ইরান কি যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু হবে
প্রকাশ : ১৮ আগস্ট ২০১৩, ২০:২৯
ইরানের ব্যাপারে পশ্চিমা বিশ্বের নাক সিটকানি আজকের নয়। বিশেষ করে পরমাণু ইস্যুতে ওয়াশিংটন আর তেহরানের একে অপরের প্রতি আস্থা একেবারে নেই বললেই চলে। এর সাথে আবার জড়িয়ে আছে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পরম বন্ধু ইসরাইলের অস্তিত্বের বিষয়টি। বিশ্বের মানচিত্র থেকে ইসরাইলকে মুছে ফেলতে ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের হুমকি আর বোমা মেরে পরমাণু চুল্লি উড়িয়ে দিতে ইসরাইলের পাল্টা ধমকির মধ্যে এখনো আটকে আছে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি। এভাবেই ইরানের পরমাণু ইস্যুতে গত কয়েক দশকে একাধিকবার যুদ্ধের প্রায় দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায় মধ্যপ্রাচ্য। তবে জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েক দফা নিষেধাজ্ঞা আর অবরোধের কারণে যুদ্ধ ছাড়াই বেশ বিপর্যস্ত ইরান।
গত কয়েক বছর ধরে চলমান এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে ইরানিরা তাই বেছে নেয় হাসান রুহানিকে। বিপুল ভোটে তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ইতোমধ্যে রুহানি নিজেকে সংস্কারপন্থি ও উদারপন্থি হিসেবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন। আর এতেই পশ্চিমা দেশগুলো একটু নড়েচড়ে বসেছে। ইরানকে নিয়ে নতুন আশায় বুক বাঁধে তারা।
২০০৫ সালের জুনে মাহমুদ আহমাদিনেজাদ ক্ষমতায় এসেই বিতর্কের ঝড় তোলেন। সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার সুরেই তিনি আহ্বান জানান ইসরাইলকে বিশ্বের মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার। অবশ্য তেহরান পরে বাধ্য হয়ে ব্যাখ্যা দেয়, মুছে ফেলার মানে হলো দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি। একই বছর আহমাদিনেজাদ আবার বলে বসেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাত্সী বাহিনীর কর্তৃক ইহুদী নিধন বা ‘হলোকাস্ট’ রূপকথার গল্প ছাড়া আর কিছুই নয়। তার এমন মন্তব্যের কড়া নিন্দা জানায় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদও। এর পরের বছরই আহমাদিনেজাদ ঘোষণা দেন, ইরান পরমাণু প্রযুক্তিধর দেশগুলোর একটি। তার এই বক্তব্য ইসরাইল ও পশ্চিমা বিশ্বের সন্দেহ ও সংশয়কে আরো বাড়িয়ে তোলে। ফলে ইরানের অর্থনীতি ও বাণিজ্যের উপর আরোপিত হয় যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েক দফা নিষেধাজ্ঞা।
এ অবস্থায় আহমাদিনেজাদের বিকল্প হিসেবে রুহানিকেই সবচেয়ে ইরানিরা বেশি পছন্দের মনে করলো। অনেকের ধারণা, সাবেক প্রেসিডেন্টের চেয়ে এমনকি এ যাবত্কালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষমতাশালী রাষ্ট্রনায়ক হতে যাচ্ছেন নতুন প্রেসিডেন্ট রুহানি। কিন্তু ইরানে ক্ষমতার পালাবদলে বিপ্লবীদের আস্থা অর্জন করতে পারাটাই মূল ও শেষ কথা। কারণ গোটা শাসন ব্যবস্থার মূলে জড়িয়ে আছে ধর্মীয় নেতারাসহ কট্টরপন্থিরা এবং সশস্ত্র বাহিনী। প্রেসিডেন্ট রুহানি সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খোমেনির অন্যতম প্রিয়ভাজন ব্যক্তি। এমনকি সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও বিমান বাহিনীর এই সাবেক কমান্ডার সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনীরও আস্থার মানুষ। এত কিছুর পরও পশ্চিমা বিশ্বের সাথে ঐকমত্যের ব্যাপারে রুহানি নিজে থেকে কোন কিছুই করতে পারবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরানিয়ান স্টাডিজ অ্যান্ড কমপ্যারেটিভ লিটারেচারের অধ্যাপক হামিদ দাবাশি মনে করেন, নিরাপত্তা বাহিনী, সেনা বাহিনী, গোয়েন্দা বাহিনী ও ধর্মীয় নেতাদের সমন্বয়ে একটি জটিল শাসন ব্যবস্থার নাম ইরান। প্রেসিডেন্ট রুহানিকে ইরান ও আন্তর্জাতিক সব গণমাধ্যমে পরিচয় করিয়ে দেয়া হচ্ছে একজন সংস্কারপন্থি হিসেবে। অথচ ১৯৯৯ সালে তেহরানে গণতন্ত্রপন্থি ছাত্রদের সমাবেশ গুড়িয়ে দেয়ার পেছনে অকুণ্ঠ সমর্থন ছিলো এই রুহানির। তিনি নিজে কখনই আনুষ্ঠানিকভাবে সংস্কারপন্থিদের সাথে জোটবদ্ধ হননি বা ঐ শিবিরে নাম লেখাননি। রুহানি অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতিতে নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শনের মাধ্যমেই ইরানের মডারেট রাজনীতিতে অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের সংবিধানে মূল ক্ষমতার অধিকারী সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা খোমেনি। সে তুলনায় রুহানির ক্ষমতা অতি সামান্য। একমাত্র খোমেনি যখন আন্তর্জাতিক মহলের সাথে সব বিরোধ মিটিয়ে ফেলতে চাইবেন, শুধুমাত্র তখনই তা করা রুহানির জন্য সম্ভব হবে। অবশ্য খোমেনির ইশারাতেই রুহানি ইরানের ‘আসল পরিবর্তন’ ঘটাতে যাচ্ছেন কি-না, সেটাও পরিষ্কার নয়।
প্রেসিডেন্ট রুহানির ব্যাপারে আরো কিছু তথ্য ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ব্যাপারে আগাম অনেক কিছুই বুঝতে হয়তো সহায়তা করবে। যেমন, হাসান রুহানি আসলে একজন ইরানি ধর্মীয় নেতা। অন্তত বেশভুষায় তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট আহমাদিনেজাদের চেয়েও কট্টর। তবে রুহানি গত কয়েক বছরে নিজেকে মধ্যপন্থি হিসেবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিলো অর্থনীতির উন্নয়ন ও বেকারত্ব দূরীকরণ। রুহানি নানা বিষয়ে আসলেই একজন তুখড় ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব। বিমান প্রতিরক্ষার সাবেক এই কমান্ডার ১৩ বছর ধরে জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ে প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন। সেটাও আহমাদিনেজাদ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবার আগের কথা। সে সময় পরমাণু আলোচক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন রুহানি। এছাড়া শুধুমাত্র আইনের উপরই রুহানির রয়েছে তিনটি ডিগ্রি। এর মধ্যে একটি হলো স্কটল্যান্ডের এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জন। রুহানি চান, পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে শান্তিপূর্ণভাবে সকল বিরোধ নিষ্পত্তি। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবার পর গত ৩ আগস্ট সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খোমেনির উপস্থিতিতে তিনি যে বক্তব্য রাখেন, তাতেও তিনি এমন কথাই পুনর্ব্যক্ত করেছেন। আর তখন থেকেই আলোচনার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দু’পক্ষকেই বেশ আশাবাদী মনে হয়েছে। এখন পর্যন্ত ইরান চাইছে, শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচিতে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের সমর্থন। আর যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, ইরান আণবিক বোমা তৈরির চেষ্টা করছে না, এ ব্যাপারে পূর্ণ নিশ্চয়তা।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক পারস্পরিক শ্রদ্ধার উপর নির্ভরশীল। দু’দেশের বিরোধ শুধুমাত্র পরমাণু ইস্যুতে নয়, বরং আরো অন্যান্য জাতীয় স্বার্থ এর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। খোমেনি যদিও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সরাসরি কোন আলোচনায় যাওয়ার পক্ষপাতি নয়, তা সত্ত্বেও গত মার্চে এক ভাষণে তিনি বলেছিলেন, ওয়াশিংটন তেহরানের পরমাণু সক্ষমতাকে স্বীকৃতি দিলেই কেবল সরাসরি আলোচনা হতে পারে। অনেকেই এই বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ইরান একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। একদিকে আফগান ও পাকিস্তানে ইরানের প্রভাব।
অন্যদিকে, সিরিয়া, লেবানন ও ইরাককে স্থিতিশীল রাখতে ইরানকে সাথে নেয়ার বিকল্প নেই। আবার রাশিয়া, চীন, ভারত এবং লাতিন আমেরিকা বা দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর সাথে তেহরানের সুসম্পর্ক ভাবিয়ে তুলেছে ওয়াশিংটনকে। সম্ভবত এসব কারণেই প্রেসিডেন্ট হিসেবে রুহানির বিজয় আর আহমাদিনেজাদের বিদায়কে স্বাগত জানায় যুক্তরাষ্ট্র। অবশ্য ইসরাইল পরিষ্কার করেই বলেছে, প্রেসিডেন্ট পরিবর্তন হলেও ইরানের নীতির কোন পরিবর্তন হচ্ছে না।