদের মতে এই দেশটি আইনহীন ও কার্যত অচল রাষ্ট্র। ২০১৩ সালের এক বসন্ত দিনে চীনের উত্তরাঞ্চলীয় শহর ডাইহানের এক তরুণী কলেজ থেকে ফিরে দেখেছিলেন, তার ঘরের সিলিং ধসে পড়েছে। এর প্রেক্ষিতে চীনের সামাজিক যোগাযোগের বড় মাধ্যম ওয়েইবোতে তিনি ছবিসহ পোস্ট করেছিলেন ‘প্রথম দেখাতে আমার মনে হয়েছিল, আমি সম্ভবত পাকিস্তানে।’ গত বছরের এপ্রিলে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ৩৭০ নিখোঁজ হওয়ার পর এক ওয়েইবো ব্যবহারকারী লিখেছিলেন, ‘আমি নিশ্চিত এটি ইসলামি চরমপন্থীদের কাজ। ভালভাবে খোঁজ করলেই বিমানটিকে আফগানিস্তান, পাকিস্তান কিংবা ইয়েমেনে পাওয়া যাবে।’ এই ওয়েইবোতেই প্রশ্ন রাখা হয়েছিল, পাকিস্তান কোন্ ধরনের রাষ্ট্র? সেখানে কি প্রচুর সন্ত্রাসী সংগঠন রয়েছে? এর প্রেক্ষিতে চীনের একজন লিখেছিলেন, ‘দরিদ্র লোকগুলো সন্ত্রাসী। পাকিস্তানীরা প্রকাশ্য রাস্তায় নারীদেরকে হেনস্থা করে।’ আরেকজনের মন্তব্য এরকম— পাকিস্তানের প্রয়োজন রয়েছে চীনকে পাশে পাওয়ার। এমন প্রয়োজন চীনের নেই। চীনকে ছাড়া পাকিস্তানকে ধ্বংস করে দেবে ভারত। তবে জনগণের মনোভাবে কিছু যায়-আসে না। কৌশলগত কারণেই চীনা সরকার দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তানেকেই সেরা বন্ধু হিসেবে বেছে নিয়েছে।