পানামা খাল সংস্কার হচ্ছে
প্রকাশ : ১৩ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:২৭
প্রায় শতবছর আগে ১৯১৪ সালে মানব ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকল্পটি বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছিলো তা হচ্ছে পানামা খাল। সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিলো এ খালটি। খালটি খুলে দেয়ার ৩৪ বছর পর এর সংস্কার কাজ ছিলো আরো ব্যয়বহুল। সে সময়ের সাড়ে ৩৭ কোটি মার্কিন ডলার খরচ করে (বর্তমানে ৮ বিলিয়ন ডলার) খালটি সংস্কার করা হয়। ঠিক একশ’ বছর পর অর্থাত্ ২০১৪ সালে পানামা খালের সবচেয়ে বড় সংস্কার প্রকল্পটির কাজ শেষ হবে। এতদিন এ খাল দিয়ে ছোট এবং মাঝারি আকারের জাহাজ যাতায়াত করলেও ২০১৪ সালের পরে এ খাল দিয়ে বৃহত্ আকারের জাহাজগুলো চলাচল করতে পারবে। পানামা খাল দিয়ে বড় পণ্যবাহী জাহাজগুলো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে থেকে কম সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বন্দরগুলোতে নিয়ে যাবার জন্য পানামা সরকার এ খালের সংস্কার করছে। এতে পানামা সরকারের লাভ হলেও এ প্রকল্পের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হবে যুক্তরাষ্ট্র। তবে মার্কিন সরকারকে তার বন্দরগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে পূর্ব উপকূলীয় বন্দরগুলোতে বর্তমানে যে দূরবস্থা তা কাটিয়ে উঠার লক্ষ্যে ওবামা প্রশাসন ইতিমধ্যেই বন্দর কর্তৃপক্ষের সাথে বৈঠক করেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বন্দরের উন্নয়ন কাজে কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থ খরচের বিষয়টি আমলে নিচ্ছেন বিভিন্ন রাজ্যের গভর্নররা। যেমন সাউথ ক্যারোলিনার গভর্নর নিক্কি হেলি বলেছেন, বন্দরের উন্নয়ন কাজে আমরা অর্থ ব্যয় করতে পারি। কিন্তু এ লক্ষ্যে ওয়াশিংটনের কোন গাইডলাইন নেই। হয়তো বিনিয়োগের অর্থ আমরা তুলতে পারবো। কিন্তু ওয়াশিংটন বন্দরের উন্নয়নের কার্যক্রমে চুপ থাকতে পারে না। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পোর্ট অথরিটি ইতিমধ্যে তাদের বন্দরগুলোর উন্নয়ন কাজ শুরু করার বিষয়ে একমত পোষণ করেছে। তাদের মতে, আমরা যদি দেরিতে শুরু করি তাহলে পানামা খালের সুফল অন্য দেশগুলো যেমন মেক্সিকো, ক্যারাবিয়ান ও কানাডা নিয়ে নিতে পারে। তখন দেখা যাবে যুক্তরাষ্ট্রের শিপিং লাইনগুলো ওইসব দেশের বন্দরগুলোতে ভিড়ে থাকা মাদার ভেসেল থেকে ছোট ছোট জাহাজে পণ্য নিজ দেশের বন্দরে নিয়ে আসছে। কারণ আশপাশের প্রতিযোগী দেশগুলো ইতিমধ্যে তাদের বন্দরগুলোর সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়েছে।
ভৌগোলিক বিচারে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য রপ্তানি এবং আমদানির ক্ষেত্রে আটলান্টিক এবং প্রশান্ত মহাসাগরের দূরত্ব কমানোর জন্য পানামা খাল যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সমস্ত পণ্যবাহী জাহাজকে এখন আফ্রিকা অঞ্চল দিয়ে ঘুরে যেতে হয়। এতে সময় যেমন বেশি লাগে, সাথে সাথে সমুদ্রপথের নিরাপত্তার জন্যও এটা হুমকি। তবে পানামা খাল দিয়ে নিয়ে আসা বড় বড় জাহাজগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পোর্ট অথরিটি সঠিকভাবে হ্যান্ডল করতে পারবে কিনা তা নিয়েও মতভেদ আছে। অনেকের মতে, পূর্ব উপকূলীয় বন্দরগুলো এখনিই ছোট ছোট জাহাজগুলো হ্যান্ডল করতে হিমশিম খাচ্ছে। কারণ বন্দরগুলোতে অবকাঠামো সুবিধা সেই পুরোনো আমলের। এছাড়া অনেক বন্দরের আয়তন বাড়ানো এখন কোন অবস্থাতেই সম্ভব নয়। আবার কেউ কেউ বলছে, পানামা খাল সংস্কারের পরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের শিপিং রুট আকাশ পাতাল বদলে দেবে। বন্দরের গভীরতা বাড়িয়ে বড় জাহাজগুলো নিয়ে আসা যাবে সত্যি, কিন্তু পণ্য খালাসে যে বিড়ম্বনার সৃষ্টি হবে তাতে লাভের চেয়ে ক্ষতি হবে বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রের বন্দর বাল্টিমোর, চার্লসটন, হিউস্টন, জ্যাকসনভিল, মায়ামিসহ অন্য কয়েকটি বন্দর ইতিমধ্যে পানামা খাল দিয়ে আসা বড় আকারের জাহাজ নোঙর করার জন্য কাজ শুরু করেছে। মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রকৌশল দল এরই মধ্যে ১৭টি বন্দরের প্রকল্প গ্রহণ করে তার সম্ভাবতা যাচাই করছে। নিউইয়র্ক এবং নিউজার্সি বন্দরে বড় আকারের জাহাজ ভিড়তে পারলেও একটি জায়গায় সমস্যা আছে। নিউইয়র্ক বন্দরে যাবার পথে বে-ওয়ান ব্রিজ বড় বড় জাহাজগুলোকে আটকে দেবে। ব্রিজটি নিচু হওয়ায় বড় জাহাজ পারাপারে সমস্যা হবে। এজন্য কর্তৃপক্ষ এক বিলিয়ন ডলার খরচ করে সেখানে উঁচু ব্রিজ নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে এখন আলোচনার বিষয়বস্তু দাঁড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের বাজেটের ওপর। অনেক বন্দর কর্তৃপক্ষ মনে করছে, কেন্দ্রীয় সরকারের বাজেট ছাড়া এতবড় প্রকল্প বাস্তবায়ন একবারেই সম্ভব নয়। বন্দর সংশ্লিষ্টরাও মনে করেন, বন্দরের উন্নয়ন কাজ শুরু করলে তা কবে নাগাদ শেষ হবে তা নিয়েও মতবিরোধ চলতে থাকবে। কারণ কয়েকটি বন্দরের আধুনিকায়নের জন্য স্টাডি করতেই ১৫ বছর কেটে গেছে। মেরিল্যান্ড পোর্ট অথরিটির নির্বাহী পরিচালক জেমস হোয়াইট বলেন, প্রকল্পগুলোর অনুমোদন পেতে এত সময় ব্যয় হয় যে, অনেক সময় তা বিরক্তিকর হয়ে উঠে। পরিস্থিতি এমন যে, আমরা রীতিমত কাদা মাড়িয়ে চলছি। আবার কারো কারো মতে, পানামা খাল সংস্কারের কাজ ঠিক সময়ে শেষ হচ্ছে কিনা তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকারের সন্দেহ আছে। কারণ এতবড় প্রকল্প শেষ করতে হয়তো আরো কিছুটা সময় নেবে পানামা সরকার।
এদিকে পানামা খালের সংস্কার প্রকল্প যথাসময়ে শেষ হোক বা না হোক তা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বন্দরগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সেখানকার শিপিং কোম্পানিগুলো। তাদের মতে, বন্দরকেন্দ্রিক একটি প্রকল্প যুক্তরাষ্ট্রে কত শম্ভুক গতিতে চলে তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে জ্যাকসনভ্যালি বন্দর। এ বন্দরটির গভীরতা ৩৮ ফুট থেকে ৪০ ফুট বাড়াতে সময় লেগেছিলো ১৫ বছর। এখন যদি বন্দরটির গভীরতা ৫০ ফুটে উন্নীত করতে হয় তাহলে সে কাজ শেষ হবে ২০১৮ সালে। তবে সরকারি অর্থে হোক বা বেসরকারি অর্থে হোক যুক্তরাষ্ট্রের বন্দরগুলো উন্নয়নের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে সেখানকার পোর্ট অথরিটি। বিশেষ করে পানামা খাল সংস্কার প্রকল্পের কাজ শেষ হয়ে গেলে যুক্তরাষ্ট্র যদি তার সুবিধা নিতে না পারে তাহলে প্রতিবেশীরা এ সুযোগ গ্রহণ করবে। তখন যুক্তরাষ্ট্রের শিপিং কোম্পানিগুলো ছোট ছোট জাহাজে করে সেসব দেশ থেকে পণ্য নিয়ে আসবে। মাদার ভেসেলের ব্যবসা চলে যাবে প্রতিবেশী দেশের হাতে আর ফিডার ভেসেলের ব্যবসা যাবে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে।
পানামা খালের সংস্কারের বিষয়টি মাথায় আসে ২০০৬ সালে। দেশটির সরকার এতবড় প্রকল্পটিকে পাশ করানোর জন্য গণভোটের আয়োজন করে। বর্তমান অবস্থা থেকে খালটির উন্নয়নে এর প্রশস্ততা বাড়ানো ছাড়াও এর গভীরতা বাড়ানো হচ্ছে। বর্তমানে এ খাল দিয়ে চার হাজার আটশ’ টিউজ পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করতে পারে। খালটি সংস্কার হলে তা দিয়ে একটি জাহাজ ১২ হাজার টিউজ সমপরিমাণ পণ্য বহন করতে পারবে। এছাড়া এখন যে আকারের জাহাজ এ খাল দিয়ে চলাচল করে সংস্কার করা হলে তার চেয়ে ২৫ শতাংশ লম্বা এবং ৫০ শতাংশ বেশি চওড়া জাহাজ চলাচল করতে পারবে। খালের বর্তমান গভীরতা প্রায় ৪০ ফুট। আর সংস্কার করা হলে তা দাঁড়াবে ৫০ ফুটে। খালটি সংস্কারে সরকারের ব্যয় হবে ৬ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অর্থ দেবে দাতারা।