আস্থার দুধেও কেন নিরাপত্তার প্রশ্ন?

আপডেট : ১৮ জুন ২০২৬, ০৪:০৬

“খামার হইতে সরাসরি দুধ'—সাম্প্রতিক সময়ে এই ধারণাটি নগরজীবনে ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা লাভ করিয়াছে। বহু ভোক্তা বিশ্বাস করেন, খামার হইতে সরাসরি সংগৃহীত দুধ অধিকতর বিশুদ্ধ, পুষ্টিকর ও ভেজালমুক্ত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইনভিত্তিক বিপণনের বিস্তারের ফলেই মূলত এই বাজার দ্রুত গতিতে সম্প্রসারিত হইতেছে। অনেক তরুণ উদ্যোক্তাও আধুনিক দুগ্ধ খামার গড়িয়া তুলিয়া সরাসরি ভোক্তার নিকট দুধ পৌঁছাইবার উদ্যোগ গ্রহণ করিতেছেন। বাংলাদেশের দুগ্ধশিল্পের জন্য ইহা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করিতেছে; কিন্তু প্রশ্ন হইল, বিশুদ্ধতার এই প্রতিশ্রুতির অন্তরালে কোনো অদেখা স্বাস্থ্যঝুঁকি লুকাইয়া আছে কি না?
দুধ একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল খাদ্যপণ্য। সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পরিবহনের প্রতিটি ধাপে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ না করা হইলে উহা বিভিন্ন রোগজীবাণুর বাহক হইয়া উঠিতে পারে। বিশেষজ্ঞগণ দীর্ঘদিন ধরিয়া ইহা লইয়া সতর্ক করিয়া আসিতেছেন; তাহারা বলিতেছেন—অপরিশোধিত বা কাঁচা দুধে নানাবিধ জীবাণু থাকিবার ঝুঁকি থাকে । বিশেষ করিয়া শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও দুর্বল রোগপ্রতিরোধ- ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষের জন্য এই ঝুঁকি অধিকতর গুরুতর।

বাংলাদেশে এই সমস্যা আরও গভীর; ইহার কারণ, কাঁচা দুধের উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থার উপর কার্যকর নজরদারির সংস্কৃতি আমরা এখনও গড়িয়া তুলিতে পারি নাই। প্রচলিত বিধিমালা অনুযায়ী, দুধ সংগ্রহের দুই ঘণ্টার মধ্যে শীতলীকরণের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন; কিন্তু বাস্তবে বহু ক্ষেত্রে সেই নিয়ম মানা হয় না । গ্রামাঞ্চল হইতে শহরে দুধ পরিবহনের সময় প্রয়োজনীয় কোল্ড চেইন বা শীতল পরিবহন ব্যবস্থার তোয়াক্কা করা হয় না, যাহার ফলে জীবাণু বৃদ্ধির আশঙ্কা বাড়িয়া যায় । এমনকি দুঃখজনক হইলেও সত্য, কাঁচা দুধের বাজার দ্রুত বিস্তৃত হইলেও ইহা নিয়ন্ত্রণ ও মান নিশ্চিত করিবার জন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালা ও তদারকি এখনও পর্যাপ্ত নহে।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের চিত্র কী? এই বিষয়ে তাহারা কঠোর অবস্থান গ্রহণ করিয়াছে । অনেক দেশে কাঁচা দুধ বিক্রির ক্ষেত্রে বিশেষ লাইসেন্স বাধ্যতামূলক। কোথাও কোথাও সরাসরি বিক্রির অনুমতি থাকিলেও নিয়মিত পরীক্ষাগারভিত্তিক মান যাচাই, পশুর স্বাস্থ্যপরীক্ষা এবং শীতলীকরণ ব্যবস্থার কঠোর অনুসরণ নিশ্চিত করা হয়। কিছু দেশ আবার জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকির কথা বিবেচনা করিয়া কাঁচা দুধের খুচরা বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ রাখিয়াছে। অর্থাৎ, ভোক্তার পছন্দের স্বাধীনতা নিশ্চিত করিবার পাশাপাশি খাদ্যনিরাপত্তার প্রশ্নে তাহারা কোনো আপসই করেন না।

বাংলাদেশেও এই ধরনের ভারসাম্য রক্ষা করা প্রয়োজন। দুগ্ধশিল্পের এই সম্ভাবনাময় যাত্রাকে স্বাস্থ্যঝুঁকির অন্ধকারে হারাইতে দেওয়া চলিবে না; আর সেই জন্য প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা, যেইখানে খামারের গাভি হইতে শুরু করিয়া ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ নিরাপত্তার বলয়ে আবদ্ধ থাকিবে । বিজ্ঞানসম্মত সংরক্ষণ, নিরবচ্ছিন্ন শীতলীকরণ, কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত তদারকি—এই চার স্তম্ভের উপরই গড়িয়া উঠিতে পারে একটি আধুনিক দুগ্ধব্যবস্থা। ইহার পাশাপাশি জনগণকে নিরাপদ খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে সচেতন করাও জরুরি। আস্থার সহিত যদি নিরাপত্তা যুক্ত না হয়, তাহা হইলে বিশুদ্ধতার প্রতিশ্রুতিও একসময় প্রশ্নের মুখে পড়িতে বাধ্য—ইহা সর্বজনস্বীকৃত ভবিতব্য।

বাংলাদেশের দুগ্ধশিল্প মূলত এখনও সম্ভাবনার পর্যায়ে রহিয়াছে। দেশে দুধ উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাইলেও চাহিদা ও যোগানের ব্যবধান পুরোপুরি দূর হয় নাই। সাম্প্রতিক সরকারি ও খাতসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, দেশে বার্ষিক দুধ উৎপাদন প্রায় ১ কোটি ৪০ লক্ষ হইতে ১ কোটি ৫০ লক্ষ মেট্রিক টনের ঘরে পৌঁছাইয়াছে। তবে জনসংখ্যা ও পুষ্টিচাহিদা বিবেচনায় মোট প্রয়োজন ইহার চাইতেও অধিক । ফলে দেশে এখনও দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের একটি অংশ আমদানিনির্ভর—বিশেষত গুঁড়া দুধের ক্ষেত্রে। ঠিক এমন একটি বাস্তবতায় আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তিনির্ভর সংগ্রহ ও নিরাপদ বিপণন ব্যবস্থা গড়িয়া তুলিতে পারিলে দেশীয় দুগ্ধশিল্প কেবল অভ্যন্তরীণ চাহিদাই পূরণ করিবে না, বরং গ্রামীণ অর্থনীতি ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য একটি শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির খাত হইয়া উঠিবে। তবে ইহাও মনে রাখিতে হইবে — সম্ভাবনার এই যাত্রা টিকসই হইবে কেবল তখনই, যখন বিশুদ্ধতার দাবির সহিত যুক্ত হইবে নিরাপত্তার নিশ্চয়তাও। এইখানে আস্থার পরিবেশ নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি বিজ্ঞানভিত্তিক মান নিয়ন্ত্রণ। কারণ, খাদ্যের ক্ষেত্রে কেবল বিশুদ্ধতার প্রতিশ্রুতিই যথেষ্ট নহে; ইহার পাশাপাশি জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিও রাখিতে হইবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারে ।

ইত্তেফাক/এনএন