পার্বত্য চট্টগ্রামে বর্ষা আসিলেই পাহাড়ধসের যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়, তাহা উদ্বেগজনক। ২০১৭ সালের ১৩ জুন রাঙ্গামাটিতে সংঘটিত সেই ভয়াবহ পাহাড়ধসের স্মৃতি আজও আমাদের শিহরিত করে, যেইখানে পাঁচ জন সেনাসদস্যসহ প্রায় ১১৩ জন নিরীহ মানুষ এক রাত্রিতেই প্রাণ হারান। পরিতাপের বিষয় এই যে, উক্ত ঘটনার প্রায় ৯ বৎসর অতিবাহিত হইবার পরও পাহাড়ি অঞ্চলে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারী মানুষের মানসিকতা কিংবা বাস্তব পরিস্থিতির কোনো আশানুরূপ পরিবর্তন ঘটে নাই। শঙ্কার মুখেও পাহাড়ের পাদদেশে বিপজ্জনক বসতির সংখ্যা প্রতি বৎসর বৃদ্ধি পাইতেছে, যাহা আশঙ্কাজনক বটে।
গতকাল ইত্তেফাকের এক প্রতিবেদনে প্রকাশ, রাঙ্গামাটি শহরের ভেদভেদি শিমুলতলী, রূ পনগরসহ বিভিন্ন উপজেলার পাহাড়ের ঢালু অংশে অসংখ্য পরিবার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় জীবনযাপন করিতেছে। বর্ষা মৌসুমের প্রারম্ভে প্রশাসন হইতে মাইকিং করা, লিফলেট বিতরণ কিংবা আশ্রয়কেন্দ্রে যাইবার জন্য অনুরোধ করিবার এক সাময়িক তৎপরতা লক্ষ করা যায়; কিন্তু সচেতন নাগরিক সমাজের অভিযোগ—এই সকল কার্যক্রম কেবলই ‘মৌসুমকেন্দ্রিক’। বর্ষা চলিয়া গেলে প্রশাসন ও স্থানীয় অধিবাসী উভয়েই পূর্বের ন্যায় উদাসীন হইয়া পড়েন। ফলে পাহাড় কাটিয়া ঝুঁকিপূর্ণ বসতি নির্মাণের ধারা অব্যাহত রহিয়াছে। পাহাড় কাটিবার বিরুদ্ধে আমরা যতই লিখি না কেন, অনেক সময় পাহাড় কাটিবার সহিত প্রভাবশালী তথা সরকারি দলের লোকজনও জড়িত থাকেন। তাহারা যদি সরকারের নিয়ম নিজেরা না মানেন, তাহা হইলে বেসরকারি মানুষ যে পাহাড় কাটায় উৎসাহিত হইবেন না তাহা নিশ্চয়তা দিয়া বলা যায় না। তাই যাহা নিয়ম তাহাই মানিতে হইবে এবং প্রকৃতি ও পরিবেশের ক্ষতি করা যাইবে না। কেননা মানুষ প্রকৃতির সন্তান। প্রকৃতি না বাঁচিলে মানুষের বাঁচিবার আশা ক্ষীণ বলিলে অত্যুক্তি হয় না।
এইখানে দরিদ্র ও আশ্রয়হীন মানুষের বক্তব্যও তুলিয়া ধরিতে হয়। তাহা বলিতে গেলে আরো হৃদয়বিদারক। অভাবের তাড়নায় বাধ্য হইয়াই তাহারা এই চরম মৃত্যুঝুঁকি লইয়া পাহাড়ের পাদদেশে আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছে। সরকার যদি তাহাদের জন্য বিকল্প স্থায়ী পুনর্বাসনের সুব্যবস্থা না করেন, তাহা হইলে তাহারা যাইবেন কোথায়? কেবল সাময়িকভাবে আশ্রয়কেন্দ্রে সরাইয়া লইয়া এই মহাসংকট হইতে স্থায়ী মুক্তি লাভ সম্ভব নহে। অবশ্য এইখানে উল্লেখ না করিলেই নহে যে, বর্তমান রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসন পাহাড়ধসে প্রাণহানি রোধকল্পে আগাম সতর্কতামূলক কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করিয়াছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করিয়া পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া চলমান রাখিয়াছে। ইহা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। পার্বত্য অঞ্চলের ভূমির বিশেষ প্রকৃতির কারণে এই দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন প্রক্রিয়া কিছুটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার হইলেও স্থায়ী ও টিকসই পুনর্বাসনের উপর অধিক জোর দিতে হইবে।
উল্লেখ্য, গত কয়েক দশকে চট্টগ্রাম মহানগরীর প্রায় ৬০ শতাংশ পাহাড় নিশ্চিহ্ন হইয়া গিয়াছে। অথচ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) অনুযায়ী, সরকারি বা ব্যক্তিমালিকানাধীন যে কোনো পাহাড় বা টিলা কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং দণ্ডনীয় অপরাধ। তাহা হইলে স্বাভাবিক কারণে প্রশ্ন উঠিতে পারে, এইরূপ আইন থাকিয়া কী লাভ? এই আইন লঙ্ঘনের শাস্তি হইল—প্রথম বারের অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বৎসরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ২ লক্ষ টাকা জরিমানা, বা উভয় দণ্ড। দ্বিতীয় বার বা বারংবার একই অপরাধ করিলে সর্বোচ্চ ১০ বৎসরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১০ লক্ষ টাকা জরিমানা, বা উভয় দণ্ড এবং ক্ষতিপূরণ আদায়ের বিধান রহিয়াছে। ইহার পরও প্রতি বৎসর আশঙ্কাজনকভাবে পাহাড় ধ্বংস হওয়াটা মানিয়া লওয়া কঠিন।
আমরা মনে করি, কেবল বর্ষাকালের সাময়িক তৎপরতায় এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান অসম্ভব। পাহাড় কাটা কঠোরভাবে রোধ করিতে হইবে এবং উপরোক্ত পরিবেশ আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক। ইহার পাশাপাশি পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরত বাস্তুহারা মানুষকে দ্রুত ও স্থায়ী পুনর্বাসনের জন্য একটি সমন্বিত ও টিকসই মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। মানবিক বিপর্যয় এড়াইতে প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সর্বস্তরের জনগণকে সম্মিলিতভাবে ও দৃঢ়তার সহিত এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করিতে হইবে। অন্যথায়, আগামী দিনে আরো বড় কোনো ট্র্যাজেডি এড়ানো অসম্ভব হইয়া পড়িতে পারে।

