নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি প্রথম রণতরী উদ্বোধন
সামরিক শক্তিতে এক ধাপ এগিয়ে গেল ভারত
প্রকাশ : ১৮ আগস্ট ২০১৩, ২০:২৮
ভারত প্রথমবারের মতো নিজস্ব প্রযুক্তিতে বিমানবাহী রণতরী তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে দেশটি বিশ্বের প্রভাবশালী হাতেগোনা কয়েকটি দেশের কাতারে স্থান করে নিল যারা নিজেরাই এই রণতরী তৈরি করেছে। বিশ্বের অন্যতম বাণিজ্য এবং অর্থনীতির অন্যতম কেন্দ্র ভারত মহাসাগরে এটি মোতায়েন করা হবে। দেশটি সামরিক দিক থেকে চীনের চেয়ে একধাপ এগিয়ে গেল মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকরা। তবে চীনের চেয়ে ভারত যে অনেক পিছিয়ে আছে সেটিও স্বীকার করেছেন বিশ্লেষকরা।
বিশ্বে যে কয়টি দেশ এই আকারের বিমানবাহী রণতরী নির্মাণে সক্ষম সেগুলো হলো: যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স। ‘আইএনএস বিক্রান্ত’ নামের নিজস্ব পদ্ধতিতে তৈরি বিমানবাহী রণতরী ২৬০ মিটার লম্বা ও ৬০ মিটার চওড়া। যুদ্ধ-জাহাজটির গতিবেগ প্রতি ঘন্টায় ৫৬ কিলোমিটার। একসঙ্গে ৩০টি যুদ্ধবিমান বহনে সক্ষম ‘আইএনএস বিক্রান্ত’ সম্পূর্ণ ভারতীয় প্রযুক্তিতে তৈরি করা হয়েছে। প্রযুক্তির উন্নতি সংক্রান্ত কিছু কাজ এখনও বাকি থাকায় উদ্বোধনের পর নোঙর করা হয় যুদ্ধ-জাহাজটিকে। বিক্রান্তের ডেকের আকার দু’টি ফুটবল মাঠের সমান। এর পাওয়ার ইউনিট এতটাই শক্তিশালী যে এর মাধ্যমে গোটা কোচি শহরের বিদ্যুত্ সরবরাহ করা যাবে। জাহাজটির বাইরের অংশের কিছু কাজ এখনও বাকি রয়েছে।
২০১৬ সালে রণতরীটি পরীক্ষামূলকভাবে চালানো হবে। ২০১৮ সালের শেষদিকে নৌবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হবে বিক্রান্ত। ‘আইএনএস বিক্রান্ত’ থেকে মিগ-২৯-কে, হালকা যুদ্ধবিমান ও কামভ ৩১ বিমান উড্ডয়ন করতে পারবে। পাশাপাশি এ জাহাজ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র উেক্ষপণ করা যাবে। এর নকশা প্রণয়নে সাত থেকে আট বছর সময় লেগেছে। এর কাঠামো, নকশা এবং যন্ত্রপাতির অনেকগুলো ভারতের নিজস্ব তৈরি। তবে এর বেশিরভাগ জিনিসই আমদানি করা। এর প্রচালন পদ্ধতি যুক্তরাষ্ট্র থেকে সংগ্রহ করা। অবসরপ্রাপ্ত এডমিরালকে রাজা মেনন বলেন, এটি স্থলে হামলার জন্য ব্যবহার করা হবে না। নৌবাাহিনীর পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলবে এর মাধ্যমে। নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত অফিসার সি উদয় ভস্কর দাবি করেন, এটা ভারতের নৌবাহিনীর ক্ষমতার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণ করবে। কিন্তু এটা চীনের সঙ্গে ক্ষমতার ভারসাম্য ফিরিয়ে আনবে না।
গত ১২ আগস্ট উদ্বোধন করেন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী একে অ্যান্টনির সহধর্মিণী এলিজাবেথ। ‘বিক্রান্ত’ অর্থ সাহস। সাড়ে সাঁইত্রিশ হাজার টন ওজনের জাহাজটি তৈরি করেছে কোচিন শিপইয়ার্ড লিমিটেড। সম্পূর্ণ কাজ শেষে এর ওজন গিয়ে দাঁড়াবে চল্লিশ হাজার টনে। কার্যত রণতরীটির প্রথম পর্বের নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। এরপর এটি বিভিন্ন উপকরণ সংযোজন ও পরিকাঠামো নির্মাণের জন্য ফের ডকে ভেড়ানো হয়েছে। রাশিয়া থেকে বিশেষ ধরনের স্টিল আমদানি করতে গিয়ে বিক্রান্তের বানানো দু’বছর পিছিয়ে যায়। গাড়ি দুর্ঘটনায় একটি ডিজেল জেনারেটর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাঁচ বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্প কিছুটা হলেও চীনকে প্রভাবিত করবে। ভারতের ২৮ হাজার টনের ‘বিরাট’ নামের একটি রণতরী আছে যা ৬০ বছরের পুরোনো এবং ১৯৮৭ সালে এটি ব্রিটেন থেকে ক্রয় করা হয়। এই বছর ভারতের মিত্র রাশিয়া তৃতীয় রণতরী হস্তান্তর করা হবে যা ‘আইএনএস বিক্রমাদিত্য’ নাম রাখা হয়েছে।
নৌবাহিনীর উপ-প্রধান ভাইস অ্যাডমিরাল আর কে ধোওয়ান বলেন, এই রণতরীর উদ্বোধন ভারতীয় নৌবাহিনীর দেশীয়করণ কর্মসূচির ‘চূড়ান্ত সাফল্য’। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ রাহুল বেদি জানান, বিশ্বের বাণিজ্য এবং অর্থনীতির অন্যতম কেন্দ্র ভারত মহাসাগরে এই যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করা হবে। ভারতের এই রণতরী নিয়ে চীনের মাথাব্যথা থাকতে পারে। ভারতের এই ক্ষমতা অর্জন দেশটির কূটনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি বলেন, ভারতে বর্তমানে ৩৭টি জাহাজ চালু আছে। আরো দু’টি রণতরী তৈরির পরিকল্পনা আছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদিও চীনের সামরিক শক্তির চেয়ে ভারত এখনো অনেক পিছিয়ে আছে। কিন্তু বিক্রান্ত তৈরি করা এক্ষেত্রে একটা তাত্পর্য বহন করে। কারণ চীন এখনো নিজেরা রণতরী তৈরি করতে পারেনি। চীন ইউক্রেন থেকে অর্ধ তৈরি অবস্থায় ১৯৯৮ সালে ‘দ্য লায়োনিং’ নামের একটি রণতরী ক্রয় করে যা গত সেপ্টেম্বরে চালু হয়। তবে চীন নিজস্ব প্রযুক্তিতে একটি বড় ধরনের যুদ্ধজাহাজ তৈরির পরিকল্পনা করছে। ধারণা করা হচ্ছে, সাংহাইয়ের কাছে একটি শিপইয়ার্ডে নিজস্ব রণতরী তৈরি করতে পারে চীন।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যম জানিয়েছে, ভারতের এই রণতরী হয়তো চীনকে কিছুটা হলেও দেখিয়ে দিয়েছে। তবে এটা চীন-ভারত অস্ত্র প্রতিযোগিতার দৌড়ে তেমন কোনো ভূমিকা রাখবে না। এটা ভারত-চীনের সহযোগিতার ক্ষেত্রেও কোনো বাধা সৃষ্টি করবে না। তবে চীনের গণমাধ্যমগুলোতে এটা স্বীকার করা হয় যে, ভারত এই অঞ্চলে ব্যাপক শক্তিধর হয়ে উঠছে। বিশ্ব শক্তির কেন্দ্রে আসারও স্বপ্ন দেখছে দেশটি। দেশটি গত কয়েক বছর ধরে অস্ত্র আমদানিতে শীর্ষে আছে।