রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড
প্রকাশ : ২২ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:৩০
বগুড়ায় মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে ক্ষমতাসীন দল ও অঙ্গসংগঠনের তিন নেতা-কর্মী খুন হইয়াছেন। খুনিদের এখনও গ্রেফতার করা সম্ভব হয় নাই। জানা যায় নাই এইসব হত্যাকাণ্ডের কারণ। ফলে জনমনে যেমন গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হইয়াছে, তেমনি উদ্বিগ্ন পুলিশ প্রশাসনও। উদ্বিগ্ন হইবারই কথা। শহর আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক সুজানুর রহমান খুন হইয়াছিলেন গত ২৯ নভেম্বর। ইহার পর তিন সপ্তাহ পার হইয়া গিয়াছে। কিন্তু অপরাধীরা এখনও ধরাছোঁয়ার বাহিরে। ইতোমধ্যে গত সোমবার হত্যা করা হয় শহর স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা খায়রুল আনামকে। মাত্র দুইদিনের ব্যবধানে গত বুধবার খুন হন যুবলীগের কর্মী শামীম হোসেন। পুলিশের ধারণা, এইসব হত্যাকাণ্ডের মূলে রহিয়াছে দলীয় কোন্দল। প্রধানত এলাকায় আধিপত্য বিস্তার এবং অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থের ভাগ-বাটোয়ারাকে কেন্দ্র করিয়াই বিরোধের সূত্রপাত বলিয়া তাহারা মনে করেন। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পুলিশ কর্মকর্তা এ প্রসঙ্গে যে মন্তব্য করিয়াছেন তাহা এইখানে প্রণিধানযোগ্য। তাহার মতে, প্রকৃত আসামীরা গ্রেফতার না হওয়ায় হত্যার ঘটনা বৃদ্ধি পাইতেছে। প্রশ্ন হইল, প্রকৃত আসামীরা গ্রেফতার হইতেছে না কেন? উক্ত পুলিশ কর্মকর্তা জানাইয়াছেন যে, আসামীদের গ্রেফতারেও সমস্যা হইতেছে। অর্থাত্ আইন তাহার স্বাভাবিক গতিতে চলিতেছে না কিংবা চলিতে পারিতেছে না। বিষয়টি অসত্য হইলে আমরা স্বস্তি বোধ করিতাম। কিন্তু এই ব্যাপারে আমাদের অভিজ্ঞতাও যে আশাব্যঞ্জক তাহা বলার অপেক্ষা রাখে না।
মৃত্যু মাত্রই দুঃখজনক। বিশেষ করিয়া এই ধরনের অপঘাত মৃত্যু কোনোভাবেই মানিয়া লওয়া যায় না। এই ক্ষেত্রে কোনো অজুহাতও গ্রহণযোগ্য নহে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হইল যে কোনো মূল্যে নাগরিকদের নিরাপত্তা বিধান করা। কোনো কারণে কোনো নাগরিকের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হইলে ইহার জন্য যে বা যাহারাই দায়ী হউক— অনতিবিলম্বে তাহাদের গ্রেফতার করিয়া বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোও তাহাদের অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। ইহাই আইনের শাসনের পূর্বশর্ত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের দেশে এই ক্ষেত্রে যে বড়ো ধরনের দুর্বলতা রহিয়া গিয়াছে তাহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধির ইহাই যে অন্যতম কারণ তাহাও অনস্বীকার্যই বলা যায়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, বগুড়ায় শুধু নহে, ইতঃপূর্বে দেশের অন্যান্য জেলায়ও অনুরূপ বেশকিছু হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হইয়াছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রকৃত অপরাধীরা থাকিয়া গিয়াছে ধরাছোঁয়ার বাহিরে। অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেফতার করিয়া আইনের আওতায় আনা গেলে এই ধরনের হত্যার প্রবণতা যে কমিত তাহাতে সন্দেহ নাই। তবে ইহাও সত্য যে, গত কয়েক দশক যাবত্ প্রতিবেশী দেশগুলিতেও রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের প্রবণতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাইতেছে। ইহার জন্য কি শুধুই রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা কিংবা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বলতাই দায়ী, নাকি অন্য কোনো কারণও আছে— তাহাও খতাইয়া দেখা জরুরি হইয়া পড়িয়াছে।
যেইভাবেই দেখা হউক না কেন, হত্যার রাজনীতির পরিণাম যে কখনই শুভ হয় না— তাহার উদাহরণ ভূরি ভূরি। এই উপমহাদেশে মহাত্মা গান্ধী, লিয়াকত আলী খান, ইন্দিরা গান্ধী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো দেশবরেণ্য নেতাকে হত্যার রাজনীতির নির্মম শিকার হইতে হইয়াছে। শ্রীলঙ্কা কিংবা নেপালের অভিজ্ঞতাও ভিন্ন নহে। ঘৃণ্য ও রক্তাক্ত এই উত্তরাধিকার হইতে পরিত্রাণ পাওয়া সহজ নহে। সফলভাবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করিতে হইলে আমাদের রাজনীতিকদের অবশ্যই আরও দায়িত্বশীল, দূরদর্শী ও সহনশীল হইতে হইবে। বিষবত্ বর্জন করিতে হইবে অসহিষ্ণুতা, হিংসা ও হানাহানির রাজনীতি। কাজটি খুবই কঠিন, কিন্তু সকলের জন্যই কল্যাণকর।