ভূমিকম্পের ফলে আরও কাছাকাছি এল ভারত ও নেপাল! রাজনৈতিকভাবে তো বটেই, এমনকি ভৌগোলিকভাবেও। ভূ-বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, সম্প্রতি নেপালে সংঘটিত হওয়া ৭ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্পের সময় উত্তর ভারতের গোটা একটা অংশ ভূপৃষ্ঠের নীচ দিয়ে নেপালের দিকে ১ থেকে ১০ ফুট পর্যন্ত এগিয়ে গেছে! ঠিক তেমনই নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু দক্ষিণে ভারতের দিকে প্রায় তিন মিটার সরে এসেছে। আর এই ব্যাপারটি ঘটেছে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে।
প্রসঙ্গত, প্রায় এক কোটি বছর আগে ভারতীয় উপমহাদেশ অংশটি (ইন্ডিয়া প্লেট) বিষুব রেখার নীচ থেকে উঠে এসে ইউরোপ-এশিয়ার মূল ভূ-খণ্ডের (ইউরেশিয়া প্লেট) সঙ্গে মেশে। এখনও এই অংশটি নেপাল-তিব্বত এলাকার নীচে বছরে ১ দশমিক ৮ ইঞ্চি গতিতে ক্রমশ ঢুকে চলেছে। ঠিক এই কারণেই এই দুই ভূখণ্ডের সংযোগস্থলের বিস্তীর্ণ অঞ্চল (পাকিস্তান থেকে মিয়ানমার পর্যন্ত, হিমালয় পর্বতও যার অংশ) ভূমিকম্পপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত।
আমেরিকার কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যামন্ট-ডোহারটি অবসারভেটরির সহকারী গবেষক কলিন স্টার্কের বক্তব্য, নেপালের সামপ্রতিক ভয়াবহ ভূকম্পনের সময় সংশ্লিষ্ট ভূখণ্ডগুলোর চলনের ঘটনাটি প্রায় একহাজার থেকে দু’হাজার বর্গমাইল (প্রায় ২ হাজার ৬০০ থেকে ৫ হাজার ১৮০ বর্গকিলোমিটার) এলাকা জুড়ে হয়েছে। কাঠমান্ডু ও পোখরা শহরগুলো যে এলাকায়, সেটি একদিকে এবং প্রস্থ অনুযায়ী হিমালয়ের বাকি অংশের প্রায় পুরোটাই অন্য দিকে সরেছে। আর এর মধ্যেই উত্তর ভারতের একটি অংশ ভূপৃষ্ঠের নীচ দিয়ে উত্তরে নেপালের দিকে ১ থেকে ১০ ফুট পর্যন্ত সরে গিয়েছে। বিহারের নীচের ভূত্বকের ওই অংশটি নেপালের ভরতপুরের দিক দিয়ে হেতায়ুদা হয়ে জনকপুর পর্যন্ত সরে গিয়েছে। কলিন এও বলেন যে, এই সরে যাওয়ার ব্যাপারটি বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন সময়ে আকস্মিক ভাবেই ঘটে।
ভূপৃষ্ঠের অনেক গভীরে থাকা টেকটনিক প্লেটগুলোর গঠন ও তাদের প্রকৃতি নিয়ে যারা গবেষণা করেন তাদেরই অন্যতম কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জেমস জ্যাকসন। ওই ভূমিকম্পের পরই নেপালে কম্পনের কেন্দ্রস্থল থেকে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়া শব্দতরঙ্গ নিয়ে গবেষণা করতে শুরু করেছিলেন জ্যাকসন। প্রাথমিক ভাবে যে তথ্য মিলেছে, তার ভিত্তিতে তিনি জানিয়েছেন, ইন্ডিয়া ও ইউরেশিয়া প্লেটের চ্যুতিরেখা বরাবর দক্ষিণ দিকে সরে গিয়েছে কাঠমান্ডু। অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিক্যাল সায়েন্স বিভাগের প্রধান স্যান্ডি স্টিসিও দাবি করেছেন, ভূকম্পের ফলে ইন্ডিয়া-ইউরেশিয়া প্লেট দুটির চ্যুতিরেখা বরাবর সব কিছুরই অবস্থানের পরিবর্তন হয়েছে। কাঠমান্ডু এই চ্যুতিরেখার উপরেই অবস্থিত। তাই আক্ষরিক ভাবেই স্থানচ্যুত হয়েছে ওই শহর।
ব্রিটেনের ডুরহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অব আর্থ সায়েন্স বিভাগের মার্ক অ্যালেন জানিয়েছেন, শনিবারের ভূমিকম্পে এই দুই প্লেটের সংযোগস্থল বরাবর ভূত্বকের উপরের দিকের পাথরগুলো দক্ষিণে সরে এসেছে, কিন্তু নীচের স্তরের পাথরগুলোর অবস্থানে পরিবর্তন হয়নি। তাই বিরাট এলাকা জুড়ে ভূপৃষ্ঠ ‘কুঁচকে গিয়েছে’ এবং সরে গিয়েছে কাঠমান্ডু। তবে শনিবার যে চ্যুতিরেখা বরাবর কম্পন তৈরি হয়, মাউন্ট এভারেস্ট তার উপরে না থাকায়, ওই পর্বত-চূড়াটির উচ্চতায় কোনও পরিবর্তন হয়নি।
উল্লেখ্য, ইন্ডিয়া ও ইউরেশিয়া প্লেটের মাঝখানে টেথিস সাগরে জমা পলি চাপ খেয়ে ভাঁজ খেয়ে যে হিমালয় পর্বত তৈরি হয়েছিল, তার গঠন প্রক্রিয়া এখনও চলছে। ফলে পর্বতগুলোর উচ্চতা খুব সামান্য হারে হলেও বাড়ছে।
পৃথিবীর ভূখণ্ড বা প্লেটগুলো যে গতিতে নড়াচড়া করছে, তার উপর ভূ-বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই নজর রেখেছেন। ভূখণ্ড সরতে থাকার ফলে বিশাল গতিশক্তি ভূত্বকের কোনও এক স্তরে দিনে দিনে জমা হয়। একটা সময় ওই স্তর আর তা ধরে রাখতে পারে না। তখন ওই জমা শক্তি প্রবল বেগে বেরিয়ে আসে এবং ভূমিকম্পের জন্ম দেয়। সরে যাওয়া ভূখণ্ডটি যত বড় হয়, তত বেশি শক্তি জমা হয় এবং কম্পনের মাত্রাও সেই অনুসারে বাড়ে।