রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ
প্রকাশ : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:৩৪
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত নিয়োগ অতীতের ন্যায় পুনরায় সংবাদের বিষয়বস্তু হইয়াছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসনের সময়কালে চার বত্সরে বিভিন্ন বিভাগে ২০০ পদের বিজ্ঞাপন দিয়া প্রায় ৩৫০ জন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হইয়াছে। আর তৃতীয় শ্রেণীর ১৪৫টি পদের বিপরীতে ১৮৪ জনকে নিয়োগ দেওয়া হইয়াছে। বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়েও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এক দিনে ৫৪৪ কর্মচারী নিয়োগের ঘটনা ঘটিয়াছিল। সেই কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেন ও ঘুষের বিষয়টিও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হইয়াছিল। বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কোনো বিভাগে প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত এক-দুইজন শিক্ষক নিয়োগ হইবার ঘটনা হঠাত্ হঠাত্ ঘটিতে দেখা গিয়াছে। কিন্তু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিরিক্ত নিয়োগই নিয়ম হইয়া দাঁড়াইয়াছে। যেমন গত বুধবারের সিন্ডিকেটে বাংলা এবং নাট্যকলা ও সংগীত বিভাগে ছয়টি প্রভাষক পদের বিপরীতে নিয়োগ দেয়া হইয়াছে ১০জনকে।
বহিঃস্থ রাজনৈতিক চাপ, প্রভাবশালী শিক্ষকদের নিজেদের লোক নিয়োগের চাপ, কিংবা ব্যক্তিগত আত্মীয়তা বা সম্পর্কের দায় হইতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এইসব নিয়োগ হইয়া থাকে। অনেক ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনও মুখ্য হইয়া ওঠে। আবার অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনাও ন্যায্যতা অনুযায়ী ঘটে না। যেমন প্রতিশ্রুত হইবার পরও ছাত্রশিবিরের হামলায় নিহত ছাত্র ফারুকের বোনের চাকুরি হয় নাই। মুশকিল হইলো এইসকল অতিরিক্ত নিয়োগ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটে ঘাটতি তৈরি করে। যেই ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের খাতা দেখাসহ অন্যান্য বিল ঠিকমতো পরিশোধ করিতে পারে না, এইসকল অতিরিক্ত নিয়োগের বেতনাদি পরিশোধ করিতে গিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট ঘাটতি সমপ্রতি ৫৫ কোটি টাকায় পৌঁছাইয়াছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিরিক্ত নিয়োগের ঘটনা বারংবার ঘটিবার কারণ হইলো, রাজশাহী অঞ্চলে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি সবচাইতে আকর্ষণীয় চাকরি হিসাবে পরিচিত। সরকারি-বেসরকারি শিল্প-বাণিজ্যের অন্যান্য খাত তেমন বিকশিত না হইবার কারণে বেকার যুবকদের অন্যতম লক্ষ্য হইয়া থাকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির একটি চাকুরি। আর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা রাজশাহী অঞ্চলে খুবই সম্মানজনক পেশা, রাজশাহী নগরে তাহারাই শীর্ষ নাগরিক হিসাবে বিবেচিত হন। ফলে সর্বমহল হইতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকুরির একটি অব্যাহত চাপ মোকাবিলা করিতে হয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে। কিন্তু ভাবনার বিষয় হইলো বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানচর্চার স্থান, দেশের জন্য মানবসম্পদ তৈরি তাহার দায়িত্ব—বেকারত্ব দূরীকরণের দায়িত্ব তাহার নহে। ফলে অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ দিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ঘাটতি সৃষ্টি করা কিছুতেই মানিয়া লওয়া যায় না। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত জনবল নিয়োগের এই সংস্কৃতি হইতে বাহির হইয়া আসিতে হইবে। পাশাপাশি রাজশাহীর ন্যায় অন্যান্য অপেক্ষাকৃত ছোট নগরে কর্মক্ষেত্রের সুযোগ সৃষ্টি করিতে হইবে। যদিও এই উদ্যোগ সরকারের সুদূরপ্রসারী এক দায়িত্ব, তথাপি পরিকল্পনার মধ্যে ইহাকে অন্তর্ভুক্ত করিতে হইবে স্বাভাবিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে। নয়তো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে অকারণ ও অপ্রয়োজনীয় নিয়োগের হার বাড়িতেই থাকিবে।