অশান্ত আফগানিস্তান

তালেবানের শক্তিবৃদ্ধির অশনি সংকেত

২০১২ সালটি আফগাস্তািনের তালেবানদের জন্য বেশ আগ্রাসী একটি বছর। বছর শেষে তাই আফগান-ভূমির ওপর প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধির তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতেই পারেন তালেবানরা। মাত্র এক দশকের ব্যবধানের পর এখন তারা অপেক্ষায় আর মাত্র একটি বছরের। কারণ ঘোষণা মতো ২০১৪ সালেই আফগানিস্তান ছেড়ে যাবে ন্যাটো বাহিনী। তারপর? তারপরের হিসেব নিয়ে দেশটির সর্বত্রই সাধারণ মানুষের মুখে চিন্তার বলিরেখা। কী হবে এক বছর পর? ২০১৪-তে ন্যাটো বাহিনী চলে যাওয়ার পর দেশে আইনের শাসন বলতে থাকবে আদৌ কিছু? ফিরে যাবে কি এক দশক আগের পরিস্থিতিতে? প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই ক্ষীণকণ্ঠে সেনাবাহিনীর ওপর ভরসা রাখতে বলেছেন। দেশের সর্বত্রই বন্দুক কেনাবেচার হিড়িক পড়ে গেছে। স্বয়ংক্রিয় রাইফেল ছাড়াও বিভিন্ন এলাকায় মিলিশিয়া রকেট লঞ্চার ও সাব মেশিনগান কিনতেও উঠে পড়ে লেগেছে। উদ্দেশ্য পরিষ্কার, নিজেদের আত্মরক্ষার নিশ্চয়তা নিজেরাই করতে চাচ্ছে সাধারণ আফগানরা। ২০১২-তে অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে তাতে কোনো জায়গায় আঘাত হানা কট্টরপন্থিদের কাছে বাঁ হাতের খেলা। চলতি বছরেই আফগান প্রশাসনের অন্তত পাঁচ জন মন্ত্রী বা দুঁদে আমলার মৃত্যু হয়েছে তালেবান হামলায়। সাবেক এক তালেবান সদস্য দল ছেড়ে সমাজকল্যাণমূলক কাজে যোগ দিয়েছিলেন। খুন হয়েছেন তিনিও। ন্যাটো থাকতেই এই অবস্থা, চলে গেলে যে পরিস্থিতি আরও সঙ্গীন হবে তা বুঝতে যে বেশি পরিশ্রম করতে হচ্ছে না পাঠানদের তা বলাই বাহুল্য। তাই প্রশাসনের ওপর বেশি ভরসা না করে নিজেদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিজেরাই করে নিতে শুরু করেছেন তারা। আঞ্চলিক জঙ্গি নেতারা তো বটেই, অতীতে যারা হাতে অস্ত্র নিয়েছিলেন তারাও ফিরতে শুরু করেছেন নিজেদের পরিচিত পথেই। বন্দুক বেচেই বহু টাকা আয় করা যাচ্ছে কাবুলে। আফগানিস্তানের গত দু’হাজার বছরের ইতিহাস তাদের অপেক্ষা করতেই শিখিয়েছে। তারা জানেন, ‘বিদেশিদের’ দল আসে, আবার চলেও যায়। থেকে যান কেবলমাত্র তারাই। তাই, কাবুল শেষ পর্যন্ত থেকে যায়, পশতুন, তাজিক, হাজারা, উজবেক, আইমাক, তুর্কমেন, বালোচ, পাশায়ি, নুরিস্তানি, পামিরির মতো চোদ্দ-পনেরো রকম জাতির হাতেই। ২০০১ সালের লড়াইও তার ব্যতিক্রম নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তত্কালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ হয়তো ভেবেছিলেন, তাদের অভিভাবকত্বে ক্রমশ ‘স্বাভাবিক’ হয়ে উঠবে আফগানিস্তান। দেশ থেকে বিদায় নেবে তালেবানরা। কিন্তু হিন্দুকুশের কন্দরে বসে থাকা তালেবানরা তো বটেই আপাতভাবে নিরীহ পাঠানরাও সে দিন হয়তো মুচকি হেসেছিলেন। তারা জানতেন, আফগানিস্তান ফিরে যাবে চেনা পথেই, মাঝে শুধু কয়েক বছরের অপেক্ষা। এক দশক পার করার পর আজ হয়তো মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও এমন কথাই ভাবছেন। দশ বছর আর কয়েকশো কোটি মার্কিন ডলার খরচ করার পরও আফগানিস্তানকে ‘পথে আনবার’ পশ্চিমা প্রয়াস শুকিয়ে গেল চরমভাবাপন্ন আবহাওয়াতেই। বিগত কয়েক বছরের হামলা বৃদ্ধির পরিসংখ্যানে স্পষ্টতই শক্তিবৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে তালেবানরা। ২০১২ সালে তালেবানদের হামলা সবচেয়ে বেশি জোরদার হয়। আফগানিস্তানের জালালাবাদের বিমানবন্দর ও সংলগ্ন সেনাছাউনিতেই এ বছর তিন বার হামলা চালিয়েছে তালেবানরা। জালালাবাদ সেনাছাউনিতে এ বছর ২৭ ফেব্রুয়ারির হামলায় ছয় আফগান নাগরিক, দুই নিরাপত্তারক্ষী এবং এক পাঠান সেনা প্রাণ হারায়। দেড় মাস পর ১৫ এপ্রিল ফের একই জায়গায় হামলা চালানো হয়। তবে সে বার কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। কয়েক মাস শান্ত থাকার পর ফের খবরের শিরোনামে জালালাবাদ। ২ ডিসেম্বরের আত্মঘাতী হানায় একজন আফগান নিরাপত্তারক্ষীরও মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আগের বছরগুলোর দিকে তাকালে তালেবানদের এই আগ্রাসী হামলার চিত্র ফুটে ওঠে। ২০০৭ সালে দু’টি বিচ্ছিন্ন ঘটনায় মারা যায় দুই ন্যাটো সৈন্য। ২০০৮ সালে দু’টি হামলা চালানো হয় মারা যায় দুই মার্কিন সেনা। ২০০৯-এ হামলার সংখ্যা বেড়ে ছয়, মৃতের সংখ্যা ১০। ২০১০ সালে ছ’টি আক্রমণ হানা হয়, নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২০-এ দাঁড়ায়। ২০১১ সালে মোট ২১টি হামলা চালায় তালেবান, হত ৩৫ সৈন্য। আর ২০১২ সালে মোট ৩৬টি আক্রমণে নিহত ৫১ জন। তাই গত পাঁচ বছরের এক পরিসংখ্যান চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় পাঠানভূমিতে কী ভাবে ক্রমশই বেড়ে চলেছে তালেবান আস্ফাালন। ইতিমধ্যেই গ্রামে গ্রামে গিয়ে তালেবান নেতারা হুমকি দিয়ে আসছেন, ‘ফিরে যাচ্ছে বিদেশিরা, থাকব আমরাই।’ ন্যাটো বাহিনীর আড়ালে থেকেও দেশের সর্বত্র আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই। দেশের চার কোণে পড়ে থাকা কাবুল, মাজার-ই-শরিফ, হিরাট আর কান্দাহারে সরকারি ফরমান চলে ঠিকই, কিন্তু দেশের বাকি অংশে? সেখানে আজও চলে তালেবান ফতোয়া। মানুষ মুখ বুজে মেনেও নিয়েছেন। প্রতিবাদ করেননি। সরকারি নিয়মে অপরাধ প্রমাণ করতেই বছর ঘুরে যায়। শাস্তি তো দূরের কথা। কিন্তু তালেবান আদালতে, সামান্য অপরাধেও মৃত্যুদণ্ড। তা-ও মাত্র কয়েক মিনিটের বিচারে। খুশি সাধারণ মানুষ, খুশি তালেবানও। অজগ্র জাতি-উপজাতিতে বিভক্ত আফগানিস্তানের সমাজনীতিও স্থান-কাল ও পাত্রভেদে নিয়ন্ত্রিত হয়। তাই ‘পশতুন তালিব’, ‘তাজিক তালিব’—ইত্যাদিও ইদানীং কালে দেখা যাচ্ছে আফগানিস্তানের মাটিতে। বিগত বছরগুলোর মতো আফগানিস্তানে ২০১২ সালেও ভয়াবহ হারে বেড়েছে আফিমের চাষ। বলাই বাহুল্য এর সঙ্গে রয়েছে তালিবানের প্রত্যক্ষ মদত। দক্ষিণ-পশ্চিম আফগানিস্তানের হেলমান্দ প্রদেশে আফিম গাছের সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গেছে। কয়েক দশকের যুদ্ধে গুঁড়িয়ে যাওয়া আফগান অর্থনীতির সমান্তরাল যে অর্থনীতি গড়ে তুলেছে তালেবান, তার ভিত্তিই হল আফিম গাছ। ইতিহাসের দিকে এ নজর তাকালে দেখতে পাই, তালেবানদের এ আন্দোলন হলো সুন্নি ইসলামী এবং পশতুন জাতীয়তাবাদী আন্দোলন। পশতুন আন্দোলন থেকেই মূলত তালেবান আন্দোলনের সূত্রপাত। ১৯৯৪ সালে আফগানিস্তানে তারা প্রসিদ্ধি লাভ করে। তালেবানরা ক্ষমতায় গেলে পাকিস্তানের পশতুন এবং আফগানিস্তানে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা এবং শরীয়াহ তথা ইসলামী আইন অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করার অঙ্গীকার করে। তারা ইসলামী বিচার ব্যবস্থার কথা বলে জনসমর্থন আদায়ে সমর্থ হয়। শুধু তাই নয়, তারা সাধারণ মানুষকে ইসলামী শরীয়াহ প্রতিপালন এবং নারীদের জন্য বোরকা পরিধান বাধ্যতামূলক করে। একইভাবে তালেবানরা টেলিভিশন, গান, সিনেমা ইত্যাদি বন্ধ করে দেয় এবং আট বছর বয়স থেকে মেয়েদের স্কুলে যাওয়া নিষিদ্ধ করে। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্তপাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে আফগানিস্তানে তালেবানরা ক্ষমতাসীন থাকার সময়ে মাত্র তিনটি দেশ তাদেরকে স্বীকৃত দিয়েছিল। দেশ তিনটি হলো—পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত। তবে সেসময় মানবাধিকার লংঘনের জন্য আফগানিস্তান জাতিসংঘের স্বীকৃতি হারিয়েছিল এবং ইরান, ভারত, তুরস্ক, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্য এশিয়ার অধিকাংশ দেশ তালেবান শাসনের বিরোধিতা করেছিল এবং তালেবান-বিরোধী আফগান নর্দার্ন অ্যালায়েন্সকে সাহায্য করেছিল। ক্ষমতায় থাকার সময় তালেবানরা এযাবত্কালের সবচেয়ে কট্টোর মুসলিম শরিয়াহ্ ভিত্তিক শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল। নারীদের প্রতি বিরূপ আচরণের জন্য তারা আন্তর্জাতিক মহলে নিন্দিতও হয়েছিল। নারীদের শুধু বোরকা পরতেই বাধ্য করা হতো না, আট বছর বয়সের পর তাদেরকে চাকরি বা শিক্ষা লাভ করার পথ বন্ধ করে দেয়া হতো। ২০০১ সালে ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পর ৭ অক্টোবর মার্কিন নেতৃত্বাধীন যৌথবাহিনী আফগানিস্তানে আগ্রাসন চালায় এবং একই বছরের ডিসেম্বরে তালেবান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে। সেসময় তাদের নেতা মোল্লা মোহাম্মদ ওমর ও সিনিয়র তালেবান নেতারা এবং ওসামা বিন লাদেন ও তার আল-কায়েদা সহযোগীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আত্মগোপন করে। ন্যাটোর অন্যতম শরিক ব্রিটিশদের উপলব্ধি হলো— ‘কাবুল তোমার দখলে, তাই আফগানিস্তানও তোমার দখলে— এমনটা মোটেও নয়। তবে কাবুলকে হাতে না রেখে আফগানিস্তানে আধিপত্য কায়েম কখনওই সম্ভব নয়।’ দেড়শো বছর আগে এই পাঠানভূমিরই শুকনো মাটি ব্রিটিশ রক্তে ভিজেছে বহু বার। রক্ত দিয়েই চরম সত্য উপলব্ধি করেছে তারা। আফগানিস্তান যেন কোনো দেশ নয়, একটা অঞ্চল! বিদেশিদের এখানে প্রবেশ নিষেধ। বেড়াতে যান, পাঠানদের মতো অতিথিপরায়ণ কেউ নেই। কিন্তু শাসন করতে যান, খবর হয়ে যাবে। যাঁরা শাসন করতে গেছেন, যাঁরা গিলেছেন, তাঁরা হজম করতে পারেননি। পাঠানরা শুধু অপেক্ষা করে গেছেন ‘সুসময়ের’। ইংরেজদের চেয়ে ভালো তা আর কে-ই বা জানে? ১৮৪২-এর জানুয়ারিতে কাবুল ছেড়ে বেরিয়েছিলেন ১৬ হাজার ইংরেজ। মাত্র ৯০ কিলোমিটার দূরের জালালাবাদ শহরে পৌঁছতে পেরেছিলেন মাত্র একজন। ন্যাটো বাহিনীর কপালেও তেমন কিছুই অপেক্ষা করে নেই তো? আফগানিস্তানের ইতিহাস যে উপদেশ দেয়, তা মন দিয়ে শুনলে হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকশো কোটি মার্কিন ডলার আর সঙ্গে বেশকিছু তরতাজা প্রাণ বেঁচে যেতে পারত। ২০১২ সালে তালেবানদের কর্মকাণ্ডে সেই দূরদৃশ্য আরো স্পষ্ট হয়েছে মাত্র।